কলাম

বেগমজানের ফেরা ও সাবধানতা

বেগম জিয়া ফিরেছেন। কেন কিভাবে কোন কারণে ফিরলেন তিনিই ভালো জানেন। তবে ফেরার পর থেকে বিএনপির পেশির মহড়া শুরু হয়ে গেছে। তাদের আইনজীবীরাও এখন মনের সুখে মারামারিতে লিপ্ত। গুজবের দেশে তারা বলছে মানুষের ঢলে নাকি ভেসে গিয়েছিল রাজধানী। সামাজিক মিডিয়ায় এজতেমার ছবি দিয়ে অপপ্রচার আর এদের জোশ দেখে আমার মতো অনেকেই ভয় পাবেন বৈকি! লন্ডনে কোন ষড়যন্ত্র আর নীলনকশা হয়েছে কে জানে। তারা খুনের রাজনীতিতে পটু। তারা অঘটন ঘটাতে শেখ হাসিনাকেই হয়ত টার্গেট করবে।
বিমানের নাটবল্টু খুলে যাওয়া বা ঢিলে হয়ে যাওয়া অথবা উড্ডয়নের পরপর চাক্কা খুলে পড়ার ঘটনাটা সহজ কিছু না। এর পেছনে যে রহস্য তার উদ্ঘাটন ব্যতিরেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরাপদ থাকতে পারেন না। শেখ হাসিনার ওপর যাদের রাগ তাদের আমরা জানি। তবে যারা রেগে ভালোবাসার অভিনয় করেন তাদের চিনি না। এরাই এসব ঘটনার হোতা। বহু দেশের সরকার প্রধান বা নেতাদের এভাবে কুপোকাত করা হয়েছে। এটাকে দুর্ঘটনা না বলে বলা দরকার আকাশ ক্যু। পাকিস্তানের জিয়াউল হক, ভারতের সঞ্জয় গান্ধী, ফিলিপিন্সের একুইনো সবাই এর শিকার। ইতিহাস বলে দুবারের বেশি সার্ভাইভ করেন না কেউ। কিন্তু প্রকৃতির অপার আশীর্বাদে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকবার বেঁচে গেছেন।
আজকের বাংলাদেশটা আমাদের দেখা স্বদেশের সঙ্গে ঠিক মেলে না। এর আগেও আমরা অনেক ক্রাইসিস দেখেছি। অনেক কঠিন সময় পাড়ি দিয়েছি। কিন্তু এবার যা দেখছি তার নাম হিপোক্রেসি। এমন দ্বৈত বা ততোধিক সত্তা কম জাতিতে দৃশ্যমান। মুখে মুখে এত আওয়ামী লীগার স্বয়ং বঙ্গবন্ধুও দেখে যেতে পারেননি। দেশের রাজনীতিতে সবকিছু একপেশে বলে বোঝা যায় না। তলে তলে কত ধরনের দুশমন। এত আওয়ামী লীগার, এত কর্মী, এত নেতা, এত প্রেমিক অথচ ভোটের বাক্স নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। শুধু তাই নয়, এরা এত মোসাহেব, এত স্তাবক, আসল মানুষের চেহারাই ভুলিয়ে দিয়েছে তারা। যে কারণে মনে হতে পারে সবাই আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাপ্রেমিক হলেও কেউ না কেউ প্রধানমন্ত্রীর বিমানের নাটবল্টুও খুলে রাখার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সমানতালে।
এ ঘটনার পর বিমানমন্ত্রী মেনন সাহেব বলেছেন তার বা তার মন্ত্রণালয়ের হাতে নাকি আসলে কিছু নেই। তবে এসব ঘটনার সাথে যারা জড়িত তারা তাহলে কার অধীনে? আমাদের রাজনীতি ও সিস্টেম এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে দায়িত্ব অস্বীকার বা এড়িয়ে যাওয়াটাই হলো মূল বিষয়। কারণ এর জন্য শাস্তি নেই, জবাবদিহিতাও নেই। তা না হলে আমরা এমন বক্তব্য পেতাম যাতে আশার কথা থাকত। নিজের ভূমিকার কথা থাকত। সেটা পাওয়া গেল না। এখন খবরে দেখছি এর সঙ্গে নাশকতার যোগসূত্র আছে কি নেই তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নাশকতার আর বাকিটা কি? এত মানুষের চোখ এড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বহন করা বিমানটি বিপদ মাথায় নিয়ে আকাশে উড়ল আবার মাঝপথে নামতে বাধ্য হলো আবার ফিরে আসার পর নেতা মন্ত্রীরা, সারিবেঁধে তাকে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়েও এলেন, যেন কিছুই হয়নি কোথাও। আমি বলছি না মাতম করতে হবে; কিন্তু কর্তব্যকর্মে অবহেলার পর যে অনুভব তার ছাপ তো থাকতে হবে কোথাও।
দেশের সামগ্রিক যে চেহারা তাতে বিপদের কমতি হবে বলে মনে হয় না। আকাশে, মাটিতে, ঘরে-বাইরে তারা সচেষ্ট। একটা বিষয় মাথায় ঢোকে না, যেসব মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজবিরোধী, উদারতাবিরোধী বলে জেলে ছিলেন, সরকারকে শায়েস্তা করার নামে যারা আগুন নিয়ে খেললেন তারা একে একে বেরিয়ে আসছেন কিভাবে? কিভাবে খালেদা জিয়ার টিকিটাও ছুঁতে পারছে না সরকার? মুখে আইনে মামলায় যত কথাই হোক বাস্তবে ভালোই আছেন তিনি। তার ভালো না থাকার কথা বলছি না। কেন তিনি খারাপ থাকবেন? কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে কি ধরে নেব মামলা বা শাস্তির বিষয় পাতানো? না এগুলো ভিত্তিহীন? তাকে আড়ালে রাখতে পারলে সাময়িকভাবে তৃপ্তি পাওয়া হয়ত সম্ভব; কিন্তু সমাধান নয়। হয় তাকে মাঠে নামতে দিতে হবে, নয়ত কেন তা হবে না তার একটা আইনি ব্যবস্থা কিংবা বিচার দেখাতে হবে। কারণ রাজনীতির নিয়মই হচ্ছে সে তার কাজ বা ভূমিকা রাখতে না পারলে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। যে রাজনীতি ভূতলে যায়, গোপনে কাজ করতে চায় তার কাছে তখন আর নাশকতার বিকল্প থাকে না। যেহেতু সে প্রকাশ্য না, যেহেতু জনগণের কাছে তার কোনো জবাবদিহিতা নেই তখন তার আশ্রয় হয়ে ওঠে ধ্বংস। বাংলাদেশের রাজনীতিতে কারা এ পথ নিতে পারে সেটা বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না। সেদিকে নজর না দিলে এসব সমস্যার সমাধান অসম্ভব।
সরকারের জনপ্রিয়তার দিকটা যাই হোক, শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। তার অদম্য আগ্রহ আর শক্তিতে পরাজিত জামায়াতি মানবতাবিরোধী দালালরা সমাজের সব জায়গায় ঘুণ ধরাতে পারলেও কোণঠাসা। তাদের নেতাদের বিচারের শাস্তি তারা সহজে ছেড়ে দেবে না। এ কারণে সাবধানতার পাল্লা আরও ভারী হওয়া প্রয়োজন। এটা মানতে হবে দেশে-বিদেশে এদের নেটওয়ার্ক আছে। শক্তিশালী ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতিতে নিজে মরে অন্যকে মারার অপকৌশল আছে দুনিয়ায়। এগুলো গোয়ান্দাদের না জানার কথা নয়। আছে নাশকতার বিবিধ পথ। আকাশে সাবধানতার পাশাপাশি মাটিতেও সাবধান হতে হবে। ইন্দিরা গান্ধীর মতো লৌহমানবীকেও আমরা এর শিকার হতে দেখেছি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা খুনের নেশায় পাগল তারা যে কী করতে পারে সেটা একুশে আগস্টেই দেখেছিলাম।
শেখ হাসিনা কোন দলের বা কোন সরকারের প্রধান, তারচেয়েও বড় তিনি এখন আলো ও উদারতার দিশারি। সেখানে যাদের আক্রোশ তাদের হাত থেকে তাঁকে বাঁচানোর কাজটাও তাদের যারা এদেশে ভালোভাবে, সুন্দরভাবে উদারনৈতিকতায় বাঁচতে চায়। তারা কেন নীরব থাকে? যারা নানাভাবে উপকৃত, যারা তাঁর সাহায্য-সহযোগিতার কাঙাল তাদের নীরবতাও প্রশ্নময়।
আজ তাই আমরা উদ্বিগ্নতার পাশাপাশি সতর্ক হতে চাই। আমাদের দেশের কপালে উন্নয়নের রাজটিকা পরিয়ে দেয়া শেখ হাসিনা যাদের টার্গেট তারা এদেশকে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। হানাহানি, মারামারি আফগান স্টাইলে বিপ্লবের নামে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার চায় এরা। এদের শিকার হলে দেশ তো গোল্লায় যাবেই, জনগণের কপালে নেমে আসবে বিশাল দুর্ভোগ। তাই শেখ হাসিনার আশপাশ থেকে জঞ্জাল হটানোর বিকল্প নেই।
লেখক : অজয় দাশগুপ্ত