সৌদি আরবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নেপথ্য

| November 13, 2017

স্বদেশ খবর ডেস্ক : সৌদি আরবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে ১১ জন প্রিন্স, ৪ জন বর্তমান মন্ত্রী এবং প্রায় ডজনখানেক সাবেক মন্ত্রী, রাজপরিবারের সদস্যসহ দুই শতাধিক শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও আমলা গ্রেপ্তার হওয়ার পর দেশটিতে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে সৌদি ন্যাশনাল গার্ড এবং নৌবাহিনী প্রধানের পদেও করা হয়েছে রদবদল। জানা গেছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে সৌদি বিলিয়নিয়ার প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালাল ও তার কন্যাও রয়েছেন। ইতোমধ্যেই তার মালিকানাধীন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান কিংডম হোল্ডিংসের শেয়ারের মূল্য ১০ শতাংশ পড়ে গেছে। সৌদি স্টক এক্সচেঞ্জে ব্যবসায়িক লেনদেনে ধস নেমেছে।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা জানিয়েছে, অভিযানের ভয়ে ব্যক্তিগত বিমান নিয়ে পালানোর সময় জেদ্দায় কয়েকটি জেটের উড্ডয়ন আটকে দিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। ধারণা করা হচ্ছে ওই জেটগুলোতে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পালিয়ে যাচ্ছিলেন। এই ধরপাকড়ের প্রতি সৌদি আরবের ধর্মীয় নেতারা সমর্থন জানিয়েছেন। দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাদের কাউন্সিল এক টুইট বার্তায় বলেছে, দুর্নীতি দমন অভিযান সৌদি আরবের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্নীতিবিরোধী এই ধরপাকড় এবং দুজন মন্ত্রীকে সরিয়ে দেয়ার পর, সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের একক কর্তৃত্ব সুসংহত হলো। যুবরাজের নেতৃত্বে গঠিত দুর্নীতি দমন কমিটিকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পাশাপাশি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারিরও ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে এই কমিটির লক্ষ্য জনগণের জানমালের সুরক্ষা দেয়া এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের শাস্তি দেয়া। অক্টোবরের মাঝামাঝি প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান কয়েক হাজার আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীকে নিয়ে রিয়াদে একটি বিনিয়োগ সম্মেলন করেন। সেখানে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, সৌদি আরবের আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে তার পরিকল্পনার মূলমন্ত্র হবে ইসলামের কট্টর অবস্থান থেকে উদারনীতিতে ফিরে আসা। তেলের বাইরে সৌদি অর্থনীতির জন্য ভিন্ন এক ধরনের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার খোঁজে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। কিন্তু সৌদি আরবের শীর্ষ পর্যায়ের লোকজনকে আটকের খবরে আর্থিক ব্যবস্থায় ধস নামতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। চলতি বছরের জুনে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হওয়ার পর থেকেই নানা ধরনের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছেন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। তার আদেশে সৌদি নারীরা গাড়ি চালানোর অধিকার পায়।
৪ নভেম্বর সৌদি আরবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার আগে দেশটির বাইরে কম মানুষই মোহাম্মদ বিন সালমানের নাম জানতেন। ২০১৫ সালে তার বাবা যখন সৌদি আরবের বাদশাহ হন, তখন থেকে মোহাম্মদ বিন সালমানের নাম মানুষ শুনতে শুরু করে। মোহাম্মদ বিন নায়েফকে ক্রাউন প্রিন্সের পদ থেকে সরিয়ে মোহাম্মদ বিন সালমানকে ক্রাউন প্রিন্স পদে আসীন করেন তার বাবা এবং সৌদি আরবের বর্তমান বাদশাহ সালমান। নিয়ম অনুযায়ী, ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে যিনি আসীন হন, পরবর্তীতে তিনিই হন সৌদি আরবের বাদশাহ। ক্রাউন প্রিন্স হয়েই ৩১ বছর বয়সী মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবের ভেতরে হয়ে ওঠেন প্রবল ক্ষমতাধর এক ব্যক্তি।
বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্ম ১৯৮৫ সালের ৩১ আগস্ট। সৌদি আরবের বর্তমানে বাদশাহ ৮১ বছর বয়সী সালমান বিন আবদুল আজিজের তৃতীয় স্ত্রীর বড় সন্তান হচ্ছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত কিং সৌদ ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি আইনশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজে করেছেন। ২০০৯ সালে মোহাম্মদ বিন সালমানকে তার বাবার বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তার বাবা সালমান বিন আবদুল আজিজ তখন রিয়াদের গভর্নর ছিলেন। ২০১৩ সাল থেকে মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতার কেন্দ্রে আসতে শুরু করেন। তখন তাকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় ক্রাউন প্রিন্স কোর্টের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হয়। ঠিক এর আগের বছর ২০১২ সালে তার বাবা সালমান বিন আবদুল আজিজ ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে আসীন হয়েছিলেন।
২০১৫ সালে বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজ মারা যাওয়ার পর সালমান বিন আবদুল আজিজ সৌদি আরবের বাদশাহ হন। তিনি ক্ষমতাসীন হবার পর তাৎক্ষণিকভাবে একটি সিদ্ধান্ত নেন। সেটি হচ্ছে তার ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করা। মোহাম্মদ বিন সালমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর ২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ইয়েমেনে শুরু হয় সামরিক অভিযান। হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে দুই বছর ধরে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চললেও তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং সৌদি আরব এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে বাদশাহ সালমান তার ক্ষমতার উত্তরাধিকার হিসেবে বেশ নাটকীয় পরিবর্তন আনেন। মোহাম্মদ বিন নায়েফকে ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে নিয়োগ করা হয়। মোহাম্মদ বিন সালমানকে ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে নিয়োগ করা হয়। একই সাথে মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবের অর্থনীতি এবং উন্নয়ন বিষয়ক কাউন্সিলের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান।
ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার পরই মোহাম্মদ বিন সালমান ২০৩০ সালকে লক্ষ্য করে সৌদি আরবের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক পদক্ষেপ ঘোষণা করেন। দেশের বাইরে তিনি তার বাবা সালমান বিন আবদুল আজিজের প্রতিনিধিত্ব করে বেইজিং ও ওয়াশিংটন সফর করেন। ওয়াশিংটন সফরে গত মার্চ মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে বৈঠকও করেন তিনি। সেই সফরে যুক্তরাষ্ট্র মোহাম্মদ বিন সালমানকে অনেকটা সৌদি বাদশাহর মতোই রিসিপশন দেয়।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানই হচ্ছেন এখন সৌদি আরবের অঘোষিত বাদশাহ। বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ অনেকটাই তার পুত্রের কথামতো চলাফেরা করেন। সৌদি আরবে যে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলছে, তার মূলে রয়েছে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ক্ষমতাকে নিরবচ্ছিন্ন করা। সৌদি বাদশা মনে করছেন, ৪ নভেম্বরের অভিযানে যারা আটক হয়েছেন তারা তার পুত্রের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানতম বাধা। এই বাধা তিনি অতিক্রম করেছেন শীর্ষস্থানীয় কয়েকজনকে আটক করে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোহাম্মদ বিন সালমানের ক্ষমতা নিরবচ্ছিন্ন করার জন্য এই শীর্ষস্থানীয়দের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে তা সময়ই বলে দেবে।

Category: আন্তর্জাতিক

About admin: View author profile.

Comments are closed.