প্রতিবেদন

দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে পটুয়াখালীতে

নিজস্ব প্রতিবেদক : ব্যয়বহুল এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে হাঁটছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে পটুয়াখালীর পায়রায় ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জার্মানির কোম্পানি সিমেন্সের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। পায়রায় নির্মাণাধীন ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র সংলগ্ন এলাকায় এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হবে। পায়রায় আরও একটি ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে যৌথ মূলধনী কোম্পানি গঠন চুক্তি অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গত ৭ নভেম্বর মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে চুক্তিটি অনুমোদন দেয়া হয়। রাষ্ট্রীয় রুরাল পাওয়ার কোম্পানি এবং নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল চায়না বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে এখন আরএন পাওয়ার লিমিটেড নামে একটি যৌথ মূলধনী কোম্পানি গঠন করবে। এই কোম্পানিটিই পায়রাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করবে।
গত ৬ নভেম্বর রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে এক অনুষ্ঠানে এ সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির (এনডব্লিউপিজিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এম খোরশেদুল আলম এবং সিমেন্স দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুনীল মাথুর। এখন পর্যন্ত দেশে নির্মিত বা নির্মাণাধীন কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সবগুলোই ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট থেকে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। পায়রায় ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের এ কেন্দ্রটি নির্মাণ হলে এটি দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থান দখল করবে।
এমওইউতে উল্লেখ করা হয় পটুয়াখালীর ধানখালী এলাকায় ১০০ একর জমির ওপর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ২৮০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৩ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণ হিসেবে জার্মানি দিবে ২৪০ কোটি ডলার, যা মোট ব্যয়ের ৮০ শতাংশ। আমদানিকৃত এলএনজি থেকে ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। যৌথ মালিকানার বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অর্ধেক মালিকানা বাংলাদেশের এবং বাকি অর্ধেক জার্মান কোম্পানি সিমেন্সের। প্রকল্পের মূলধনী বিনিয়োগ ৪০ কোটি ডলারের অর্ধেক ২০ কোটি ডলার সংস্থান করবে এনডব্লিউপিজিসিএল।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, এ প্রকল্পে ব্যবহৃতব্য মেশিনগুলোর জ্বালানি দক্ষতা ৬০ শতাংশ বেশি। পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনে এলএনজিভিত্তিক কেন্দ্রটি বড় ভূমিকা রাখবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, এই প্রকল্পের অর্থায়ন ও ঋণ সহায়তা করবে জার্মানি। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো ইউরোপীয় দেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ এটি।
বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. টমাস প্রিনজ বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির দ্রুত বিকাশ ঘটেছে। বাংলাদেশ এখন মধ্য-আয়ের দেশে পরিণত হতে চলেছে। বাংলাদেশের এই উন্নয়নে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বেশি প্রয়োজন। বিদ্যুৎ সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পিডিবি’র চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ এবং সিমেন্স বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রবাল বোস।
সূত্র বলছে, প্রথম গঠিত বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ কোম্পানিকে অনুসরণ করে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি গঠিত হয়। এই কোম্পানি দুটি ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের একটি করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। এর মধ্যে পায়রাতে নির্মাণাধীন ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্রের কাজ ২৫ শতাংশ শেষ করেছে বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি। রামপালে অন্য কেন্দ্রটি নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। একই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় দুই প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে এই কেন্দ্রটিও নির্মাণ করবে।
রুরাল পাওয়ার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সবুর বলেন, আমরা ইতোমধ্যে প্রকল্পে সমীক্ষার কাজ শেষ করেছি। সমীক্ষায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ দ্রুততার সঙ্গে করতে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানিকে অনুসরণ করার কথা বলা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, কোম্পানি গঠনের পর প্রথম বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হবে। কোম্পানিতে ৬ পরিচালকের সমান অংশ থাকবে বাংলাদেশ এবং চীনের। তিনি জানান এরই মধ্যে প্রকল্পের জমি ভরাটের কাজ শুরু হয়েছে।
প্রসঙ্গত ঋণের অর্থ ছাড়ের আগে প্রকল্প ব্যয়ের ১৫ শতাংশ খরচ করার শর্তে পায়রায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ দেয় নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি।
এর আগে নরিনকো চায়নার সঙ্গে আরপিসিএলের একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। সমঝোতার পরেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয় উভয়পক্ষ। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের কপি হাতে পেলেই রেজিস্ট্রেশনের কাজ শেষ করা হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ৩০ ভাগ অর্থ চীন এবং বাংলাদেশ সরবরাহ করবে। বাকি অর্থ আসবে বৈদেশিক ঋণ সহায়তা থেকে।
আরপিসিএল বলছে প্রাথমিকভাবে চায়না এক্সিম ব্যাংক এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার কথা সরকারকে জানানো হয়েছে। চীনের নরিনকোর সহায়তায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অর্থায়ন নিশ্চিত করা হবে। নরিনকোর কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় অভিজ্ঞতা থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনায় কোনো সমস্যা হবে না বলে মনে করা হচ্ছে।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নতুন এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হবে। বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি থেকে পৌনে এক কিলোমিটার দূরে ধানখালী মৌজায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হবে। খুব শিগগিরই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে। সব প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী বছর থেকেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল নির্মাণ কাজ শুরু হতে পারে।
সূত্র বলছে, দেশের প্রত্যেকটি সরকারি কোম্পানিকে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।
পটুয়াখালীতে এনডব্লিউপিজিসিএলের সঙ্গে আরপিসিএল এবং আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনকে তিনটি ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দু’টি ইউনিট নির্মাণ করা হবে। তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০২১ সালের মধ্যে উৎপাদনে আসবে।