যে কারণে জাপানের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেল অ্যাবে

| October 30, 2017

স্বদেশ খবর ডেস্ক : জাপানের পার্লামেন্ট নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হয় ২২ অক্টোবর। এতে টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ সুগম করেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে। ৪৬৫টি আসনের মধ্যে ৩১১টি আসন পায় অ্যাবের কোয়ালিশন দল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অ্যাবেই সবচেয়ে বেশি মেয়াদে জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন।
অ্যাবের কোয়ালিশন দল পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় সংবিধান সংশোধনে তার আর কোনো বাধা থাকবে না। নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে প্রমাণ হচ্ছে অ্যাবেইকোনমিকস গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০১২ সাল থেকে অ্যাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে তার দ্বিতীয়বারের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। অ্যাবের সরকারের বিরুদ্ধে দুটি দুর্নীতি কেলেঙ্কারির অভিযোগ আছে। তবে অ্যাবে এসব কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। বিরোধী দল অভিযোগ করছে, নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী এসব অভিযোগ থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, অ্যাবে মূলত উত্তর কোরিয়া ইস্যুকে নির্বাচনে জয়ের েেত্র ব্যবহার করছেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ভোটের ফলাফল পাওয়ার পরপরই। নির্বাচনে জয়ী হয়ে অ্যাবে উত্তর কোরিয়াকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। আগাম নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর এ ঘোষণা দিলেন তিনি।
অ্যাবে বলেন, জাপানের সামনে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ থাকায় সেগুলোর ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেয়ার জন্য জনগণের প থেকে তার শক্ত ম্যান্ডেট প্রয়োজন ছিল। সেই ম্যান্ডেট নেয়ার জন্যই তিনি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে এক বছর আগে পার্লামেন্ট নির্বাচনের আয়োজন করেছেন।
তিনি বলেন, জাপানের সামনে থাকা এসব চ্যালেঞ্জের একটি হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার প থেকে ক্রমবর্ধমান হুমকি। উত্তর কোরিয়া গত কয়েক মাসে জাপানের উত্তরাঞ্চলীয় হোক্কাইডো দ্বীপের উপর দিয়ে দুই দফা পেণাস্ত্র পরীা চালিয়েছে। টোকিও এ ঘটনাকে দেশটির সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন উল্লেখ করে এর পুনরাবৃত্তির ব্যাপারে পিয়ংইয়ংকে সতর্ক করে দিয়েছে। পাশাপাশি উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা শিনজো অ্যাবে তার দেশের সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে চান। কিন্তু ১৯৪৭ সালে মার্কিন দখলদারদের প্রণীত সংবিধানে সে ব্যবস্থা রাখা হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ওই শান্তিকামী সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে জাপানের সেনাবাহিনীকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হয়নি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী অ্যাবে সংবিধানের এই ধারা পরিবর্তন করতে চান। আগাম নির্বাচনে তার দলের বিপুল বিজয় তাকে সেই সুযোগ এনে দেবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এদিকে নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে জয়ী হওয়ায় চাঙা হয়ে উঠেছে জাপানের পুঁজিবাজার। দেশের পুঁজিবাজার ২১ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মাইলফলক ছুঁয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মান তিন মাসে সর্বনিম্নে এসে পৌঁছেছে। এবারের নির্বাচনে জাপানের মতাসীন জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় এটা সুস্পষ্ট যে, অ্যাবের নেয়া অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলো বহাল থাকবে। এরই ধারাবাহিকতায় ২৩ অক্টোবর জাপানের শীর্ষস্থানীয় নিক্কেই ইনডেক্স ২৩৯ পয়েন্ট বেড়ে ২১ হাজার ৬৯৬ দশমিক ৬৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯৬ সালের পর সূচকের এমন উত্থান কখনই দেখা যায়নি। এদিকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মান তিন মাসে তলানিতে এসে ঠেকেছে। ফলে দেশের বাইরের ক্রেতাদের কাছে জাপানি পণ্য আরও বেশি সস্তা হয়ে যাওয়ায়, শেয়ারবাজারে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান ছিল বেশ রমরমা। অ্যাবের বিজয়ের পরের দিনই নিশান, মিৎসুবিশি ও সনি প্রত্যেকের শেয়ারের দাম বাড়তে দেখা যায়। যদিও টয়োটার শেয়ার দরে কিছুটা পতন পরিলতি হয়। মূলত শক্তিশালী টাইফুনের কারণে টয়োটা সাময়িকভাবে কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখায় তার প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারেও। এদিকে কেবল ডলার নয়, ইউরোর বিপরীতে ইয়েনের মানও কমেছে।
নির্বাচনের আগে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রধান অ্যাবে বলেছিলেন, সবার আগে নির্বাচনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এরপর উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হুমকি নিয়ে করণীয় ভাববেন তিনি।
বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা, নির্বাচনে তার এ বিজয়ের মানে হলো সরকারের অর্থনৈতিক নীতিমালায় বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসবে না। বিনিয়োগকারীদের ধারণা অ্যাবের জয়ের মধ্য দিয়ে ব্যাংক অব জাপান বিস্তৃত পরিসরে মুদ্রানীতি শিথিল রাখবে। ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর অ্যাবে শিথিল মুদ্রানীতি, আর্থিক প্রণোদনা এবং কাঠামোগত সংস্কার এ তিন নীতি গ্রহণ করেন, যা অ্যাবেনোমিক্স নামে পরিচিত। এর সুবাদে টানা দুই দশক ধরে নিশ্চল প্রবৃদ্ধিতে গতির সঞ্চার হয়। অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হতে শুরু করে। একই সঙ্গে চাঙা হতে শুরু করে পুঁজিবাজার ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতও।
এ বিষয়ে ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের মার্সেল থিলিয়েন্ট বলেন, একটি মাত্র জায়গায় খুব বেশি সফলতা আসেনি, আর তা হলো কাঠামোগত সংস্কার। আমার ধারণা বেশিরভাগ লোকই যে আশা করেছিল, সে অনুযায়ী কোনো ফল তারা দেখতে পায়নি। অ্যাবে যদি তার পূর্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী আবারও ২০১৯ সালে বিক্রয় কর বৃদ্ধি করেন তবে অর্থনীতির জন্য তা সহায়ক হবে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবের জয়ে স্বভাবতই প্রশ্ন জেগেছে, এই জয়ের পর জাপান এবং এই অঞ্চলের সামনে কী অপো করছে? অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মাইকেল হিজেল মনে করেন, এই মুহূর্তে জাপানে সাংবিধানিক সংস্কারের খুব প্রয়োজন। ডান ও বামপন্থিদের মধ্যে আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে বহুদিন ধরেই বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। এই অধ্যাপক বলেন, বিশ্বে পরিবর্তন এসেছে। ধারা-৯ বলা চলে এখন অতীত বিষয়বস্তু। বর্তমান প্রোপটে এই ধারার সংস্কার না আনাটা বাস্তবসম্মত হবে না। বিশেষ করে চীনের অভিলাষ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় এই ধারার সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
মাইকেল হিজেল বলেন, ভারসাম্য বজায় রাখতে জাপান, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর অবদান এখন জরুরি। জাপান যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মৈত্রী বজায় রেখে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা ইস্যুতে সম্পর্ক স্থাপনে সমর্থ হয় তাহলে উভয় পই লাভবান হবে।
জাপানের টোকিওতে টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়ান স্টাডিজের পরিচালক জেফ কিংস্টন বলেন, সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে শিনজো অ্যাবের স্বপ্ন (সংবিধান পর্যালোচনা) তার হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। জনমত যদিও সংবিধান পর্যালোচনার পে নেই, তারপরও এ বিষয়ে অ্যাবে যদি গণভোটের দিকে যান, তাহলে উত্তর কোরিয়া ও চীনের কল্যাণে তিনি সে বাধাও পেরিয়ে যাবেন অতি সহজেই।

Category: আন্তর্জাতিক

About admin: View author profile.

Comments are closed.