প্রতিবেদন

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্কে পাকিস্তান হাইকমিশনের ধৃষ্টতা

স্বদেশ খবর ডেস্ক : ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নন, জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক!’ Ñখোদ বাংলাদেশে বসে এমন নির্জলা অপপ্রচার চালাচ্ছে ঢাকার পাকিস্তান হাইকমিশন। পাকিস্তান অ্যাফেয়ার্স নামে একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ১৩ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও গত ২৭ অক্টোবর পাকিস্তান হাইকমিশন তার ফেসবুক পেজে শেয়ার করার মাধ্যমে প্রকাশ করে। সেই ভিডিওতে আরো দাবি করা হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতাই চাননি; তিনি স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিলেন।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, হাইকমিশনের অফিসিয়াল ফেসবুকে কিছু প্রকাশ করার অর্থ সেটি দায়িত্ব নিয়েই প্রচার করা। এর আগেও বিভিন্ন সময় পাকিস্তান হাইকমিশনের ফেসবুক পেজে অন্য দেশের প্রতি বিদ্বেষমূলক প্রচারণা চালানো হয়েছে। এবার বাংলাদেশ নিয়ে যে ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে তার মধ্যে সুস্পষ্ট উসকানিমূলক বক্তব্য রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত বিষয়াদি নিয়ে পাকিস্তান হাইকমিশনের নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও দুরভিসন্ধিমূলক।
পাকিস্তান হাইকমিশন তার ফেসবুকে যে ভিডিওটি শেয়ার করেছে তাতে ইংরেজি ভাষায় তার একটি বর্ণনাও রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘ভিডিওতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মুজিব স্পষ্ট বলছেন যে, তিনি স্বাধীনতা চান না বরং আরো অধিকার চান।’
ভিডিওর শেষ দিকে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে আটক থাকার সময় তাঁর দেখভালকারী ছিলেন বলে দাবিদার এক পাকিস্তানি পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য জুড়ে দেয়া হয়েছে। ভিডিওর বর্ণনায় বলা হয়েছে মুজিবের সঙ্গে তিনিও কারাগারে ছিলেন এবং তিনি সত্য কাহিনিটি বলেছেন। ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এমনকি ভুট্টো যখন মুজিবকে জানালেন যে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে, তখন মুজিব বলেছিলেন, ‘এখনো সময় আছে। তাঁকে রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দিতে দেয়া হোক। তিনি পুরোপুরি স্বাধীনতা থামাতে পারবেন। তবে ভুট্টো এটি প্রত্যাখ্যান করেন।’ তবে ওই পুলিশ কর্মকর্তার দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। বরং তৎকালীন পাকিস্তানি নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের অখ-তা রক্ষার চেষ্টা চালিয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক তা আদালত দ্বারাও স্বীকৃত। মুক্তিযোদ্ধা ডা. এম এ সালামের দায়ের করা এক জনস্বার্থ সংক্রান্ত রিট মামলায় ২০০৯ সালের ২১ জুন বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও বিচারপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদের হাইকোর্ট বেঞ্চ এক ঐতিহাসিক রায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে রায় দেন। সেই সঙ্গে আদালত জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উপস্থাপন করে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, দলিলপত্র-এর তৃতীয় খ- বাতিল ঘোষণা করেন এবং সেই খ-টি দেশ-বিদেশের সব স্থান থেকে বাজেয়াপ্ত ও প্রত্যাহার করারও নির্দেশ দেন।
আদালতের রায়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বলা হয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আদালত বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের লেখা ‘এরা অব শেখ মুজিব’ গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।
আদালত ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউর রহমানের লেখা জাতির জনক শিরোনামের প্রবন্ধের কথা উল্লেখ করে বলেন, জিয়াউর রহমান ওই প্রবন্ধে ২৫ মার্চের বর্ণনা দিলেও সেখানে কোথাও নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে দাবি করেননি।
১৯৭৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান তার ভাষণে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ সম্পর্কে বলার সময়ও নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেননি।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘শেখ মুজিবুর রহমান আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করার পরপরই পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে।’ ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাধীনতা ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একইদিন প্রকাশিত লন্ডনের দ্য টাইমস পত্রিকার প্রধান শিরোনামই ছিল ‘হেভি ফাইটিং অ্যাজ শেখ মুজিবুর ডিক্লেয়ার্স ইস্ট পাকিস্তান ইন্ডিপেনডেন্ট।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। এতে ৩০ লাখ বাংলাদেশি শহীদ হন। এছাড়া নির্যাতিত হন সাড়ে ৪ লাখের বেশি নারী। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান নিজেই তার দেশের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আশ্বাস দিলেও কার্যত তাদের দায়মুক্তি দিয়েছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের অযাচিত হস্তক্ষেপে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দেয়।