ভোলায় নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান ॥ বিশাল মজুদের সম্ভাবনা : জ্বালানিখাতের সংকট সমাধানে যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা

| October 30, 2017

বিশেষ প্রতিবেদক : ভোলার বিদ্যমান শাহবাজপুর গ্যাসত্রে থেকে সাড়ে ৩ কিলোমিটার দূরে আরেকটি নতুন গ্যাসেেত্রর সন্ধান মিলেছে। মাটির ৩ হাজার ৪০০ মিটার গভীরে ৮ মিটার পুরু বিস্তীর্ণ স্তরে গ্যাস রয়েছে বলে জানিয়েছে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনকারী রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বাপেক্স। ভোলায় নতুন গ্যাসত্রে পাওয়ার বিষয়টি ২৩ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকে অবহিত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়। ভোলায় নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান ও বিশাল মজুদের সম্ভাবনা দেখে নতুন গ্যাসক্ষেত্রটি দেশের জ্বালানিখাতের সংকট সমাধানে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, এটা দেশের জন্য বড় সুসংবাদ। আগে থেকেই শাহবাজপুরে যে কূপটি রয়েছে, সেটা মিলে ওই এলাকায় বর্তমানে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নতুন গ্যাসপ্রাপ্তির সংবাদে প্রধানমন্ত্রী বাপেক্সসহ এ আবিষ্কারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান। পেট্রোবাংলা মনে করছে, প্রাথমিক হিসাবে এখানে ৭০০ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) গ্যাস থাকতে পারে। এর মধ্যে তোলা যাবে কমবেশি ৮০ ভাগ। গত কয়েক বছরে যে গ্যাসত্রেগুলো আবিষ্কার হয়েছে, তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড়।
অনুসন্ধান কূপ খননকালে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও গ্যাসস্তরের আয়তন সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া গেছে, সে হিসাবে সেখানে ৭০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থাকতে পারে বলে পেট্রোবাংলা সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে নতুন আরও কূপ খননের পর মজুদ আরও বাড়তে পারে। এই কূপ খনন করার কথা ছিল বাপেক্সের। কিন্তু সরকার শাহবাজপুর পূর্ব-১ নামে এই অনুসন্ধান কূপটি খনন করার জন্য ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব দেয় রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রমকে। তবে সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব থাকে বাপেক্সের হাতে। গত ৬ আগস্ট বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ খনন কাজের উদ্বোধন করেন। ২৩ অক্টোবর সেখানে গ্যাস পাওয়ার কথা জানানো হয়। তবে গ্যাসের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ও উত্তোলনযোগ্য মজুদপ্রাপ্তির বিষয় পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আরও কয়েকদিন অপো করতে হবে বলে জানিয়েছেন বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী নওশাদ ইসলাম। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর এটি হবে দেশের ২৭তম গ্যাসত্রে।
বাপেক্সের এমডি জানান, নতুন এই গ্যাসেেত্রর অবস্থান বোরহানউদ্দিন উপজেলার টগবি ইউনিয়নে, যা শাহবাজপুরের বর্তমান গ্যাসত্রে থেকে সাড়ে ৩ কিলোমিটার পূর্ব দিকে। গ্যাসপ্রাপ্তির নিশ্চয়তার পরীা ডিএসটি (ড্রিল স্টিম স্টেট) ছাড়া কিভাবে গ্যাসত্রে পাওয়ার দাবি করা হচ্ছেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে বাপেক্সের এমডি নওশাদ ইসলাম বলেন, অনুসন্ধান কূপ খননকালে প্রাপ্ত লগ রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে বোঝা যাচ্ছে, এটা একটা বড় গ্যাসত্রে। আরও যাচাই-বাছাইয়ের পর উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এজন্য আরো কিছুদিন সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে নওশাদ ইসলাম বলেন, পুরনো কূপ থেকে নতুন কূপের দূরত্ব প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার। সাধারণত একটি কূপকে কেন্দ্র করে এর চারপাশের এক বর্গকিলোমিটার এলাকাকে একটি গ্যাসত্রে হিসেবে ধরা হয়। তাই বলা যায়, এটা নতুন গ্যাসত্রে হতে যাচ্ছে। তবে খুব তাড়াতাড়ি পুরনো ও নতুন গ্যাসেেত্রর মাঝামাঝি আরও কূপ খনন করা হবে। সেখানে যদি দেখা যায়, মাটির নিচে নতুন ও পুরনো গ্যাসেেত্রর মধ্যে সংযোগ রয়েছে, তাহলে বলতে হবে এটা একটা অতি বিশাল গ্যাসত্রে। কারণ মাটির নিচে এত বিশাল এলাকায় গ্যাসাধার থাকলে সেটা কয়েক টিসিএফ হতে পারে।
নতুন গ্যাসত্রে পুরনোটার বর্ধিতাংশ কি না এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাপেক্সের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা স্বদেশ খবরকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে জানান, সাধারণত তিন ধরনের কূপ খনন করা হয়। একটি হলো অনুসন্ধানী কূপ। এই কূপ খনন করে গ্যাস পাওয়া গেলে তাকে বলা হয় নতুন গ্যাসত্রে। ভোলায় যেটা করা হয়েছে, সেটা অনুসন্ধানী কূপ। এজন্য এটিকে নতুন গ্যাসত্রে বলা হচ্ছে। তাছাড়া যেহেতু শাহবাজপুর থেকে এটি সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে, সেহেতু ধারণা করা হচ্ছে নতুন এ গ্যাসেেত্রর সঙ্গে পুরনোটার সংযোগ নেই। দ্বিতীয়টি হচ্ছে উন্নয়ন কূপ। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য যখন কোনো গ্যাসেেত্র নতুন একটি কূপ খনন করা হয়, তখন তাকে বলা হয় উন্নয়ন কূপ। যেমন তিতাস গ্যাসেেত্র অনেক কূপ আছে। সেখানে একটিই মাত্র অনুসন্ধান কূপ, বাকিগুলো সবই উন্নয়ন কূপ। তৃতীয়টি হচ্ছে মূল্যায়ন কূপ। কোনো গ্যাসেেত্র মাটির নিচের তথ্য নতুন করে যাচাই-বাছাই করার জন্য যখন কূপ খনন করা হয়, তখন তাকে বলা হয় মূল্যায়ন কূপ।
বাপেক্সের ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, সাধারণত একটি নতুন েেত্র গ্যাস পাওয়ার পর উঁচু পাইপে আগুন ধরানো হয়। যাকে বলা হয় গ্যাসফায়ার। এটার মাধ্যমেই একটি নতুন গ্যাসত্রে আবিষ্কৃত হয়। ভোলা নতুন েেত্র এখনও গ্যাস ফায়ার করা হয়নি। তবে নিশ্চিত হয়েই গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এখানে প্রাপ্ত গ্যাসের পরিমাণ জানা যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে পেট্রোবাংলা থেকে কয়েকটি েেত্র গ্যাস পাওয়ার আগাম ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু পরে ঘোষণার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। সুনেত্র, সুন্দলপুর ও হরিপুরে আগাম তেল-গ্যাস পাওয়ার ঘোষণা দেয় পেট্রোবাংলা। যদিও এর কোনো েেত্রই কাক্সিত মাত্রায় সাফল্য পাওয়া যায়নি। হরিপুরে তেল ও সুনেত্রে গ্যাস মেলেনি।
তবে সূত্র জানিয়েছে, ভোলার এই কূপের প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবে (ডিপিপি) ৩ হাজার ২০০ মিটার পর্যন্ত খননের কথা বলা হয়। কিন্তু থ্রিডি সিসমিক সার্ভের তথ্যের ভিত্তিতে গ্যাজপ্রমের সঙ্গে সাড়ে ৩ হাজার মিটার খননের চুক্তি করা হয়। পরে ৩ হাজার ৪০২ মিটার থেকে ৪ হাজার ৪১০ মিটার পর্যন্ত গভীরতায় গ্যাস থাকার তথ্য মেলে।
আর শাহবাজপুর গ্যাসত্রেটি বেঙ্গল বেসিনভুক্ত। সেখানে মাটির গভীরে যে ভূ-কাঠামোয় গ্যাস পাওয়া গেছে তার ভূতাত্ত্বিক নাম ‘স্টেটিগ্রাফিক স্ট্রাকচার’। দেশের অন্য সব গ্যাসত্রে আবিষ্কৃত হয়েছে সুরমা বেসিনে। এই বেসিনের ভূতাত্ত্বিক নাম ‘অ্যান্টিকেইন স্ট্রাকচার’। বলা হচ্ছে ভোলার এই গ্যাসত্রে সাম্প্রতিককালের মধ্যে আবিষ্কৃত অন্যতম বড় গ্যাসত্রে। এর আগে ২০১৪ সালের জুনে ভোলায় ২৬তম গ্যাসত্রে আবিষ্কার করে বাপেক্স। আকারে ছোট ওই েেত্র ৫০ বিসিএফ গ্যাস মজুদ রয়েছে বলে জানা গেছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হয়। এর আগে কুমিল্লার শ্রীকাইলে ২৫তম গ্যাসত্রে আবিষ্কার করে বাপেক্স। ২০১২ সালের জুলাইয়ে আবিষ্কৃত এই গ্যাসেেত্র ৩০০ বিসিএফ গ্যাসের উত্তোলনযোগ্য মজুদ রয়েছে।
জানা যায়, ভোলায় গ্যাসত্রে আবিষ্কারের জন্য প্রথম ভূকম্পন জরিপ চালানো হয় ১৯৮৬-৮৭ সালে। প্রথম অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয় ১৯৯৪ সালে। এরপর আরও ৩টি কূপ খনন করা হয়েছে। ২০০৯ সালের ১১ মে থেকে এই ত্রে থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু করে বাপেক্স। সেখানে থাকা চারটি কূপের মধ্যে তিনটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস তোলা হচ্ছে। ২০১৬ সালে এ এলাকায় আবার ত্রিমাত্রিক জরিপ চালায় বাপেক্স। এতে ভোলায় বিপুল পরিমাণ গ্যাসের অবস্থান রয়েছে বলে তথ্য-উপাত্তে পাওয়া যায়। বিদ্যমান শাহবাজপুর গ্যাসত্রেকে কেন্দ্র করে প্রায় ৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ভূগর্ভে গ্যাস থাকার সম্ভাবনার কথা জানানো হয় তখন। এর আগে আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রের তেল-গ্যাস কোম্পানি ইউনোকল এক জরিপের ভিত্তিতে বলেছিল, শাহবাজপুরে দুই টিসিএফ গ্যাস মজুদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাপেক্স জানিয়েছে, শাহবাজপুর ত্রে থেকে বর্তমানে ভোলার দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে (২২৫ ও ৩৫ মেগাওয়াট) গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকদেরও গ্যাস দেয়া হচ্ছে।
এদিকে পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও দেশে ক্রমবর্ধমান গ্যাসের যে চাহিদা এবং ঘাটতি রয়েছে তা নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের ফলে পুরোপুরি নিরসন হবে না। তবে নতুন এ গ্যাসক্ষেত্র কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
সূত্র মতে, সারাদেশে ক্রমবর্ধমান চাহিদার পাশাপাশি গ্যাসের সবচেয়ে বেশি অপচয় হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে। এর বাইরে রয়েছে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে গ্যাস চুরি। দেশের ২৬টি গ্যাসেেত্রর ওপর জরিপ চালিয়ে সম্প্রতি পেট্রোবাংলা একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। তাতে বলা হয়েছে, গ্যাসের ঘাটতি ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। ২০১৯ সালে এ ঘাটতি হবে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। বাপেক্সের ওই সূত্রটি জানিয়েছে, গ্যাস চুরি রোধ করা না গেলে ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে বেশি করে গ্যাস অনুসন্ধান করতে হবে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির ওপরই নির্ভর করতে হবে। তবে নতুন আবিষ্কৃত গ্যাসত্রে থেকে পাওয়া গ্যাস আবাসিক কাজে ব্যবহার করা হবে না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি জানিয়েছেন, নতুন েেত্রর গ্যাস ব্যবহৃত হবে বাণিজ্যিক কাজে। সেক্ষেত্রে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করলেই চলবে না, গ্যাসের অপচয় যাতে না হয় এবং গ্যাস যাতে চুরি না হয়, সেদিকে সরকারের সংশ্লিষ্টদের সচেষ্ট থাকা জরুরি বলে মত দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

Tags:

Category: প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

About admin: View author profile.

Comments are closed.