কলাম

রোহিঙ্গা সমস্যা : প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন প্রসঙ্গে

হাসনাত আবদুল হাই : রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিজয় হয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। যুদ্ধ নয়, শান্তিপূর্ণভাবেই সমস্যাটির সমাধান করতে হবে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই প্রাজ্ঞনীতিই আন্তর্জাতিক মহলের প্রশংসা অর্জন করেছে। দারিদ্র্য ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হলেও বাংলাদেশ যে মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থীদের আশ্রয়ের জন্য আসার পথ খোলা রেখেছে, সীমান্ত উন্মুক্ত রেখেছে, এই বিষয়টি পর্যবেক্ষক মহলের দৃষ্টি এড়ায়নি। স্মরণকালে আর কোনো দেশ এমন মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়ের শিকার নিরপরাধ নর-নারী ও শিশুদের জন্য এমন উদার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন এবং তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসার দৃষ্টান্ত দেখায়নি। মিয়ানমার থেকে সম্প্রতি আসা শরণার্থীরা একদিকে যেমন বাংলাদেশের জন্য আর্থসামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করেছে, একই সঙ্গে বাংলাদেশের আতিথেয়তা লাভ করে তার উদারতার পরিচয় পেয়েছে। এর ফলস্বরূপ রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশের নীতি ও তৎপরতায় বিশ্ব মিডিয়া এবং আন্তর্জাতিক মহল প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তবে প্রশংসা লাভ করে আত্মতৃপ্তি পাওয়ার সময় এখন নয়। সমস্যার অবসান হয়নি, ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। ২৫ আগস্ট থেকে এই লেখা পর্যন্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৬ লাখ ৩ হাজার রোহিঙ্গা নর-নারী সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শতকরা ৫০ ভাগ শিশু। যে গর্ভবতী মায়েরা সীমান্ত অতিক্রম করে এসে সন্তান প্রসব করেছে তাদের সংখ্যাও কম নয়। এসব সদ্য আগত শরণার্থীর সঙ্গে যোগ করতে হচ্ছে কয়েক বছর আগে আসা প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে। তারা দীর্ঘদিন থেকে ছিন্নমূল হয়ে বাস করছে এবং প্রায় মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে। তাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার কোনো আগ্রহ দেখায়নি, আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকেও তাদের প্রত্যাবর্তনের জন্য কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তাদের কেউ কেউ সমুদ্রপথে দালালদের সাহায্যে ত্র“টিপূর্ণ জাহাজে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে বঙ্গোপসাগরে সলিল সমাধি লাভ করেছে, কারো স্থান মিলেছে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গণকবরে। পৃথিবীতে অনেক নৃ-গোষ্ঠীই নির্যাতিত হচ্ছে এবং হয়েছে কিন্তু রোহিঙ্গাদের মতো আর কোনো গোষ্ঠীর এমন করুণ পরিণতি হয়নি। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুটেরেজ বলেন, রোহিঙ্গারাই বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত নৃ-গোষ্ঠী। এই বক্তব্য ছাড়া জাতিসংঘ থেকে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে আর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। শুধু এই বছর জাতিসংঘকে রোহিঙ্গা সমস্যার তীব্রতা এবং তাদের প্রতি অমানবিক আচরণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বেশ সক্রিয় হতে দেখা গেল। বর্তমান মহাসচিব শুধু মিয়ানমারের নৃশংসতার নিন্দাই করেননি, এর আশু নিরসনে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ কাউন্সিলের সভা থেকে সমস্যা নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করেছেন। সভায় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া না হলেও মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের নিন্দা করা হয়েছে এবং রোহিঙ্গা নিধন ও বিতাড়ন থেকে বিরত থাকতে উপদেশ দেয়া হয়েছে। এই বিশেষ অধিবেশনে চীন ও রাশিয়া নেতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করলেও আমেরিকাসহ সব সদস্যদেশ একবাক্যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের অমানবিক আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন থেকে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নীতি অ্যা টেক্সট বুক কেইস অফ এথনিং ক্লিনজিং-এর নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এটা হয়েছে মিয়ানমারের জন্য এক বিরাট নৈতিক পরাজয়। বিশ্বব্যাপী এমন তীব্র সমালোচনা, নিন্দা এবং অপমানজনক পদক্ষেপের অভিজ্ঞতা মিয়ানমারের হয়নি। দেশটি বেশ বিচলিত হয়ে পড়েছে এবং সুর নরম করে বলছে তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে। কিন্তু এই ঘোষণার আন্তরিকতা যে নেই তা বোঝা যাচ্ছে দেশটির সামরিক নেতাদের কথায়। মিয়ানমারের সেনাপ্রধান বলেছেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক কিংবা সে দেশের কোনো নৃ-গোষ্ঠী নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, রোহিঙ্গারা বাঙালি। তাদেরকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী যুগে মিয়ানমারে আনা হয়েছিল। রোহিঙ্গারা বাঙালি বংশোদ্ভূত এ বিষয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু প্রায় দুই শতাব্দী ধরে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে বসবাস করে তারা সে দেশের নাগরিক হয়ে গিয়েছে। তাদের মতো অনেক অভিবাসী এইভাবে বংশানুক্রমে অন্য দেশে বাস করে সেই দেশের নাগরিক হয়ে গিয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই কমবেশি এমন জনসংখ্যা রয়েছে। কিন্তু এই ঐতিহাসিক সত্য অস্বীকার করে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করছে। তাদের ওপর আরোপিত হয়েছে নানা নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ। ফলে তাদেরকে বাস করতে হচ্ছে মানবেতর জীবন।
মিডিয়ারও রাখাইনে যাওয়া নিষিদ্ধ। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের গ্রাম ভস্মীভূত করার পর তাদের মাঠের পাকা ধান কেটে নিচ্ছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এবং ভস্মীভূত গ্রামে ও ফসলের মাঠে পোঁতা হয়েছে সাইনবোর্ডÑ এই জমি মিয়ানমার সরকারের। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ঘোষণা ফাঁকা এবং অনান্তরিকই মনে হয়। বিশ্ব জনমতকে কিছুটা শান্ত করার জন্যই এই জনসংযোগমূলক বক্তব্য।
অং সান সু চি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া হবে তাদের পরিচয়পত্র দেখে। এখানেও রয়েছে শঠতা এবং হঠকারিতার পরিচয়। যারা প্রাণভয়ে পালিয়ে এসেছে তারা কি পরিচয়পত্র আনার সময় পেয়েছে? তাছাড়া যাদের নাগরিকত্বই দেয়া হয়নি তারা পরিচয়পত্র পাবে কোথা থেকে? এসবই যে রোহিঙ্গাদের ফেরত না নেয়ার কৌশল তা বুঝতে কষ্ট হয় না। আরো সন্দেহ সৃষ্টি করেছে এই ঘোষণায় যে, মিয়ানমার প্রতিদিন ৩০০ জন করে রোহিঙ্গা ফেরত নেবে। যেখানে শরণার্থীর সংখ্যা নতুন পুরনো মিলিয়ে প্রায় ১১-১২ লাখ সেই ক্ষেত্রে দৈনিক ৩০০ জন ফেরত নিলে কত বছর লেগে যাবে প্রত্যাবর্তন শেষ করতে। ততদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের পক্ষে কি সম্ভব হবে শরণার্থীর এই বিরাট বোঝা বহন করা?
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত পাঠানো সহজ হবে না, তা বোঝাই যাচ্ছে। আরো কঠিন হবে তাদের শান্তিপূর্ণ এবং মর্যাদার সঙ্গে পুনর্বাসন। সেজন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও প্রচেষ্টার পাশাপাশি থাকতে হবে তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণ। জাতিসংঘ হতে পারে এই তৃতীয় পক্ষ। তারা প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা বাস্তবায়নে ভূমিকা নিলে মিয়ানমারের পক্ষে নানা অজুহাতে রোহিঙ্গাদের ফেরত না নেয়া সম্ভব হবে না। পুনর্বাসনেও জাতিসংঘের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে তাদের পক্ষ থেকে শান্তি রক্ষাকারীদের সরেজমিনে থেকে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। সমস্যাটি এমন যে, কেবল দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে এর সমাধান সম্ভব নয়।
লেখক : কথাশিল্পী ও সাবেক সচিব