প্রতিবেদন

রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থান প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত নেতারা

নিজস্ব প্রতিবেদক : দীর্ঘদিন ধরেই দেশের বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে বাইরে রেখে তৃতীয় একটি রাজনৈতিক জোট গঠনের প্রক্রিয়া চলছিল। কিন্তু সময় অনেক পেরিয়ে গেলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে বিকল্প বা তৃতীয় জোট গঠনের প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন করতে পারেনি উদ্যোক্তারা। তৃতীয় ধারা গঠন সম্পন্ন না হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছেÑ এই জোটের শীর্ষ নেতৃত্বে কে থাকবেন? অনেকেই তৃতীয় ধারার প্রধান হতে চাচ্ছেন। প্রধান হওয়ার দৌড়ে অন্তত ৫ জন নেতা নিজেকে সর্বাধিক যোগ্য ভাবছেন। এই পাঁচ নেতা হলেন ড. কামাল হোসেন, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, আ স ম আবদুর রব, কাদের সিদ্দিকী ও মাহমুদুর রহমান মান্না।
রাজনীতিতে তৃতীয় ধারা সৃষ্টির লক্ষ্যে এই পাঁচ নেতা এখন দফায় দফায় বৈঠক করে চলেছেন। চলতি বছর এ প্রক্রিয়া আরও জোরালো হয়। তবুও জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে পারেননি তারা। জানা গেছে, জোটের নেতৃত্ব কে দেবেন তা নিয়ে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে চলছে তর্কবিতর্ক। সে কারণে জোট গড়ে তুলতে এক ছাদের নিচে আসতে পারছেন না উদ্যোক্তারা।
জানা যায়, জোট গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সম্প্রতি জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রবের উত্তরার বাসভবনে বৈঠক হয়। বৈঠকে অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। বিকল্প জোট গঠনে নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে জেএসডির সিনিয়র সহসভাপতি এম এ গোফরান, বাসদের কেন্দ্রীয় সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজ ও নাগরিক ঐক্যের ঢাকা মহানগরী উত্তরের আহ্বায়ক শহিদুল্লাহ কায়সারকে নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়।
এছাড়া চলতি বছরের এপ্রিলে ড. কামাল হোসেনের বেইলি রোডের বাসভবনে তৃতীয় জোট গঠন নিয়ে বৈঠক হয়। এর কয়েকদিন পর আবারও বৈঠক হয় ড. কামাল হোসেনের দিলকুশার চেম্বারে। সর্বশেষ বৈঠক হয় বি চৌধুরীর বারিধারার অফিসে। এসব বৈঠকে জোট গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের জঙ্গিবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টিসহ জাতীয় ইস্যুতে যুগপৎ আন্দোলনে মাঠে থাকার পরিকল্পনা ছিল। এরপর বড় কোনো ইস্যু সামনে রেখে তৃতীয় জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটানোর কথা ছিল। উদ্যোক্তারা জানিয়েছিলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে এই জোটের প্রধান লক্ষ্য হবে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে দেশব্যাপী জনমত গড়ে তোলা। পাশাপাশি এ ব্যাপারে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা ঘোষণা। এ রূপরেখার আলোকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের দাবিতে রাজপথে নামবে নতুন জোট। নির্বাচনেও অংশ নেবে তারা। কিন্তু এই জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো নেতারা দিতে পারেননি। বরং জোট গঠনে সৃষ্টি হয়েছে নানান টানাপড়েন। আর এই টানাপড়েনের মূলে রয়েছে তৃতীয় ধারার শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে।
তবে শেষ পর্যন্ত জানা গেছে, তৃতীয় ধারার দলগুলোর সমন্বয়ে বিকল্প একটি রাজনৈতিক জোট ডিসেম্বরের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে ওই জোট তিন দলের নাকি পাঁচ দলের হবে তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। কারণ সম্ভাব্য ওই জোট গঠন নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেও এ পর্যন্ত ঐকমত্যে পৌঁছাতে পেরেছে মাত্র তিনটি দল। এগুলো হচ্ছে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্প ধারা, আ স ম রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য। অন্যদিকে নিয়মিত বৈঠকে অংশ নিয়েও জোট গড়ার প্রশ্নে এখনো দ্বিধায় রয়েছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম এবং কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে থাকা ওই পাঁচটি দলের সমন্বয়ে বিকল্প বা তৃতীয় ধারার একটি জোট গঠনের চেষ্টা গত কয়েক বছর ধরেই চলছে। তবে এখনো তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। গত ২ আগস্ট রাতে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্ব দেয়া হয় মাহমুদুর রহমান মান্নাকে। কিন্তু সেটি ড. কামাল হোসেনের মনঃপূত হয়নি বলে দলগুলোর মধ্যে আলোচনা আছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, জোট গঠনের প্রশ্নে গণফোরাম ও কৃষক শ্রমিক দলের নেতারা ‘না’ বা ‘হ্যাঁ’ কোনোটাই জোর দিয়ে বলছেন না। অথচ তারা নিয়মিত বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন। গত দুই মাসে ওই পাঁচটি দলের অংশগ্রহণে অন্তত ৮ দফা বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে গণফোরাম বলছে তাদের সভাপতি ড. কামাল হোসেন বিদেশে রয়েছেন। তিনি বিদেশ থেকে এলে জোট গঠন প্রশ্নে তারা চূড়ান্ত মতামত জানাবে। কাদের সিদ্দিকীও নানা কারণ দেখিয়ে সময় নিচ্ছেন। তবে এতে আশ্বস্ত হতে পারছে না অন্য তিনটি দল। ওই দলগুলোর কয়েকজন নেতা সময়ক্ষেপণের বিষয়টিকে কিছুটা সন্দেহের চোখে দেখছেন। সম্প্রতি এক বৈঠকে গণফোরামের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এত আগে জোট গঠন করা হলে নির্বাচনের আগে তা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। জবাবে বিকল্প ধারার সভাপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, ‘বিয়ের মতো ঘরই ভেঙে যায়! আর এটা তো জোট।’
তবে ড. কামাল হোসেন বিদেশ থেকে ফিরলে তার সঙ্গে আলোচনা করে জোট ঘোষণার দিনক্ষণ ঠিক করা হবে। ঐকমত্য হলে পাঁচ দলের জোট, আর ঐকমত্য না হলে চারদলীয় জোটের ঘোষণা আসবে। আবার শেষ পর্যন্ত কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ না থাকলে ঘোষিত হবে তিনদলীয় জোট।
এ বিষয়ে জেএসডির সভাপতি আ স ম রব স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘জোটের যৌথ ঘোষণার খসড়া প্রস্তুত করার কাজ চলছে। আশা করছি সবাই থাকবে। ড. কামাল হোসেন দেশে ফেরার পর জোট ঘোষণার দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হবে।’ বিকল্প ধারার সভাপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীও আ স ম রবের সঙ্গে মিল দিয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘নতুন ধারার জোটের ঘোষণা শিগগিরই আসবেÑ এটুকু বলতে পারি। তবে দিনক্ষণ চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা এখনো বাকি আছে।’ পাঁচটি দলই জোট গঠনে সম্মত হয়েছে কি না বা এই জোটের নেতা কে হবেন স্বদেশ খবর-এর এমন এক প্রশ্নের জবাবে বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, জোট ঘোষণার সময়ই দেখা যাবে এতে কারা আছেন এবং এর নেতা কে হচ্ছেন।