অর্থনীতি

শেয়ারবাজারে ফের দরপতন : বিনিয়োগকারীদের সতর্কতার আহ্বান জানালেন সংশ্লিষ্টরা

নিজস্ব প্রতিবেদক : মাসের তৃতীয় সপ্তাহ শুরুর প্রথম দিন ২২ অক্টোবর দেশের পুঁজিবাজার বড় হোঁচট খেয়েছে। এ দিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বৃহত্তর সূচক ডিএসইএক্স পূর্বের দিনের চেয়ে ৮৩ দশমিক ৪১ পয়েন্ট নেমে যায়। এটি গত ৫৪ দিনের মধ্যে সবচেয়ে বড় দরপতন। এই দরপতনে বেশিরভাগ বিনিয়োগকারীর মধ্যে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ আবার কী কারণে এমন দরপতন হলো, কিভাবে হলো তা নিয়েই চলছে এখন জল্পনা-কল্পনা।
অনেকে মনে করেন, ২২ অক্টোবরের বড় দরপতন হঠাৎ করে হয়নি, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। তাদের যুক্তি, নানা কারণে বেশ কিছুদিন বাজার নিম্নমুখী থাকায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেশ নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে সূচক সাপোর্ট লেভেলের (৫ হাজার ৬০০ পয়েন্ট) নিচে নেমে এলে আস্থার জায়গাটি আরও নাজুক হয়ে পড়ে। তারপরও অনেক বিনিয়োগকারীর আশা ছিল সূচক হয়ত ৫ হাজার ৫০০ পয়েন্টের নিচে নামবে না। কিন্তু ২২ অক্টোবর লেনদেন শুরুর ১৫ মিনিটের মধ্যে ডিএসইএক্স ২৬ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে এলে তাদের শেষ আশার বাতিও যেন এক ফুৎকারে নিভে যায়। সূচক আরও কমে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় কার আগে কে শেয়ার বিক্রি করবেন, সবার মধ্যে যেন এমন প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বিক্রির এই প্রবল চাপে দর পতন ক্রমেই তীব্র হতে থাকে।
মূলধন আটকে যাওয়ায়
কমেছে লেনদেন ও আস্থা
প্রায় চার মাসের ঊর্ধ্বগতির পর চলতি মাসের শুরুর দিকে এসে বাজার তার ছন্দ হারাতে থাকে। বিশেষ করে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের লভ্যাংশ ঘোষণা, একটি ব্যাংকের রাইট শেয়ার সংক্রান্ত কেলেঙ্কারি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চিড় ধরায়। ব্যাংকের শেয়ারের দর পতন শুরু হলে তাতে বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ আটকে যায়। এতে লেনদেন কমে আসে বাজারে। অন্যদিকে লেনদেন কমে যাওয়ার ঘটনায় ফের আস্থা কমতে থাকে। এভাবে একটি বৃত্তের মধ্যে প্রবেশ করে বাজার।
আস্থার ঘরে ইসলামী ব্যাংকের কুড়াল
অনেক দিন পর পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ধীরে ধীরে যে আস্থা ফিরে আসছিল তাতে কুঠারের আঘাত হানে ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। দেশের একটি বড় শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ বাজার থেকে শেয়ার কিনে ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদে আসবে এমন খবরে গত বছরের জুন থেকে ধীরে ধীরে এ ব্যাংকের শেয়ারের দাম বাড়তে থাকে। গত জানুয়ারিতে এক মাসে শেয়ারটির দাম ৬০ শতাংশ বেড়ে ৩০ টাকা থেকে ৪৮ টাকায় উঠে যায়। এরপর কিছুটা মূল্য সংশোধন হলেও শেয়ারের দাম ৪২ টাকা থেকে ৪৪ টাকার মধ্যে উঠা-নামা করতে থাকে। বাজারে গুজব ছিল ব্যাংকটি ভালো লভ্যাংশ দেবে। গত ৩০ মার্চ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ মাত্র ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। গত এক যুগে ব্যাংকটি এত কম লভ্যাংশ দেয়নি। এতে বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে আশাহত হয়। অন্যান্য ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের শেয়ারের দামে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
আশাহত করা লভ্যাংশের দু’দিনের মাথায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ৪০ লাখ শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দেন। কয়েকদিন যেতে না যেতেই খবর আসে ইসলামী ব্যাংকের অন্যতম বড় স্পন্সর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা আইডিবি তাদের হাতে থাকা ৮ কোটি শেয়ারের মধ্যে ৬ কোটি শেয়ার বিক্রি করে দেবে। এসব ঘটনার সম্মিলিত প্রভাবে ১৯ অক্টোবর ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের দাম ৩১ টাকায় নেমে আসে।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে আলোচনায় থাকা সিটি ব্যাংকের লভ্যাংশ ঘোষণাও কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বাজারে। গত ৩০ মার্চ ব্যাংকটি ২৪ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। যদিও ঘোষিত লভ্যাংশের হার আগের বছরের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি, তবু বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আস্থার ঘরে সবচেয়ে বড় আঘাতটি দেয় আইএফআইসি ব্যাংকের রাইট শেয়ার সংক্রান্ত জটিলতা। ব্যাংকের রাইট শেয়ারের রেকর্ড তারিখের ঠিক আগের দিন একজন কথিত বিনিয়োগকারী রাইট প্রস্তাবকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট আবেদন করলে, আদালত তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তাতে পূর্ব ঘোষিত রেকর্ড তারিখেও ব্যাংকটির শেয়ার লেনদেন হয়। শুনানির পর যদিও রিট আবেদনটি খারিজ হয়ে যায়, কিন্তু ততদিনে আস্থার বারোটা বেজে যায়।
বাজারে বিশেষ সাপোর্টের অনুপস্থিতি
যদিও বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ বাজারকে নিজস্ব গতি ও শক্তিতে চলতে দেয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তবু আমাদের বাজারে প্রায়ই এর ব্যত্যয় হয়ে থাকে। দু’মাস আগেও বাজারে বিশেষ সাপোর্ট দেখা গেছে আইসিবিসহ কিছু অদৃশ্য বিনিয়োগকারীর। তখন টানা কয়েকদিনের ঊর্ধ্বগতির পর বাজারে কিছুটা মূল্য সংশোধনের ধারা দেখা গেলেও ওই শক্তির হস্তেেপ কাক্সিক্ষত সেই সংশোধনটুকু হয়নি। দিনের মধ্যভাগে ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ৪০-৫০ পয়েন্ট কমে গেলেও দিন শেষ হয়েছে সূচকের ৩০-৪০ পয়েন্ট উপরের অবস্থান দিয়ে। কিন্তু গত কয়েকদিনের দর পতনে এমন সাপোর্ট বাজারে দৃশ্যমান হয়নি।
বিশেষ মনস্তত্ত্ব
১৯ অক্টোবর ডিএসইএক্স তার সাপোর্ট লেভেল ভেঙে ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টের নিচে নেমে আসার পর থেকেই অনেক বিনিয়োগকারী ভাবতে শুরু করেন, পরবর্তী সাপোর্ট লেভেলের আগে বোধহয় পতন থামবে না। ফলে তারা নতুন বিনিয়োগ না করে পরিস্থিতি পর্যবেণের পথ বেছে নেন। বরং এদের কেউ কেউ ভয়ে উল্টো শেয়ার বিক্রি করেন। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের অপর একটি অংশ আশায় ছিলেন, আইসিবিসহ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা হয়ত বাজারে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেবে যাতে ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৫০০ পয়েন্টের নিচে চলে না যায়। আস্থার সংকট থাকলে শুধু সাপোর্টে যে পতন ঠেকানো সম্ভব হয় না, সেটি এদের অনেকেই হয়ত উপলব্ধি করেননি। ২২ অক্টোবর সকালে সূচক ৫ হাজার ৫০০ পয়েন্টের নিচে চলে আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা শেষ আশাটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেন। ভয়ে তারা যেকোনো মূল্যে হাতের শেয়ার বিক্রিতে ব্যস্ত হয়ে উঠলে বাজারে দর পতন তীব্রতর হয়ে ওঠে।
আতঙ্কের কিছু নেই, তবে ঝুঁকি নিতে হবে
বিশ্লেষকদের মতে, বাজার নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। ইতোমধ্যে যথেষ্ট মূল্য সংশোধন হয়েছে। অন্যদিকে চলতি সপ্তাহের মধ্যে বেশিরভাগ কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়ে যাবে। বিনিয়োগকারীরা তাদের কাক্সিক্ষত শেয়ার বাছাই করে বিনিয়োগে সক্রিয় হবেন। সব মিলিয়ে শিগগিরই বাজার ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন তারা। তবে অনেক বাজার বিশ্লেষক আবার বলেছেন, শেয়ারবাজারে লাভ এবং লসÑ দু’টোই থাকবে। সুতরাং এ ধরনের মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজারে আসতে হবে।