প্রতিবেদন

করদাতাদের অভূতপূর্ব সাড়ার মধ্য দিয়ে শেষ হলো সপ্তাহব্যাপী আয়কর মেলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : করদাতাদের অভূতপূর্ব সাড়ার মধ্য দিয়ে শেষ হলো সপ্তাহব্যাপী আয়কর মেলা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর আয়োজিত আয়কর মেলার শেষ দিন ৮ নভেম্বর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অভূতপূর্ব এক দৃশ্য চোখে পড়ে। প্রথমে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রিটার্ন জমা নেয়া হলেও করদাতাদের সুবিধার্থে শেষ দিনে রাত ১১টার পরও রিটার্ন জমা নেয়া হয়। এভাবে করদাতাদের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়ার মধ্য দিয়ে সফলভাবে শেষ হয়েছে আয়কর মেলা। গত ১ নভেম্বর রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে আয়কর মেলা শুরু হয়। ৮ নভেম্বর ছিল মেলার শেষ দিন। তাই শেষ মুহূর্তে রিটার্ন জমা দেয়ার হিড়িক পড়ে। সকাল থেকেই আগ্রহী করদাতারা আগারগাঁওয়ে ছুটতে থাকেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলা প্রাঙ্গণ যেন জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
এনবিআর বলেছে, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবারের মেলায় অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। ট্যাক্স আইডি কার্ড নেয়ার জন্য লাইন এত দীর্ঘ হয় যে রাস্তা পর্যন্ত গড়ায়। প্রচ- ভিড়ের কারণে সন্ধ্যার পরে পুরো এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
সূত্র বলেছে, মেলা শেষ হওয়ার পর ১২ ও ১৩ নভেম্বর দেশের সকল কর অঞ্চলে মেলার মতো রিটার্ন জমা নেয়া হবে। কর মেলার পাশাপাশি ২৪ থেকে ৩০ নভেম্বর সারাদেশে শুরু হবে কর সপ্তাহ। তখনও কর অঞ্চলগুলোতে রিটার্ন জমা দেয়া যাবে। ৩০ নভেম্বর পালিত হবে জাতীয় আয়কর দিবস। ওই দিন পর্যন্ত রিটার্ন জমা দেয়া যাবে। তারপর আর জমা নেয়া হবে না। ২০১০ সাল থেকে এ মেলার আয়োজন করে আসছে এনবিআর।
এবারের মেলায় সবমিলিয়ে ২ হাজার ২১৭ কোটি ৩৩ লাখ ১৪ হাজার ২২১ টাকার আয়কর আহরণ করা হয়েছে। এটি গত বছরের চেয়ে ১০৪ কোটি ৩৬ লাখ ৪৭ হাজার ২২১ টাকা বেশি। রিটার্ন জমা দিয়েছেন সাড়ে ৩ লাখের মতো করদাতা। আর সেবা নিয়েছেন ১১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ।
গতবারের মেলায় ২ হাজার ১১২ কোটি ৯৬ লাখ ৬৭ হাজার টাকার কর আদায় হয়েছিল। রিটার্ন জমা দিয়েছিলেন ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯৮ জন। সেবা নিয়েছিলেন ৯ লাখ ২৮ হাজার ৯৭৩ জন। এ হিসাবে এবার মেলায় কর বেড়েছে ৪ দশমিক ১২ শতাংশ। রিটার্ন জমা বেড়েছে ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ। আর সেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়েছে ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
৮ নভেম্বর মেলা সকাল ৮টায় শুরু হয়ে রাত ১০টায় শেষ হওয়ার কথা থাকলেও করদাতা-সেবাগ্রহীতাদের ভিড়ের কারণে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলে। মধ্য রাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, শেষ দিনে আদায়ের পরিমাণ ছিল ৪২৬ কোটি ২০ লাখ টাকা। রিটার্ন দাখিল হয় ৬৬ হাজার ৩৩৩ জনের, সেবা নেন ২ লাখ ২৫ হাজার ৪৫৯ জন।
মেলার শেষ দিনও করদাতা-সেবাগ্রহীতাদের ছিল উপচেপড়া ভিড়। বিশেষ করে কর দেয়ার পর ট্যাক্স কার্ড নিতে ছিল সবার ব্যাপক আগ্রহ, যা এবারই প্রথম চালু হয়। আয়কর মেলার শেষদিন ঢাকাসহ সারাদেশে ৪৮টি স্পটে মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৫৬টি জেলা শহরে, ৩৪টি উপজেলা, ৭১টি উপজেলায় (ভ্রাম্যমাণ) আয়কর মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ১ নভেম্বর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নিমার্ণাধীন জাতীয় রাজস্ব ভবনে ঢাকার মেলা উদ্বোধন করেছিলেন অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান।
মেলা শেষে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মেলার পরিধি ও সেবা গত বছরের চেয়ে কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা হয়। আয়কর মেলা শেষ হলেও আগামী ৯ নভেম্বর থেকে মেলায় বিদ্যমান সব করসেবা, ইনকাম ট্যাক্স আইডি কার্ড কর অঞ্চলে দেয়া হবে বলে এনবিআর জানিয়েছে। ১২ থেকে ২৩ নভেম্বর সব কর অঞ্চলে আয়কর মেলার মতোই রিটার্ন জমা দেয়া যাবে। মেলার পর ২৪ থেকে ৩০ নভেম্বর সারাদেশে সব কর অঞ্চলে আয়কর সপ্তাহ পালিত হবে। সেখানে মেলার পরিবেশে মেলার মতোই সব কর সেবা দেয়া হবে।
৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় মেলা প্রাঙ্গণে আয়কর মেলা ২০১৭-এর সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম প্রধান অতিথি ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, শুরুতে যেখানে দুটি স্পটে মেলা হতো, এবার ১৬৭টি স্পট। এটি একটি বিরাট অর্জন। ট্যাক্স ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে যেন ব্যথা না দেয়া হয় সে আহ্বানও জানান তিনি। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ বলেন, জনগণের যে ভিড় দেখলাম তাতে আগামীতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে মেলা করা যায় কি না সে বিষয়ে রাজস্ব বোর্ডকে ভাবতে হবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান সভাপতির বক্তব্যে চলতি ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে শুধু লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নয়, তা অতিক্রম করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, জাতির জনকের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ১৯৭২-১৯৭৩ সালে মাত্র ১৬৬ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। কালক্রমে তারই সুযোগ্য সন্তান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে এনবিআর।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের রেক্টর (সিনিয়র সচিব) ড. এম আসলাম আলম, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব নুমিতা হালদার। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল জলিল, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব আসাদুল ইসলাম, ফরিদ উদ্দীন আহম্মদ চৌধুরী, সচিব, সুরক্ষা সেবা বিভাগ, দুদকের সচিব শামছুল আরেফিনসহ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ।
মেলায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে সফল মেলা আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন কর অঞ্চল এবং স্টেকহোল্ডার প্রতিষ্ঠানকে সনদপত্র প্রদান করা হয়। পরে মেলাপ্রাঙ্গণে একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। মেলা শেষে সকলে মনভরে এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।