প্রতিবেদন

প্যারাডাইস পেপার্স কেলেঙ্কারি : বিশ্বজুড়ে তোলপাড়

স্বদেশ খবর ডেস্ক : বিশ্বের বহু ক্ষমতাধর ব্যক্তির বিদেশে নামে-বেনামে কোম্পানি খুলে টাকা জমানোর তথ্য প্রকাশ করে হইচই ফেলে দিয়েছে ‘প্যারাডাইস পেপার্স’। পানামা পেপার্সের পর ৬ নভেম্বর প্যারাডাইস পেপার্স নামে এই আর্থিক কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এবারের তালিকায় উঠে এসেছে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সরকারের ঘনিষ্ঠজনসহ অনেক ধনী ব্যক্তির নাম।
ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা গেছে, ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ব্যক্তিগত অর্থের প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার অফশোর কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। কর এড়াতেই রানি সম্ভবত ওই অর্থ অফশোর কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেন। রানি এলিজাবেথ ডুচি অব ল্যানচেস্টার নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেম্যান আইল্যান্ডস অ্যান্ড বারমুডায় বিনিয়োগ করেছেন। ডুচি অব ল্যানচেস্টার রানির ব্যক্তিগত ৫০ কোটি পাউন্ডের সম্পদ ও আয়ের বিষয়টি দেখাশোনা করে। আন্তর্জাতিক কর বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিনিয়োগে অবৈধ কিছু নেই এবং রানি কর দিচ্ছেন না বলেও এটা ইঙ্গিত করছে না। তবে রাজপরিবারের অফশোর কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা উচিত কি না সে প্রশ্ন অবশ্য থেকেই যায়। গরিব ঠকানোর অভিযোগে অভিযুক্ত ব্রিটিশ কোম্পানি ব্রাইট হাউজেও রানির বিনিয়োগ রয়েছে। যুক্তরাজ্যজুড়ে কিস্তিতে ইলেকট্রনিক, গৃহস্থালি পণ্য ও আসবাব সরবরাহ করে ব্রাইট হাউজ। এর বিরুদ্ধে ১ কোটি ৭৫ লাখ পাউন্ড কর ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে।
কর ফাঁকির এই নথিতে নাম এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যমন্ত্রী উইলবার রসের। নব্বইয়ের দশকে ট্রাম্পকে দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করেন রস। প্রেসিডেন্ট হয়ে উইলবার রসকে বাণিজ্যমন্ত্রী করেন ট্রাম্প। রস একটি শিপিং কোম্পানি থেকে লাভের অর্থ নেন। প্রতিষ্ঠানটি রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের জামাতা ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় থাকা দুই রুশের মালিকানাধীন জ্বালানি কোম্পানিকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ করে কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের ক্যাম্পেইন টিমের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তদন্ত করছে গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। বিষয়টি ট্রাম্পকে বেশ অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলেছে। এখন নতুন করে বাণিজ্যমন্ত্রীর রুশ সংশ্লিষ্টতা তাকে আরও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে পারে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর ঘনিষ্ঠ স্টিফেন ব্রনফম্যানের অফশোর কোম্পানিতে লেনদেনে সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। ব্রনফম্যান ট্রুডোর দল লিবারেল পার্টির প্রধান তহবিল সংগ্রাহক। এ ঘটনা কর ফাঁকি ঠেকাতে সোচ্চার ট্রুডোকে নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলবে। এছাড়া ক্ষমতাসীন ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক ডেপুটি চেয়ারম্যান ও অন্যতম অর্থদাতা লর্ড অ্যাশক্রফটের অফশোর বিনিয়োগের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। দেখা গেছে ২০০০ সালে বারমুডার পুন্টা কোরড ট্রাস্টে তিনি কয়েক কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছেন।
বারমুডায় অবস্থিত অ্যাপলবাই নামের একটি আইনি সহায়তাদানকারী প্রতিষ্ঠানের গোপন নথি সংগ্রহ করে তা দেয়া হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসকে (আইসিআইজে)। অ্যাপলবাই গ্রাহকদের কর ফাঁকির পথ বাতলে দেয়। প্রায় ১০০ সংবাদ মাধ্যমের সমন্বয়ে তৈরি এই আইসিআইজে গত বছর পানামা পেপার্স ফাঁস করার পেছনেও ভূমিকা রেখেছিল। এরাই এবার পাওয়া ১ কোটি ৩৪ লাখ নথি পর্যালোচনা করে ‘প্যারাডাইস পেপার্স’ কেলেঙ্কারি নাম দিয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের কর থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন ট্যাক্স হেভেনে (কর দিতে হয় না কিংবা খুবই নিম্নহারে কর দেয়া যায় এমন দেশ) বিনিয়োগ করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার তথ্য প্রকাশ করে। ফাঁস হওয়া নথিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কয়েক ’শ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি ও গোপন আর্থিক ব্যবস্থাপনার তথ্য উঠে এসেছে, যার ক্ষুদ্র একটি অংশ প্রকাশিত হয়েছে বলে জানা গেছে। ফাঁস হওয়া নথিগুলো ৬৭টি দেশের ৩৮০ জন সাংবাদিক এখন তদন্ত করে দেখছেন। তদন্তে ১৮০টি দেশের নাগরিক কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। তবে আইসিআইজে তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে তদন্তের এখন মাত্র শুরু। ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করবে তারা।
প্যারাডাইস পেপার্স কেলেঙ্কারিতে ১৮০ দেশের বিভিন্ন ব্যক্তির নামের পাশাপাশি রয়েছে ৭১৪ ভারতীয়ের হিসাববহির্ভূত সম্পত্তির বিবরণ। তালিকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিমান পরিবহন প্রতিমন্ত্রী জয়ন্ত সিনহা, বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ আর কে সিং, বিজয় মাল্য থেকে শুরু করে করপোরেট লবিস্ট নিরা রাডিয়ার নাম রয়েছে। রাজস্থানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলত, কংগ্রেস নেতা শচীন পাইলটের নামও রয়েছে তালিকায়। পানামা কেলেঙ্কারির মতো প্যারাডাইস কেলেঙ্কারিতেও নাম এসেছে মেগাস্টার অমিতাভ বচ্চনের।
তালিকায় আরো যাদের নাম উঠে এসেছে তাদের মধ্যে কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ব্রায়ান মুলরনি, জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউকিও হাতোয়ামা, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শওকত আজিজ, ভারতের বেসামরিক বিমানমন্ত্রী জয়ন্ত সিনহা, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস, লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট এলেন জনসন সারলিফ, জর্দানের রানি নুর আল হোসেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট মরিসিও মাকরি, জর্জিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিডজিনা ইভানিশভিলি, আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমুডুর ডেভিড গানলাগসন, ইরাকের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আয়াদ আওয়ালি, জর্দানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলী আবু আল রাগিব, কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাম্মাদ বিন জসিম বিন জাবের আল থানি, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেঙ্কো, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল, ভ¬াদিমির পুতিনের ছোটবেলার বন্ধু আর্কাডি ও বরিস রোটেনবার্গ, পুতিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সের্গেই রোলডুগিন, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের চাচাতো ভাই রামি ও হাফেজ মাখলুফ, ব্রিটিশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের বাবা ইয়ান ক্যামেরন, মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের ছেলে আলা মোবারক, পাকিস্তানের পদচ্যুত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ছেলে-মেয়ে মরিয়ম, হাসান ও হুসেইন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের ছেলে নাফিজউদ্দিন, সৌদি আরবের সাবেক উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালেদ বিন সুলতান বিন আবদুল আজিজ, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের ছেলে কোজো আনান প্রমুখ অন্যতম। অ্যাপল, নাইকি, উবারসহ প্রায় ১০০ বহুজাতিক কোম্পানির কর পরিকল্পনার বিস্তারিত উঠে এসেছে ফাঁস হওয়া এসব নথিতে। অ্যাপেলবাইয়ের পাশাপাশি ক্যারিবিয়ান জুরিসডিকশনের কাছ থেকেও তথ্য এসেছে।
গার্ডিয়ান জানায়, প্যারাডাইস পেপার্স একটি বিশেষ অনুসন্ধানী কাজ। দ্য গার্ডিয়ান এবং বিশ্বের ৯৫টি মিডিয়া প্রতিষ্ঠান এই তথ্যানুসন্ধানে কাজ করেছে। দুটি অফশোর সার্ভিস প্রোভাইডরস এবং ১৯টি ট্যাক্স হ্যাভেনস রেজিস্ট্রির তথ্য পাওয়া গেছে। কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বানিয়ে কিভাবে কর ফাঁকি দেয়া যায় তা-ই এই অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।