জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে নিবন্ধনহীন দল জামায়াত!

| November 13, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। জনগণের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি প্রচারণা। এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও। অবশ্য গ্রেপ্তার আর নির্যাতন আতঙ্কে দলটির রাজনৈতিক কার্যকলাপ চলছে অনেকটা আড়ালে। আদালতের রায়ে নিবন্ধন হারানোর পাশাপাশি বাতিল হয়েছে দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লাও। এর পরও দলকে সুসংগঠিত করার পাশাপাশি আগামী নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন, প্রচার টিম ও নির্বাচন নিয়ে চূড়ান্ত ছক ঠিক করে নীরবে কাজ করছে দলটি। জানা গেছে, জামায়াত অধ্যুষিত ৫১ আসনে স্বতন্ত্রভাবে অংশগ্রহণের বার্তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে। আগামী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই প্রার্থীদের কাছে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি সাংগঠনিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
জামায়াতে ইসলামীর বেশ কয়েকজন নীতিনির্ধারক ও শীর্ষ পর্যায়ের নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জামায়াত প্রাথমিকভাবে তাদের জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে দলটির অতীতকেই মূল্যায়ন করছে। বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে ভোটের মাপকাঠিতে বেশি জনপ্রিয় এলাকাগুলোকেই বেছে নিয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য। সূত্র জানায়, জামায়াত সর্বপ্রথম সংসদ নির্বাচন করে ১৯৭৯ সালে। এ সময় কয়েকটি ইসলামি দলের জোট ইসলামি ডেমোক্র্যাটিক লিগের (আইডিএল) মাধ্যমে জামায়াতের ৬ এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতের ১০ জন নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১৮টি আসনে জয়লাভ করে। ২০০১ সালে দলটি ১৭টি আসনে জয়লাভ করে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত পায় হামিদুর রহমান আযাদ (কক্সবাজার) ও মাওলানা মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম (চট্টগ্রাম) আসন।
দলটির অতীত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জামায়াতের নির্দিষ্ট কিছু আসনকে ঘিরেই ভোটব্যাংক। বিভিন্ন সময় এসব আসন থেকেই নির্বাচিত হন জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্যরা। এর বাইরে যেসব আসনে গত দুটি উপজেলা নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন, সেসব আসনও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে রংপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, ফেনীতে প্রার্থী থাকতে পারে জামায়াতের। সূত্র জানায়, জামায়াতের ৪০ আসনে জয়ের জন্য মরণপণ লড়াই করবে। এক্ষেত্রে তারা জোটের প্রধান শরিক বিএনপিকেও ছাড় দেবে না। প্রয়োজনে এরকম চারটি আসনে প্রার্থিতার ক্ষেত্রে জোটমুক্ত থাকবে দল। এমন একটি প্রস্তাবনাও তৈরি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বগুড়াকেই গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াত। বিভিন্ন উপজেলা নির্বাচনে বগুড়ায় বিএনপি থেকে ভালো ফল লাভ করে জামায়াত। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। বগুড়ায় প্রায় প্রতিটি আসনেই বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী রয়েছে। তাই এসব আসনে বিএনপিও জামায়াতকে ছাড় দেবে না। এর বাইরে রংপুরেও জোটমুক্ত থাকতে চায় জামায়াত।
গত রমজান মাসে জামায়াতের দায়িত্বশীল পর্যায়ে বেশ কয়েকটি সভা হয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন নিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীর মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে আলোচনা হয়। সর্বশেষ গত আগস্টে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে নির্বাচনে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠকে নির্বাচনে গেলে সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি লাভ-ক্ষতির বিষয় নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়। তবে কোনো দল বা সংগঠনের ব্যানারে না গিয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও নেয়া হয়।
সূত্র জানায়, দলের সংসদীয় বোর্ড ইতোমধ্যেই বাকি কাজ শুরু করেছে। দলের গঠনতন্ত্রের ২৫ ধারা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সংসদীয় বোর্ডের দায়িত্বে রয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামত, প্রস্তাব ও তথ্য যাচাই করে এই বোর্ডই প্রার্থিতার বিষয়টি চূড়ান্ত করবে। আগামী নির্বাচনে জামায়াত বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম ও সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছে ১০০ আসনে প্রার্থী দেয়ার কথা জানিয়েছে। জামায়াত তাদের জরিপ অনুযায়ী ৫১টি আসনে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। এর মধ্যে ২৯টি আসনে তাদের জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জরিপ সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এছাড়া ১১টি আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ার পাশাপাশি জয়লাভের সম্ভাবনাও রয়েছে। বাকি ১১ আসনে প্রার্থীদের মাঠপর্যায়ের কাজ ও সরকারি দলের ভূমিকার ওপর অনেকাংশে জয় নির্ধারণ করবে। এছাড়া এসব আসনে সংগঠনের বেশকিছু নেতা রয়েছেন, যারা কর্মীদের কাছে খুব জনপ্রিয়। তাই তাদের নির্বাচনমুখী রাজনীতিতে যুক্ত করার জন্যই এ আসনগুলো বাছাই করা হয়েছে। কেন্দ্র থেকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনের বার্তা দেয়া হলেও নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে হলেও দলীয় প্রতীক ফিরে পাওয়ারও আশা করছেন জামায়াতের অনেক নেতাকর্মী।
জামায়াতের ঢাকা অঞ্চলের দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, জামায়াতের নীতিনির্ধারকরা ৫১ আসনকে টার্গেট করে প্রতি আসনে ২০ জনের একটি করে টিম সংশ্লিষ্ট আসনে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। এরা পালাক্রমে এলাকায় অবস্থান করে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে নির্বাচনের বাস্তব হালচাল তুলে ধরবেন। এসব প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্তভাবে ৫১টি আসনে প্রার্থী মনোনীত করে জামায়াত।
সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এমন কিছু ক্লিন ইমেজের নেতার তালিকা তৈরি করেছে দলটি। আগামী নির্বাচনে এসব নেতাকে দিয়েও দলটি মনোনয়ন দাখিল করাবেন। সূত্র জানায়, স্বতন্ত্রভাবে মনোনয়ন দাখিলে বাধা নেই। এক্ষেত্রে জামায়াতের প্রার্থিতা সংকটে ভোগার শঙ্কা এড়াতে এমন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জানা যায়, গুরুত্ব বুঝে কোনো আসনে দুজন আবার কোনো কোনো আসনে তিনজনকে মাঠে নামাতে চায় দলটি। যাতে নির্বাচনের মনোনয়ন বৈধতার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা তৈরি না হয়। একইভাবে দলটি যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ও আমৃত্যু কারাদ- প্রাপ্তদের পরিবার থেকেও প্রার্থী মনোনয়ন করতে পারে। এক্ষেত্রে মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আবদুল কাদের মোল্লার সন্তানদের মধ্যে থেকে নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। আগ্রহী থাকলে যুদ্ধাপরাধ মামলায় ফাঁসির দ-প্রাপ্ত আলী আহসান মুহম্মদ মুজাহিদের ভাইকে জোটের পক্ষ থেকে ফরিদপুরে প্রার্থী করানোর চিন্তাও আছে দলটির। জামায়াতের নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় থাকা এমন অনেক প্রার্থীদের ইতোমধ্যে গ্রিন সিগন্যাল দেয়া হয়েছে। এরা সংশ্লিষ্ট এলাকায় গণসংযোগ, প্রচার, দান-খয়রাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
রাজধানীর একটি থানার সাবেক আমির জামায়াতের কৌশল সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, বর্তমানে কোনোভাবেই সংঘাত চান না জামায়াতের নীতিনির্ধারকরা। আপাতত একেবারেই নীরব থাকার পরিকল্পনা তাদের। কর্মসূচি পালনের নামে কোনো রকম ঝুট-ঝামেলায় জড়াতে চায় না নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধন হারানো দল জামায়াত।

Category: রাজনীতি

About admin: View author profile.

Comments are closed.