একাদশ জাতীয় নির্বাচনে জাপার গন্তব্য কোথায়

| November 13, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে এখনও সিদ্ধান্তহীনতায় আছে এরশাদের জাতীয় পার্টি। যদিও ভোটের রাজনীতিতে জাপা বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের প্রতিষ্ঠিত এ দলটির গতিপ্রকৃতি বোঝাটা একটু দুষ্কর। তাদের এরকম ধারণার মূলে রয়েছে অতীতের একাধিক জাতীয় নির্বাচনে জাপার ভূমিকা। তবে জাপা সূত্র বলছে, বরাবরের মতোই এবারও দলটি নিজেদের গুরুত্ব বোঝাতে কৌশলী অবস্থান নেবে। আগামী নির্বাচনে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার কৌশল হিসেবে সরকার ও বিরোধী উভয় শিবিরেই যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। দুদিকে যোগাযোগ রক্ষা করতে দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে দুই জোটের বাইরে গিয়ে তৃতীয় জোট গঠনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। এরই অংশ হিসেবে ছোট ছোট রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বেশকিছু বৈঠক করেছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। বিভিন্ন সময় দলপ্রধান এরশাদও নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেছেন। ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে জয়লাভ করে ক্ষমতায় বসার মতো কথা বলছেন মাঝে মধ্যে। নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে দলের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার কাজে সবকিছুর আগে মনোনিবেশ করতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। দলের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এরশাদ বলেছেন, আগামীতে আমরা এককভাবে নির্বাচনে যাব। আর কারো সঙ্গে জোট নয়। তবে কেউ চাইলে আমাদের সঙ্গে আসতে পারে। এজন্য আগে পার্টিকে শক্তিশালী করতে হবে। তাহলেই মানুষ আমাদের দিকে এগিয়ে আসবে।
বর্তমান সংসদে বিরোধী দল হলেও সরকারে এ দলের রয়েছে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী। দলটির চেয়ারম্যান সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রয়েছেন মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে। বিভিন্ন সময় তিনি এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন দলের নেতাকর্মীদের। জাপার নেতৃত্বে নতুন জোট গঠনের প্রচেষ্টার কথাও আলোচিত হয়েছে জোরেশোরে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের রূপরেখা নিয়ে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা রয়েছেন অন্ধকারে, আর কর্মীদের অবস্থা তথৈবচ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে বা নতুন জোট গঠন করে কিংবা এককভাবে নির্বাচনÑ এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে দলটির অনেক সিনিয়র নেতা।
জাপার এক প্রেসিডিয়াম সদস্য স্বদেশ খবরকে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক মাঠে গুরুত্ব হারানোর মতো কোনো পদক্ষেপ দল এখন নেবে না। জাপা বর্তমানে ৩টি ধারায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টায় আছে। প্রথমত, ১৪ দল ও ২০ দলীয় জোটের বাইরে তৃতীয় জোট গঠন করে নির্বাচনে যাওয়া। এটিই তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে কোনো জোটে না গিয়ে অন্তত শতাধিক আসনে শক্তিশালী প্রার্থী দিয়ে একক নির্বাচন করা। তৃতীয়ত, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে ৫০টি আসন টার্গেট করে নির্বাচনে অংশ নেয়া। তবে এই সবকিছু নির্ভর করছে আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
জাপা মনে করে, দলটি সাংগঠনিকভাবে অতীতের চেয়ে এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। সারাদেশে ৩০০ আসনেই দলীয় প্রার্থী দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় পার্টি। জানা যায়, সে লক্ষ্যে নির্বাচনি প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হতে পারে। জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টিও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচন সংক্রান্ত সব বিষয় তদারকি করছেন পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিজে। জাপার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন মিটিংয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিজ নিজ এলাকায় সময় দেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার এবং তাদের দলীয় প্রচারে যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে দল মনোনীত সম্ভাব্য প্রার্থীর একটি খসড়া তালিকা চূড়ান্ত করেছেন দলটির চেয়ারম্যান। এসব প্রার্থীকে সবুজ সঙ্কেত দেয়া হয়েছে দলের পক্ষ থেকে। এজন্য একটি নির্বাচনি রোডম্যাপও তৈরি করেছেন এইচ এম এরশাদ। জানা যায়, এরশাদ যেকোনো মূল্যে জাপার ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত বৃহত্তর রংপুরকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছেন। অপেক্ষাকৃত তরুণ ও জনগণের কাছে প্রিয়ভাজন নেতাদের নির্বাচনের মাধ্যমে সামনে নিয়ে আসতে চান তিনি। তার ভাবনায়, এভাবেই দল দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাবে। এছাড়া রংপুর অঞ্চলে দলটির গৃহবিবাদ মেটাতে নানামুখী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। দলের চেয়ারম্যানের মতামতের বাইরে যাওয়া নেতাদের বহিষ্কারের আগাম সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে রেখেছেন এরশাদ।
সূত্র জানায়, ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পার্টির প্রমাণ দিতে এসিড টেস্ট হিসেবে এরশাদ বেছে নিয়েছেন রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ইতোমধ্যে প্রার্থী বাছাই চূড়ান্ত হয়েছে। এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ার দলের মনোনয়ন চাইলেও মনোনয়ন নিশ্চিত করা হয়েছে জাতীয় পার্টির রংপুর মহানগরের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাকে। দলটি চাইছে যেকোনোভাবে এবার রংপুর সিটি করপোরেশনে এককভাবে জয়লাভ করতে। এতে আগামী নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে।
এছাড়া দেশের অন্য সব সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও একক প্রার্থী বাছাইয়ের চেষ্টা চলছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে ছাড় না দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে রাজনৈতিক স্বার্থে ছাড় দিলেও ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রার্থীকে ছাড় দিতে বাধ্য করা হবে আওয়ামী লীগকে। ইতোমধ্যে এসব সিটি করপোরেশনে মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনে আগ্রহী প্রার্থীদের তালিকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনি এলাকায় জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক অবস্থা জানানোর জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের নির্দেশ দিয়েছেন চেয়ারম্যান। তবে এ মুহূর্তে সরকারের সঙ্গে কোনো ঝামেলায় জড়াতে চায় না জাপা।
এদিকে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য দলের কর্মকা- ও পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছেন জাপা চেয়ারম্যান। খুব শিগগিরই কয়েকটি জেলায় নতুন কমিটি গঠন করে অপেক্ষাকৃত নিষ্ক্রিয়দের বাদ দেয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে দলটি। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়েই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবেÑ এমন ভাবনা মাথায় রেখে প্রার্থী বাছাইয়ে সময় দিচ্ছেন এরশাদ। বর্তমান সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি অন্য আসনগুলোয় যোগ্য ব্যক্তিকে প্রার্থী করার পরিকল্পনা রয়েছে এরশাদের। জোট-মহাজোটে যোগদানের বিষয়টি তার কাছে বর্তমানে ততটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও দলকে সংগঠিত করে আগামীতে রাজনীতির মাঠে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গড়ে তোলাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
তবে জাপার শীর্ষ নেতারা যে যাই বলুক না কেন সারাদেশে এখন নির্বাচনি আমেজ বইলেও জাতীয় পার্টির তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকরা রয়েছেন বেশ বেকায়দায়। তারা এখনও জানেন না আগামী নির্বাচনে জাপা এককভাবে নাকি জোটগতভাবে নির্বাচন করবে; আবার জোটগতভাবে হলে কার সাথে জোটবদ্ধ হবে দলটি। এ নিয়ে চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে জাপার তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকরা।

Category: রাজনীতি

About admin: View author profile.

Comments are closed.