প্রতিবেদন

ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পাঁচটি রেল যোগাযোগ প্রকল্প উদ্বোধন করেন হাসিনা-মোদি : বাংলাদেশ-ভারত যোগাযোগ কাঠামোতে যুক্ত হলো নতুন মাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক : ৯ নভেম্বর ২০১৭, তারিখটি ছিল বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। কারণ ওইদিন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পাঁচটি রেল যোগাযোগ প্রকল্প উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য এসব প্রকল্পের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত যোগাযোগ কাঠামোতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেন শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি। উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নয়াদিল্লিতে তাঁর কার্যালয়ে অবস্থান করেন। কলকাতা থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে সবুজ পতাকা নেড়ে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর নয়াদিল্লির কার্যালয় থেকে সবুজ পতাকা নেড়ে কলকাতা ও খুলনার মধ্যে নতুন যাত্রীবাহী ট্রেন ‘বন্ধন এক্সপ্রেসের’ চলাচল উদ্বোধন করেন। তারা একইসঙ্গে ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের উভয় প্রান্তের বহিরাগমন ও কাস্টমস কার্যক্রমও উদ্বোধন করেন। এ সময় প্রতিবেশী দেশগুলোর বন্ধন আরো জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের এই সংযুক্ত হওয়ার নতুন নতুন পথ সার্বিক যোগাযোগ কাঠামোতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। আমাদের সাম্প্রতিক এই যোগাযোগ মহাকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, মানুষ থেকে মানুষে কানেকটিভিটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই কানেকটিভিটি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।
২০০৮ সালে ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে চালু হয় যাত্রীবাহী ট্রেন মৈত্রী এক্সপ্রেস। তবে ট্রেন চালু হলেও ভোগান্তি কিছুটা ছিলই। নিরাপত্তার স্বার্থে যাত্রাপথে দুই দেশের দুই প্রান্তের স্টেশনে ট্রেন থামত। সেখানেই যাত্রীদের নেমে আলাদা কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হতো। এভাবে প্রায় সাড়ে ৯ বছর চলার পর সেই ভোগান্তি দূর হয়ে গেছে ১০ নভেম্বর থেকে। এখন যাত্রীদের ঢাকা ও কলকাতায় ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। অর্থাৎ ঢাকায় ওঠার পর এবং কলকাতায় নামার পর আনুষ্ঠানিকতা পর্ব সারতে হবে। এতে ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে মৈত্রী এক্সপ্রেসের যাত্রা সময় কমে ৬ ঘণ্টায় নেমে আসবে। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৯ নভেম্বর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নতুন এ ব্যবস্থার উদ্বোধন ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে দুই দেশের দুই শীর্ষ নেতা কলকাতা ও খুলনার মধ্যে নতুন যাত্রীবাহী ট্রেন ‘বন্ধন এক্সপ্রেসের’ চলাচল উদ্বোধন করেন। এ দুই শহরের মধ্যে রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল ৫২ বছর। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি একই অনুষ্ঠানে কলকাতার চিতপুরে রেলওয়ে টার্মিনাল, ভারতীয় ১০ কোটি ডলার ঋণে বাংলাদেশে নির্মিত দ্বিতীয় ভৈরব ও দ্বিতীয় তিতাস সেতু উদ্বোধন করেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে কানেকটিভিটি প্রকল্প উদ্বোধন অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদি দুই দেশের জনগণকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বাংলায় বলেন, ‘আজ আমাদের মৈত্রীর বন্ধন আরো সুদৃঢ় হলো।’ বন্ধন এক্সপ্রেস ১৬ নভেম্বর থেকে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু করবে। প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৬টায় ট্রেনটি কলকাতা থেকে ছাড়বে। খুলনায় পৌঁছাবে দুপুর ১টায়। একই দিন ট্রেনটি দুপুর দেড়টায় খুলনা থেকে কলকাতার উদ্দেশে ছেড়ে যাবে।
ভিডিও কনফারেন্সে নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগতভাবে ও ভারতের জনগণের পক্ষে শেখ হাসিনার সুস্বাস্থ্য কামনা করেন। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর নেতাদের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিবেশীদের মতোই হওয়া উচিত। যখনই মনে হবে তখন তাঁরা কথা বলবেন, দেখা করবেন। এগুলো প্রটোকলের বাধায় আটকে থাকা উচিত নয়। মোদি বলেন, কিছুদিন আগে দক্ষিণ এশীয় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ উপলক্ষে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স করেছেন। গত বছর পেট্রাপোলে সমন্বিত চেকপোস্ট উদ্বোধনের সময়ও তাঁরা ভিডিও কনফারেন্স করেছেন। আর এবার শেখ হাসিনার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সংযোগ জোরদারকারী প্রকল্প উদ্বোধন করতে পেরে তিনি আনন্দিত।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষে মানুষে যোগাযোগ। ‘মৈত্রী’ ও ‘বন্ধন’Ñ দুটি ট্রেন সেবা দুই দেশের অভিন্ন লক্ষ্য থেকেই এসেছে। মোদি বলেন, ১৯৬৫ সালের আগে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল দুই দেশের মধ্যে এখন সেই সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উভয় দেশ কাজ করছে। ভারতীয় ঋণে নির্মিত দ্বিতীয় ভৈরব ও দ্বিতীয় তিতাস সেতু বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করবে। বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্বস্ত অংশীদার হওয়া ভারতের জন্য গর্বের বিষয়। সহজ শর্তে ভারতীয় ৮০০ কোটি ডলার অর্থায়নের আওতায় প্রকল্পগুলোর ভালো অগ্রগতি হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে বলেন, দক্ষিণ এশিয়াকে শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাওয়ার লক্ষ্যে তিনি ভারতসহ অন্য নিকট প্রতিবেশীর সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে চান। ‘দক্ষিণ এশিয়াকে একটি শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা ভারত ও অন্যান্য নিকট প্রতিবেশীর সঙ্গে সহযোগিতা করতে চাই, যাতে আমরা সুপ্রতিবেশী হিসেবে পাশাপাশি বাস করতে এবং জনগণের কল্যাণ করতে পারি।’ দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এই সম্পর্ক বজায় থাকা উভয় দেশের উন্নয়নের জন্য জরুরি বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক এ অঞ্চলে এবং অঞ্চল ছাড়িয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।’