সুচিন্তা ফাউন্ডেশন আয়োজিত সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় : সৎ সাহস আর আত্মবিশ্বাস থাকলে যেকোনো কঠিন কাজ করা সম্ভব

| October 30, 2017

বিশেষ প্রতিবেদক : পদ্মাসেতুতে অর্থায়ন না করতে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদলীয় প্রার্থী হিলারি কিনটনের মাধ্যমে ড. ইউনূস বিশ্বব্যাংককে প্রভাবিত করেছিলেন। পদ্মাসেতু নিয়ে যে ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পাতা হয় এখন সেই ফাঁদেই তাদের পা আটকে গেছে। তখন বিশ্বব্যাংক যাকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেছিল এখন তার বিরুদ্ধেই দুর্নীতির তদন্ত হচ্ছে। তাই ষড়যন্ত্র যতই করেন না কেন কোনো কিছুতেই পদ্মাসেতু আটকে থাকেনি। নিজেদের টাকায় নির্মিত হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মাসেতু। পদ্মাসেতুর উদাহরণ টেনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, সৎ সাহস ও নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস থাকলে যেকোনো কঠিন কাজও করা যায়। আমরা কারও চেয়ে কম নই। গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশে ১০০ মিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। নরওয়েকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে জয় বলেন, বাংলাদেশের সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ে বিদেশিদের সার্টিফিকেটের প্রয়োজন নেই। ২৩ অক্টোবর রাজধানীর একটি হোটেলে সুচিন্তা ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘রাজনীতিতে সত্য-মিথ্যা : পদ্মা সেতুর অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সজীব ওয়াজেদ জয় এসব কথা বলেন। সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অধ্যাপক মোহাম্মদ এ আরাফাতের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন ও কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন।
সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ২০০৯ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে, তখন জানা গেল, গ্রামীণ ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার করেছে। সরকার তদন্ত করে দেখল ১০০ মিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। পরে নরওয়ে সরকার চিঠি দিয়ে জানায়, টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে। আসল ঘটনা হলো ১০০ মিলিয়ন ডলার চুরি করা হয়েছিল। মাত্র ৩০ মিলিয়ন ডলার পরে ফেরত দেয়া হয়েছে। বাকি টাকার কোনো হিসাব নেই। আন্তর্জাতিক একটি কোম্পানির চেয়ারম্যান, যিনি বাংলাদেশসহ এশিয়া-ইউরোপের অনেক দেশেই ব্যবসা করেন, তার সঙ্গে নিজের পরিচয়ের প্রসঙ্গ টেনে জয় বলেন, ওই চেয়ারম্যান একদিন বললেন, তার মতে ইউরোপের সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ দেশ নরওয়ে।
সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, পদ্মাসেতু নিয়ে কম ষড়যন্ত্র হয়নি। বিশ্বব্যাংক সহযোগিতার কথা বললেও পরে তারা সরে গেছে। সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে আমরা পদ্মাসেতু নির্মাণ করে যাচ্ছি। পদ্মাসেতু এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা।
সুশীলদের উচ্চাভিলাষের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীপুত্র জয় বলেন, আমাদের সুশীলদের মধ্যে একটি শ্রেণি আছে; তাদের কাজ সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ানো। দেশে এসে তাদের আর কোনো কাজ নেই। তারা এনজিও করেন, সেমিনার করেন, বক্তব্য দিয়ে বেড়ান। এ এনজিও-সেমিনার কার পয়সায় চলে? বিদেশিদের। এটি তাদের ব্যবসা। তারা হলেন বিদেশিদের গোলাম। সরকারের সমালোচনা না করলে তারা বিদেশ থেকে টাকা আনতে পারবেন না। তাদের আয় বন্ধ হয়ে যাবে। এ সুশীলরাই বলেছিলেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু করলে অর্থনীতিতে চাপ পড়বে। কিন্তু আমরা নির্মাণ করে প্রমাণ করেছি, কোনো চাপ পড়েনি। তিনি আরও বলেন, সুশীলদের একটি রূপ আছে, তারা মনে করেন আমরা তো উচ্চশিতি, ইংরেজি বলি, বিদেশিদের সঙ্গে খাতির, এত টাকা-পয়সা বানিয়েছি; এখন দরকার মতা। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ছাড়া মতায় আসা যায় না। ওয়ান-ইলেভেনে ড. ইউনূস চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারেননি। আওয়ামী লীগ মতায় আসার পর দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে জানিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, বিশ্বে আমাদের অর্থনীতি এখন ৩৩তম। কারণ আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। একের পর এক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করছি। ষড়যন্ত্র কখনও শেষ হয় না। এটি রাজনীতির বাস্তবতা।
পদ্মাসেতুতে অর্থায়ন না করতে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিনটনের মাধ্যমে ড. ইউনূস বিশ্বব্যাংককে প্রভাবিত করেছিলেন বলে দাবি করেন সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের উচ্চপর্যায় থেকে আমাদের জানানো হয়েছে, ড. ইউনূস হিলারি কিনটনকে অনুরোধ করেনÑ বিশ্বব্যাংক যেন বাংলাদেশকে শাস্তি দেয়। এ কারণেই বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতুতে অর্থায়ন করা থেকে সরে গেছে। সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাথা নত করেননি। আমেরিকান এম্বাসির এক প্রতিনিধি আমাকে হাসতে হাসতে দুইবার হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, আপনার ট্যাক্সের অডিট হতে পারে। আমিও হাসতে হাসতে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলাম, করতে পারেন, কিছুই পাবেন না। সৎ থাকার সুবিধা হলো ভয় করতে হয় না।
কারো নাম উল্লেখ না করে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, মানুষের ভালোবাসা ছাড়া কোনোদিন মতায় যাওয়া যায় না। তাই শত শত মিলিয়ন ডলার কামিয়ে তারা (বিএনপি) মতা কিনতে পারেনি। তারা বরাবর ষড়যন্ত্র করেই যাচ্ছে। এখনও তারা সেই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। বারবার অপপ্রচার চালিয়ে সরকারকে জনগণের কাছে বিতর্কিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার দেশের উন্নয়ন করেছে। দেশ ও দেশের জনগণকে ভালোবাসে। তাই কোনো ষড়যন্ত্রই কাজে লাগছে না। আমরা দেশকে অনেক এগিয়ে নিতে পেরেছি। এখন আর আমাদের বিদেশিদের ওপর ভরসা করতে হবে না। আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে।
সেমিনারে জয় বলেন, নিজের দেশকে যারা ছোট করে দেখে তারা কখনও দেশের ভালো চায় না। আমাদের দেশে সুশীলসমাজ রয়েছে, তাদের মুখে কোনোদিন শুনেছেন বাংলাদেশের প্রশংসা। শোনেননি। কারণ তারা নিজের দেশকে নিচে নামাতে পারলেই যেন বড় হয়ে যান। সব সময় তাদের মুখে সমালোচনা শুনবেন। নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে দেশের মানুষের প্রতিও ভালোবাসা থাকে না। আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে গেছে যে, আমরা এখন কারও চেয়ে কম নই। আমরা এখন আত্মনির্ভরশীল জাতি। বিদেশিদের প্রভু মানার দিন শেষ হয়ে গেছে। সরকার দেশে যে পরিমাণ উন্নয়ন কর্মকা- ও জীবন মানের উন্নয়ন করেছে তা আমাদের বারবার বলতে হবে। তারা অপপ্রচার করে সরকারের সব অর্জন ম্লান করার যে চেষ্টা করছে তাতে আমাদের উন্নয়নের কথা বারবার বলতে হবে। এতে তাদের মিথ্যা অপপ্রচার ঢাকা পড়ে যাবে। মিথ্যার মোকাবিলা করতে হলে উন্নয়ন কর্মকা- জোরগলায় তুলে ধরতে হবে। জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে কে ভালো আর কে খারাপ। আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- প্রচার শুরু হলে তাদের মিথ্যা কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। পদ্মাসেতু নিয়ে ইউনূসকে দিয়ে যে ষড়যন্ত্র করানো হয় তা এখন মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে। এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে আমাকেও জড়ানো হয়েছিল। এখন সেই আমেরিকা প্রমাণ পেয়েছে পদ্মাসেতু নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক যাকে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছিল সেই কর্মকর্তাই এখন দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। তিনি দুদকের চেয়ারম্যানকে হুকুম দিয়েছিলেন তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করার। দুদুকের চেয়ারম্যান যেন তার গোলাম। সেই সময় দুদকের চেয়ারম্যান তাকে বলে দিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। অতএব তাদের গ্রেপ্তার করা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জয় বলেন, আমরা বিদেশিদের ওপর কখন থেকে নির্ভরশীল হলাম। যখন ’৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। তখন থেকে আমরা বিদেশিদের গোলাম হয়ে যাই। তারা যা বলে তাই করি। কিন্তু এখন দিন বদল হয়েছে, এখন কিছু বলার আগে ৭ বার চিন্তা করতে হয়। আমরা অঙ্ক করে দেখিয়ে দিয়েছি নিজেদের টাকায় কী করে পদ্মাসেতুর মতো বড় কাজ করতে হয়। তারা নিজেরাই এখন আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সারা বিশ্ব জানে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। আওয়ামী লীগ সরকার দেশের মানুষকে ভালোবাসতে জানে। ভালোবাসা দিয়ে আমরা মানুষের মন জয় করতে পেরেছি। কোনো ষড়যন্ত্র করে নয়। তারা (বিএনপি) যখনই কোনো অস্বাভাবিক সরকার আসত তাদের সঙ্গেই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতো। এখনও দেশে-বিদেশে তাদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই। কিন্তু কোনো লাভ হবে না। ১/১১ সময়ও তারা ষড়যন্ত্র করেছিল। সেই ষড়যন্ত্রে তারা কিছু করতে পারেনি। আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে। দেশের প্রতি ভালোবাসা আছে। তথাকথিত সুশীলসমাজের মতো ভালোবাসা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার চলে না। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, ভবিষ্যতে দেশ আরও এগিয়ে যাবে। আজ যারা উন্নত দেশ একদিন বিশ্ববাসী আমাদেরও সেই সব দেশের সঙ্গে নাম বলবে। দেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে তা আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি বছরের বাজেট দেখলেই বোঝা যায়। প্রতি বছর বাজেটের আকার বেড়েই যাচ্ছে। এই বাজেট জনগণের কল্যাণে দেশের উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে।
সেমিনারে অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, পদ্মাসেতুর মতো মেগা প্রকল্পে বড় বাধা থাকে ভূমি অধিগ্রহণ। সেটা সৈয়দ আবুল হোসেনই অনেকটা এগিয়ে রেখেছিলেন। পদ্মাসেতুর অভিজ্ঞতায় ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, বিশ্বব্যাংক নিম্নমানের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেখভাল করার দায়িত্ব দেয়ার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তা ফিরিয়ে দেয়। সেখান থেকেই ষড়যন্ত্রের শুরু।
অনুষ্ঠানে ইমদাদুল হক মিলন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির মধ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ঘটনাগুলো থেকেই আমাদের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে।
সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অধ্যাপক এ আরাফাত বলেন, পদ্মাসেতুকে ঘিরে মানুষের যে অভিজ্ঞতা তা সকলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র, ষড়যন্ত্র, সুশাসন, দুর্নীতির মতো বিষয়গুলোকে বিচার করতে হবে।
সুচিন্তা ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, পঁচাত্তরের পর থেকে যে অপপ্রচার, এটি কিন্তু আগে মোকাবিলা হতো না। আমরা একটু লাজুক ছিলাম। এখন মিথ্যার মোকাবিলার জন্যই আমাদের জোরগলায় সত্যকে তুলে ধরতে হবে। জয় বলেন, এমনও দেখেছি, নামকরা পত্রিকার এডিটরিয়ালে লেখা হয়েছে, আওয়ামী লীগ করেছে, কিন্তু এটি এত বলার কী দরকার। এর কারণ হলো তারা জানে আওয়ামী লীগ বলতে থাকলে তাদের অপপ্রচার আর কেউ বিশ্বাস করবে না।

Tags:

Category: প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

About admin: View author profile.

Comments are closed.