প্রতিবেদন

মিয়ানমার সরকারের সাথে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সফল বৈঠক : বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার

তারেক জোয়ারদার : বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে কাজ শুরু করেছে মিয়ানমার। মিয়ানমার সফররত বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে এক বৈঠকে দেশটির কার্যত সরকার প্রধান স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি এ কথা জানান।
নেপিডোতে ২৫ অক্টোবর এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সু চি বলেন, বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ফিরিয়ে নিতে তার সরকার কাজ শুরু করেছে। কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নেও তার সরকার কাজ করছে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প থেকে সু চিকে বাংলাদেশ সফর করার আমন্ত্রণ জানান আসাদুজ্জামান খান কামাল। আমন্ত্রণ গ্রহণ করে দুই দেশের সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফর করবেন বলে জানিয়েছেন সু চি।
জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ৫ প্রস্তাব এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতেই অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। সু চি’কে সিনিয়র অফিসিয়ালস ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের সিদ্ধান্তসমূহ অবহিত এবং জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্র“প গঠনের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন আসাদুজ্জামান খান কামাল। সু চি এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, অনুপ্রবেশকারীদের দ্রুত ফিরিয়ে না নিলে এদের অনেকেই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়তে পারে। তখন পরিস্থিতি বাংলাদেশ ও মিয়ানমার কারো অনুকূলে থাকবে না। মাদকের অবৈধ পাচার বিশেষত ইয়াবার ভয়াবহতার ব্যাপারে সু চি’কে অবহিত করা হলে সু চি নিজেই বলেন, তার দেশের যুবসমাজও ইয়াবায় আসক্ত। বাংলাদেশে ইয়াবা পাচার বন্ধে তার দেশ (মিয়ানমার) সীমান্ত বন্ধ করবে।
এর আগে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মত হয় মিয়ানমার। এজন্য ৩০ নভেম্বরের মধ্যে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্র“প তৈরি করবে বাংলাদেশ ও মিয়ামানমার। নেপিডেতে মিয়ানমারের (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বাইলেটারেল মিনিস্ট্রিয়াল মিটিং) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লে. কর্নেল সুয়ির সাথে বৈঠকের পর ২৪ অক্টোবর এ তথ্য জানান বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, মিয়ানমার কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবাবায়ন করতে সম্মতি জানিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আরও বলেন, বৈঠক অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। বৈঠকে ১০টি পয়েন্ট নিয়ে আমরা একটা সিন্ধান্তে পৌঁছেছি। এর মধ্যে দুইটি সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বারিত হয়েছে। ১. সীমান্ত লিয়াজোঁ অফিস। ২. নিয়মিত নিরাপত্তা ও সহযোগিতা আলোচনা বৈঠক।
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, যৌথ কমিটির মাধ্যমেই ফেরত প্রক্রিয়া শুরু হবে। চলতি বছরেই কি আশা করা যাচ্ছেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আশাতো করছি। তবে তিনি বলেন, গ্রাউন্ড লেবেলিং কাজ শুরু করা সম্ভব হয়েছে। আমাদের অনেক দূর হাঁটতে হবে, আমরা তো শুরু করছি। তিনি বলেন, কফি আনানের সুপারিশ বাস্তবায়নের ব্যাপারে আমাদের প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন। এ ব্যাপারে কফি আনান সুপারিশ বাস্তবায়নে তারা (মিয়ানমার) রাজি হয়েছে।
কিভাবে বাস্তবায়ন হবেÑ এমন এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির তত্ত্বাবধানেই কফি আনান সুপারিশ বাস্তবায়ন হবে। এ ব্যাপারে আমরা বলেছি, বাংলাদেশের সমানসংখ্যক প্রতিনিধি নিয়ে যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি হবে। আর ওই কমিটির তত্ত্বাবধানেই কফি আনান কমিশনের বাস্তবায়ন হতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা রাখাইনে রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধের দাবি করেছি, যাতে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়। তবে তারা এ নির্যাতনের কথা অস্বীকার করে জানিয়েছে, রোহিঙ্গারা নিজেরাই চলে যাচ্ছে। আমি তাদের বলেছি, চলে যাওয়া ঠেকান আপনারা। সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, রাখাইন সফর করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। তিনি বলেন, সীমান্তে মাইন পোঁতার প্রসঙ্গ তোলার পর মিয়ানমার কর্তৃপ অন্যদের দোষারোপ করেছে। তবে মিয়ানমার কর্তৃপ বলেছে, তারা মাইন অপসারণের উদ্যোগ নেবে।
সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য দুইটি সমঝোতা স্মারক স্বারিত হয়েছে। এরপর থেকে আমাদের সাথে তাদের নিয়মিত আলোচনা হবে। মিয়ানমার কর্তৃপ আরসা (আরাকান স্যালভেশন আর্মি) জঙ্গিদের ব্যাপারে আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য চেয়েছে। তবে আমরা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছি, আমরা কোনো টেরোরিস্টকে পাত্তা দেব না। আরসা তোমাদের স্থানীয় টেরোরিস্ট। আমাদের নীতি আমরা স্পষ্ট করে তাদের জানিয়ে দিয়েছি। তারা বলতে চেয়েছে আরসার বিষয়টি। আমরা বলেছি, আমরা আমাদের স্থানীয় টেরোরিস্টদের দমন করেছি। তোমরা তোমাদের স্থানীয় টেরোরিস্টদের (আরসা) নিয়ন্ত্রণ কর।
আলোচনা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, নাফ নদী দিয়ে আমাদের সেন্টমার্টিন দ্বীপে যাওয়ার সময় মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি দিয়ে যেতে হয়। এ নিয়ে কিছুটা সমস্যা হচ্ছিল। কিস্তু বিষয়টি আগের মতোই থাকবে বলে তারা আমাদের নিশ্চিত করেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরসঙ্গী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা স্বদেশ খবরকে জানান, ২৪ অক্টোবর মিয়ানমারের নেপিডোতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। অপরদিকে মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন মিয়ানমারের ইউনিয়ন মিনিস্টার (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) লে. কর্নেল সুয়ি। তার আগে দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন। মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে কফি আনান সুপারিশ বাস্তবায়নসহ মিয়ানমারের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়া, সন্ত্রাস প্রতিরোধ, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, মানব পাচার বন্ধ করা, শান্তিপূর্ণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সীমান্তে মাদক পাচার বন্ধকরণসহ দু’টি চুক্তি স্বারিত হয়।
দুই দেশের নিরাপত্তা বিষয়ে ‘সিকিউরিটি কো-অপারেশন অ্যান্ড ডায়ালগ’ নামের এমওইউ করার সিদ্ধান্তটি দুই দেশের সরকার বছরখানেক আগেই নিয়েছিল। এরপর বাংলাদেশের তরফ থেকে একটি খসড়া করে মিয়ানমার সরকারের কাছে পাঠানো হয়। মিয়ানমার সরকার কিছু বিষয়ে সংশোধনী দিয়ে খসড়াটি বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠায়। বাংলাদেশ ওই স্মারকে আরো কিছু বিষয় পরিমার্জন করে সেটি পাঠায় মিয়ানমারের কাছে। এভাবে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পর মাস তিনেক আগে সেটি চূড়ান্ত করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রিপর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।