ফিচার

কিডনি রোগের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে জেনে নিন

অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ : প্রতি বছর কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেক মানুষ। এটি একটি জটিল শারীরিক সমস্যা। এর চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল। তবে কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে রাখলে এই রোগ অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ইদানীং কিডনি রোগটি মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। কিডনি রোগটি একটি নীরব ঘাতক। অর্থাৎ কিডনির বিভিন্ন সমস্যায় দুটি কিডনির ৮০ শতাংশই নষ্ট হয়ে যাবে, হয়ত আপনি জানতেও পারবেন না। আর এমন অবস্থা হয়ে গেলে এর চিকিৎসা ওষুধের মাধ্যমে করা যায় না। তখন ডায়ালাইসিস লাগে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ডায়ালাইসিস করতে একটি মানুষের প্রতি বছরে খরচ হয় প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা। তাছাড়া যদি কারো কিডনি রোগ থেকে থাকে, এর সাথে অন্যান্য রোগেরও আশঙ্কা দেখা দেয়। যেমন হৃদরোগ এবং মস্তিষ্কের রোগ। এ েেত্র বলা যায়, আমরা যদি কিডনি রোগ প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করতে পারি বা কী কী কারণে কিডনি রোগ হয় সেটি জানতে পারি এবং যদি সচেতনতা সৃষ্টি করা যায়, তাহলে রোগ অনেকটাই নিরাময় করা সম্ভব।
বলা হয়ে থাকে যে, আপনি আপনার কিডনি সম্বন্ধে জানুন। প্রথমত রক্তচাপ পরীা করে। দ্বিতীয়ত প্রস্রাবে প্রোটিন যাচ্ছে কি না পরীা করে। তৃতীয়ত আপনার ডায়াবেটিস আছে কি নাÑ এই তিনটি জিনিস দেখলে চিকিৎসকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ রোগ সহজেই ধরতে পারেন।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমাদের দেশে ১২ থেকে ১৮ ভাগ লোক উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। ৫ থেকে ৬ ভাগ লোক ডায়াবেটিসে ভুগছে। ৫ থেকে ৬ ভাগ লোকের প্রস্রাবে প্রোটিন যাচ্ছে। হয়ত কারো নেফ্রাইটিস হয়েছে, কিন্তু কিডনির কার্যমতা ভালো আছে, সেটাও এক ধরনের কিডনি রোগ। ডায়াবেটিস আছে, প্রস্রাবে প্রোটিন যাচ্ছে- এটাও কিডনি রোগ। তবে তার মানে এই নয় যে কিডনি ফেইলিউর বা কিডনি অকেজো হয়ে গেছে। এই জায়গায় সবার ভয় কাজ করে। আমরা জানি, ৪০ হাজার লোক প্রতি বছর ক্রনিক কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। কিডনি রোগে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে খুব খারাপ অবস্থায় চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা কিডনি রোগ প্রতিরোধ করতে পারি। যেমন আমাদের যে গোল্ডেন রুল রয়েছে সেগুলো মেনে চললে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। যদি ডায়াবেটিস থাকে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করুন। যদি নেফ্রাইটিস থাকে সেটা পরীা করান। নেফ্রাইটিস হলো দেহের দুটো কিডনি ছাঁকনি হিসেবে কাজ করে, এই ছাঁকনি দিয়ে আমরা ফিল্টার করি, অর্থাৎ রক্তকে পরিশোধিত করি, তখন রক্ত শুদ্ধ হয়ে যায়, সেই ছাঁকনিতে একটা রোগ হয়, সেই রোগে প্রোটিন বের হয়ে যায়। মানে শরীর থেকে অ্যালবুমিন বের হয়ে যায় প্রস্রাবের মাধ্যমে, তখন রক্তে অ্যালবুমিন লেভেল কমে যায়। এ সময় শরীরের ভাস্কুলার অংশ থেকে পানি বেরিয়ে গিয়ে দুটো কোষের মাঝখানে চলে আসে, তখন শরীরে পানি আসে, এটি হলো নেফ্রাইটিস।
সিস্ট সম্বন্ধে একটু কথা বলা দরকার। সিস্ট একটি আঙ্গুর ফলের মতো। ভিতরে পানি, চারদিকে পর্দা। এটি দেহে একটি-দুটি থাকতে পারে। এগুলো যদি বহুল আকারে থাকে, যদি দুটো কিডনিতে ১০টির বেশি করে থাকে তাহলে পলিসিস্টিক কিডনি হয়, যা জন্মগত রোগ। সেটা থেকে উচ্চ রক্তচাপ, প্রস্রাবে সংক্রমণ এসব হয়ে শেষ পর্যন্ত কিডনি ফেইলিউর বা অকার্যকর হবে। তাই এসব বিষয় নিয়মিত পরীা করা উচিত।
আমরা যারা ব্যথানাশক ওষুধ খাই সেগুলো ভয়ঙ্কর তিকর। যাদের কিডনি ভালো আছে তাদের জন্য তেমন না হলেও যাদের কিডনি একটু দুর্বল তাদের জন্য খুবই তিকর। কিডনি দুর্বল কিভাবে বুঝবেন? আপনার হয়ত ডায়াবেটিস আছে, উচ্চ রক্তচাপ আছে, বয়স বেশি ইত্যাদি। বয়স বেশি হলে কিডনির কার্যমতা কমে যায়। তখন যদি আপনি কিডনির ওষুধ খান, তখন খুব খারাপ প্রভাব ফেলবে। তাছাড়া আপনার শরীরে যদি পানির স্বল্পতা থাকে, শরীরে ইডিমা থাকে সেেেত্র এই ওষুধগুলো অত্যন্ত তিকর। নারী দেহের বিভিন্ন ক্যানসার যদি কিডনির ভেতর যায় তখন সমস্যা হতে পারে।
একিউট খোসপাঁচড়া, গলায় ব্যথা ইত্যাদি থেকে নেফ্রাইটিস হয়। আমরা যদি এর চিকিৎসা করি তাহলে এই সমস্যা হবে না। এছাড়া ডায়রিয়া হলে যদি প্রস্রাব কমে যায়, তাহলে বুঝতে হবে কিডনি ভালো কাজ করছে না। কিডনি ভালো আছে কি না, এটি বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় প্রস্রাব কতটুকু হচ্ছে তা সঠিকভাবে ল্য রাখা।
প্রস্রাবের রঙ দেখেও কিন্তু আমরা কিডনি ভালো আছে, কি না বুঝতে পারি। সাদা যদি থাকে তাহলে বুঝতে হবে ভালো কাজ করছে। পানি ঠিকমতো খাচ্ছেন- আর যদি হলুদ হয় তাহলে বুঝতে হবে পানি কম খাচ্ছেন। যেকোনো কারণে যদি রক্তরণ হয়, বিশেষ করে নারীর েেত্র সেপটিক অ্যাবরশন। অ্যাবরশনের েেত্র যদি রক্তের পরিবর্তে রক্ত না দেয়া হয়, তখন কিন্তু রক্তচাপ কমে গিয়ে সমস্যা শুরু হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে যদি রক্ত দেয়া হয়, তখন আর সমস্যা হবে না। আরেকটি বিষয় হলো কোনো গুরুতর সংক্রমণ থেকেও কিন্তু কিডনির রোগ হতে পারে। সব সময় ওষুধ খেতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে। আপনার ওজন ঠিক রাখতে হবে। আদর্শগত যেই ওজন সেটাতে থাকতে হবে। কর্মঠ এবং সচল থাকলে দেখবেন কিডনি ভালো আছে। আবার শিশুরা যে স্কুল থেকে ফিরে খেলাধুলা করছে না আর ফাস্টফুডের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছেÑ এগুলো খেয়াল রাখতে হবে। কেননা এভাবে চললে তারা বড় হয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সেইসাথে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। এসব বিষয় খেয়াল করে নিয়মিত পরীা-নিরীার মাধ্যমে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
লেখক : সাবেক পরিচালক
জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট