দলীয় মনোনয়ন পেতে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা

| November 13, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে এমপি পদে মনোনয়ন পেতে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীরা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বর্তমান শতাধিক এমপির দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রায় অনিশ্চিত। তাদের বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মীসহ এলাকায় জনসম্পৃক্ততা না থাকা, পরিবারের আত্মীয়স্বজন দ্বারা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং এলাকায় না যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে সংশ্লিষ্ট এমপিদের সাথে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে। এর বিপরীতে বর্তমান এমপি’র আসনে দলের নতুন অন্য প্রার্থীরা দলীয় মনোনয়ন লাভের আশায় আওয়ামী লীগের উন্নয়ন কর্মকা-ের জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছেন। স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য নিজেকে স্থানীয় পর্যায়ে ও কেন্দ্রীয়ভাবে উপস্থাপন করছেন। প্রার্থিতা লাভের আশায় নিজ নির্বাচনি এলাকা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সমানতালে যোগাযোগ স্থাপন করে চলেছেন এসব মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতারা। তবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি মনোনয়ন বোর্ডের একাধিক নেতা স্বদেশ খবরকে বলেছেন, স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, এলাকায় সুপরিচিত, মানুষের কল্যাণে কাজ করেন, দক্ষ সংগঠক, সৎ, নিষ্ঠাবান ও শিক্ষিত, এমন ব্যক্তিরাই এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক পাবেন। সাংগঠনিক কাজে সংশ্লিষ্ট না থাকলেও দলীয় আদর্শকে ধারণ করেন এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে মনোনয়ন দেয়ার সম্ভাবনাও আছে। দলের হাইকমান্ড এসব যোগ্যতাসম্পন্ন নেতাদের সারাদেশ থেকে বাছাই করছে। এবার দুইশ আসনে এমন প্রার্থী দেয়া হবে যারা লড়াই করে বিজয় নিশ্চিত করতে পারবেন। আবার ক্ষেত্রবিশেষে বিএনপির প্রার্থীর প্রভাব, গ্রহণযোগ্যতার বিপরীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন নির্ভর করবে। শতাধিক আসনে বিএনপির প্রার্থী কারা হচ্ছে সেটিও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বর্তমান সংসদে স্বতন্ত্র এমপি রয়েছেন এমন কাউকে কাউকে দলে এনে মনোনয়ন দেয়া হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যেসব এমপি তৃণমূল নেতাকর্মী থেকে বিচ্ছিন্ন, এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা নেই, ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করে নিজস্ব আলাদা বলয় সৃষ্টি করেছেন তারা এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন না এটা অনেকটাই নিশ্চিত। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হয়ে অনেক এমপি নির্বাচনি এলাকায় পা দেননি। আবার কারও স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, ভাই, ভাগ্নে, শ্যালক, শ্বশুরকে দিয়ে এলাকায় কর্মকা- পরিচালনা করছেন। এসব আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও এলাকায় নানা অভিযোগ আছে। আত্মীয়স্বজনদের প্রাধান্য দিতে গিয়ে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত করা হয়েছে ত্যাগী ও পুরনো পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের। নির্বাচনি এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে ‘এমপি লীগ’ গঠন করেছেন কেউ কেউ। এর ফলে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। যার কারণে অনেকে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ না নিয়ে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। যেসব আসনে নিষ্ক্রিয় নেতাকর্মীর সংখ্যা বেশি সেসব আসনে বর্তমান এমপিদের আবারো মনোনয়ন দেয়া হবে না বলে আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক জরিপ দফায় দফায় পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব জরিপ প্রতিবেদনে বর্তমান এমপিদের ভালো ও মন্দ কাজের পর্যালোচনা করেই আগামী নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হবে। ইতোমধ্যে পরিচালিত একাধিক জরিপ রিপোর্ট দলের হাইকমান্ডের হাতে রয়েছে। প্রতিটি রিপোর্ট পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এলাকায় জনপ্রিয় এমপিরা যাতে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বাদ না পড়েন সেটিও হাইকমান্ডের বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি ওই এলাকার অবস্থা, অন্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, এলাকায় তাদের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিকগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিতর্কিত এমপিদের স্থলে এবার জনপ্রিয় নতুন অনেক মুখ দেখা যেতে পারে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে আগামী নির্বাচনে কোন ধরনের প্রার্থী দলের পছন্দ সেটা বারবার বলে আসছেন। কোনো ধরনের বিতর্কিত ভাবমূর্তির কোনো জনপ্রতিনিধিকে এবার মনোনয়ন দেয়া হবে না সেটাও প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড গত এক বছর ধরে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু করেছেন। তারই অংশ হিসেবে বিতর্কিত অনেককে ডেকে এনে সংশোধন হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকমান্ড। এরপরও যারা সংশোধন হননি তাদের আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া অনেক কঠিন হবে।
সূত্র জানায়, গত বছর দলের ২০তম জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের পর সাংগঠনিক সম্পাদকরা জেলায় জেলায় সফর করেছেন। এ সময় স্থানীয় জনগণ ও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বর্তমান এমপিদের অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমান এমপিদের পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থীদের অবস্থান সম্পর্কেও তথ্য নেয়া হচ্ছে। তারা হাইকমান্ডের কাছে সে তথ্য জমা দিয়েছেন।
ঢাকার প্রায় প্রত্যেকটি আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় বর্তমান এমপিদের পরিবর্তে এবার নতুন মুখ দেখা যেতে পারে। এ ধরনের আশঙ্কার কারণে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্যরা আছেন অস্বস্তিতে। তারা মনোনয়ন নিশ্চিত করতে এলাকায় সম্পৃক্ততা বাড়িয়েছেন। কিন্তু দলের সাধারণ সম্পাদক শেষ পর্যায়ে এসে এমপিদের জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর কাজকে লোক দেখানো বলে মনে করছেন। তার মতে, যেসব এমপি ৮-৯ বছরে যা করতে পারেনি, তা তারা আগামী ১০-১১ মাসে কিভাবে করবেন।
জানা গেছে, সম্প্রতি এক দলীয় সভায় আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাদশ জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে বেশ স্পষ্ট করে দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থক ও বর্তমান এমপিদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, যারা এলাকার জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার মতো সক্ষমতা রাখেন কেবল তাদেরকেই এবার এমপি পদে নির্বাচন করার জন্য মনোনয়ন দেয়া হবে; এর কোনোরূপ ব্যত্যয় ঘটবে না। এজন্য সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীদের নিজ নিজ এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোরও তাগিদ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

Category: রাজনীতি

About admin: View author profile.

Comments are closed.