প্রতিবেদন

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সাথে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ : প্রত্যাশিত বার্তা না পেয়ে হতাশ বিএনপি

মেহেদী হাসান : ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গত ২২ আগস্ট দুইদিনের ঢাকা সফরে এসে অন্যান্য রাষ্ট্রীয় কাজের পাশাপাশি দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। খালেদা জিয়া ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য টানা তিন মাস লন্ডন অবস্থান শেষে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই ১৮ অক্টোবর দেশে ফেরেন। সুষমা স্বরাজের সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের অ্যাপয়েন্টমেন্টটি তিনি লন্ডনে বসেই নেন। সুষমা স্বরাজের সঙ্গে ২২ অক্টোবর খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ হচ্ছেÑ এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই খালেদা জিয়া ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশে পদার্পণ করেন। সে হিসাবে ২২ অক্টোবর সুষমা স্বরাজের সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের বিষয়ে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেই প্রবল আগ্রহ ছিল। বিএনপির মধ্যেও যথেষ্ট উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বিএনপির নেতারা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বলতে শুরু করেন, সুষমা স্বরাজের সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের বিষয়টি মোটেও সাধারণ বা সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ।
বিএনপি আশা করেছিল সুষমা স্বরাজ সহায়ক সরকারের অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলে যাবেন। কিন্তু ভারতের মোদি সরকার সুষমা স্বরাজের মাধ্যমে পুরোপুরি আশাহত করে বিএনপিকে। মোদি সরকারের কাছ থেকে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রত্যাশিত বার্তা না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ে বিএনপির সব শ্রেণির নেতাকর্মী।
সুষমা স্বরাজ খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। যার ফলে বিএনপির নেতাকর্মীরা কোনো সুখবরও পায়নি। তবে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে বার্তা পাওয়ার আশা ছিল। তাদের ধারণা ছিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমন কিছু বলবেন, যাতে আগামী নির্বাচনের ব্যাপারে তাদের অবস্থান পরিষ্কার হবে। তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সুষমা স্বরাজের কাছ থেকে প্রত্যাশিত কোনো বার্তা না পেয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য বলেন, ভারত চায় যে অন্য দেশগুলো, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোয় গণতান্ত্রিক চর্চা থাকুক এবং গণতান্ত্রিকভাবেই সরকার নির্বাচিত হোক। এখানে নির্বাচন যেন সুষ্ঠু ও নিরপে এবং সব দলের অংশগ্রহণে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয় সেটা ভারত আশা করে। এজন্য নির্বাচন কমিশন যেন তার দায়িত্ব পালন করতে পারে, সেটিও আশা করে ভারত।
জানা গেছে সুষমা স্বরাজের সঙ্গে সাক্ষাতে খালেদা জিয়া রোহিঙ্গা ইস্যু ছাড়াও নির্বাচন প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। সংসদ ভেঙে সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুললে এ ধরনের সরকার গঠনের বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়। নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন ভূমিকারও কথা আসে তাদের বৈঠকে। তবে বেশিরভাগ েেত্র সুষমা শুনেছেন, বলেছেন কম। আবার এমন কিছু বলেননি, যাতে বিএনপির বিষয়ে ভারতের দৃষ্টি পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ বিষয়ে বলেন, এটি সৌজন্য সাাৎ ছিল। সেখানে নির্বাচন নিয়ে কথা হয়েছে। তারা বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক চর্চা দেখতে চায়। সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন দেখতে চায়। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে হলে কী করা উচিত, সে বক্তব্যও আমরা দিয়েছি।
জানা গেছে, নির্বাচন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সংসদ ভেঙে নির্বাচনের কথা বলা হয়। বিএনপি সুষমা স্বরাজকে জানায়, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান থাকলেও পৃথিবীর কোথাও সংসদ রেখে নির্বাচনের বিধান নেই।
সুষমা স্বরাজ-খালেদা জিয়া বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, আওয়ামী লীগের দাবির পরিপ্রেেিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়েছিল। সেই আওয়ামী লীগই এ পদ্ধতি বাতিল করেছে। তারা নির্বাচনে সেনাবাহিনী চায় না। এগুলো তাদের খারাপ উদ্দেশ্য। বিএনপি নেতার ভাষ্য অনুযায়ী ওই সময় সুষমা স্বরাজ বলেন, গতবার তো আপনাদের অবস্থা ভালো ছিল। নির্বাচনে এলে ভালো করতেন। এবার নির্বাচনে আসবেন আশা করি।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন আরেক নেতা স্বদেশ খবরকে বলেন, সরকার সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ফেলছে এমনটিও বলা হয়। সর্বশেষ প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিষয়টি তোলা হয়। কিভাবে তাকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে, তা-ও বলা হয়েছে। কিন্তু সুষমা স্বরাজ প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিষয়টিও পুরোপুরি এড়িয়ে যান; যা চরমভাবে হতাশ করে বিএনপিকে।
জানা গেছে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তার উপদেষ্টারা তাদের দলের নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবির বিষয়টি তুলেছিলেন। সুষমা স্বরাজ নিজের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা এখন তাদের স্যার বলে সম্বোধন করেন, নির্বাচনের সময় তারাই রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দাঁড়িয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন এবং ওই রিটার্নিং অফিসার বসা অবস্থায় তা গ্রহণ করেন।
সুষমা স্বরাজ বিএনপি নেতাদের জানিয়েছেন, তার দেশ ভারতসহ ওয়েস্টমিনস্টার ধারার গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে মতাসীন দলের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভারতে নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী ও তার পুরো মন্ত্রিসভা বহাল থাকে। সুষমা স্বরাজ বিএনপি নেতাদের বার্তা দিয়েছেন, তিনি এমন কোনো ব্যবস্থার জন্য এ দেশকে বলতে পারেন না যেটি তার নিজের দেশেই নেই।
সুষমা স্বরাজের সফরের বার্তা বিষয়ে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলেছে বাংলাদেশে যত বেশি সম্ভব অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রত্যাশা করে ভারত। বাংলাদেশে যে দল মতায় থাকবে তার সঙ্গেই কাজ করবে ভারত। বাংলাদেশে অতীতে সামরিক ও একনায়ক সরকারগুলোর সঙ্গেও ভারত কাজ করেছে। বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে ভারত ওই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেবে কি না এ প্রশ্নের জবাবে সুষমা স্বরাজের সঙ্গে ঢাকায় সফরে আসা এক কূটনীতিক বলেন, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হলো কি হলো না তার স্বীকৃতি দেয়ার আমরা (ভারত) কেউ নই। এ স্বীকৃতি দেবে এ দেশের (বাংলাদেশের) জনগণ।
সুষমা স্বরাজের বক্তব্যই যে ভারতের মোদি সরকারের বক্তব্যÑ এটি খুব ভালোভাবেই বোঝে বিএনপি। ফলে ঢাকা সফরে আসা সুষমা স্বরাজের বক্তব্যের দিকে চাতক পাখির মতো চেয়েছিল বিএনপি। কিন্তু বিএনপিকে হতাশ করে দিয়ে কূটনৈতিক কথাবার্তা চালিয়েই খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষ করলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ।