৬৩তম সিপিএ সম্মেলনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ চাইলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : রোহিঙ্গাদের নিঃশর্তভাবে দ্রুত মিয়ানমারে ফেরত নেয়ার সর্বসম্মত প্রস্তাব সিপিএ’র

| November 13, 2017

মেজবাহউদ্দিন সাকিল : নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিন্দা ও দ্রুত সংকট সমাধানের আহ্বান জানানোর মধ্য দিয়ে ৭ নভেম্বর শেষ হয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সংসদীয় সংস্থা কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি কনফারেন্স সিপিএ’র ৬৩তম সম্মেলন। ৫ নভেম্বর শুরু হয়ে ৩ দিনের এ সিপিএ সম্মেলনে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের নিঃশর্তভাবে দ্রুত মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে সেখানে তাদের স্থায়ী নিরাপত্তাসহ পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। ৭ নভেম্বর সিপিএ সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে গৃহীত সর্বসম্মত এক যৌথ বিবৃতিতে এ প্রস্তাব করা হয়েছে। বিবৃতিতে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন-সিপিএ ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের যৌথ আয়োজনে সিপিএ’র সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে রেজুলেশন নেয়ার বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা ও ঐকমত্য থাকলেও সংস্থাটির বিধিগত জটিলতায় শেষ পর্যন্ত রেজুলেশন নেয়া যায়নি। সিপিএ’র বিধি অনুয়ায়ী কোনো বিষয়ে রেজুলেশন নিতে হলে ৬০ দিন আগে প্রস্তাব আকারে তা দাখিল করতে হয়। রোহিঙ্গা ইস্যুটি যেহেতু সাম্প্রতিক ঘটনা সে হিসেবে এ বিষয়ে সিপিএ’র রেজুলেশন নেয়ার সুযোগ নেই। তাই এ বিষয়ে একটি সুপারিশ গ্রহণ করে সম্মেলনের সমাপনী দিন ৭ নভেম্বর একটি বিবৃতি প্রদান করেছে সিপিএ। ৬৩তম সিপিএ’র সাধারণ সভায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের মানবতাবিরোধী সংকট দ্রুত সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সমাজের প্রতি জরুরিভাবে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে একটি বিবৃতি দেয়ার প্রস্তাব জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে গৃহীত হয়। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সিপিএ সম্মেলনের সাধারণ অধিবেশনের সমাপনী পর্বে বাংলাদেশসহ সদস্য দেশগুলোর দাবির প্রেক্ষিতে বিবৃতিটি উত্থাপন করা হয়। পরে সর্বসম্মতভাবে বিবৃতিটি গ্রহণ করা হয়। সম্মেলন থেকে এই বিবৃতিটি সিপিএভুক্ত সকল সংসদ, জাতিসংঘের মহাসচিব এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে পাঠানোর জন্য সিপিএ সেক্রেটারি জেনারেলকে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারে এই উদ্বেগজনক ঘটনা অব্যাহত থাকলে সিপিএ’র পরবর্তী সম্মেলনের সাধারণ অধিবেশনে তা উত্থাপন করতে বলা হয়েছে।
সিপিএ’র বিদায়ী চেয়ারপারসন ও বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাপনী অধিবেশনে চার পৃষ্ঠার এই বিবৃতিটি উত্থাপনের পর অধিবেশনকক্ষে উপস্থিত প্রতিনিধিরা টেবিল চাপড়ে সিপিএ নেতৃবৃন্দকে অভিনন্দন জানান। এ সময় বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতা ও ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া ফ্লোর নিয়ে আনুষ্ঠানিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সিপিএ’র বিবৃতি অনুযায়ী চলমান রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ মিয়ানমারের ওপর আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সম্মেলন শেষে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, সিপিএ সম্মেলনে কোনো নির্ধারিত এজেন্ডা না থাকলেও সদস্য দেশগুলোর প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। সেখানে বাংলাদেশের উত্থাপিত প্রস্তাবের পক্ষে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানান। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে একটি বিবৃতি গ্রহণ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধান হবে বলে সিপিএ আশা করছে। আর কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশের পাশে থাকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা সমস্যা সমাধানে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন।
ওই বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা নির্যাতনের ঘটনায় নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়সহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নাগরিকরা যে মানবেতর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তার দ্রুত সমাধান হতে হবে। সেখানে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ চলছে, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। মিয়ানমার সরকারকে অবিলম্বে নিঃশর্তভাবে এই সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের অতি অল্প সময়ের মধ্যে তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে হবে। তাদেরকে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করতে হবে। একইসঙ্গে তাদের নিরাপত্তা, জীবন-জীবিকা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বিবৃতিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়ে কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। তাদের খাদ্য, বস্ত্র, স্যানিটেশন ও চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকার জন্য কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। এ বিষয়ে সিপিএ’র পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের সুপারিশ, বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণা, ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ)’র ১৩৭তম সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাব এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবনার আলোকে এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করা হোক।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
রোহিঙ্গা নাগরিকদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বলেন, মিয়ানমারকে তার নাগরিকদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে এবং বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চাপ প্রয়োগ করুন। প্রধানমন্ত্রী এবং সিপিএ ভাইস পেট্রন শেখ হাসিনা ৫ নভেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ৬৩তম কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি কনফারেন্সের (সিপিসি) উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাময়িকভাবে আমরা এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা নাগরিককে আশ্রয় দিয়েছি। তিনি বলেন, ‘তাঁর সরকার সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’Ñ এই নীতির ভিত্তিতে প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে সবসময়ই সুসম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এর ফলে ভারতের সঙ্গে গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি এবং স্থল সীমানা চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে। একইভাবে মিয়ানমার এবং ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করাও সম্ভব হয়েছে।
সিপিএ ভাইস পেট্রন শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অমানবিক নির্যাতন এবং তাদের জোরপূর্বক বিতাড়িত করে দেয়া শুধু এ অঞ্চলে নয়, এর বাইরেও অস্থিরতা তৈরি করছে।
সাম্প্রতিককালে মিয়ানমার সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে সে দেশের ৬ লাখ ২২ হাজারেরও বেশি নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে আরও প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূলে একযোগে কাজ করার জন্য কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর প্রতি তাঁর সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কিছু মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকা-ের ফলে নিরীহ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। জঙ্গিবাদ আজ আর কোনো নির্দিষ্ট দেশের সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে জঙ্গিবাদ সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে।
সিপিএ চেয়ারপারসন এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন। সিপিএ মহাসচিব আকবর খান, কমনওয়েলথের যুব প্রতিনিধি আইমান সাদিক এবং সিপিএ কোষাধ্যক্ষ ভিকি ডানও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে কমনওয়েলথের প্রধান হিসেবে সিপিএ পেট্রন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের বাণী পড়ে শোনান কমনওয়েলথ সচিবালয়ের মহাসচিব প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড। অনুষ্ঠানে শিল্পকলা একাডেমি এবং নৃত্যাঞ্চল শিল্পীগোষ্ঠীর সৌজন্যে বাংলাদেশের ইতিহাস ও কৃষ্টি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশকে তুলে ধরে বেশকিছু বর্ণাঢ্য প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়।
সিপিএ ভাইস পেট্রন তাঁর ভাষণে বলেন, এই ঐতিহাসিক নগরী ঢাকায় কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের ৬৩তম সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। বাংলাদেশের জনগণ, সরকার এবং তাঁর নিজের পক্ষ থেকে সকল অতিথিকে স্বাগত জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমাদের প্রথম ও প্রধান নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে গণতন্ত্র এবং সংসদীয় গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করা এবং এসব রীতিনীতি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের পূর্ণ আস্থা তৈরি করা।
সিপিএ এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ যৌথভাবে কনটিনিউয়িং টু অ্যানহান্স দ্য হাই স্ট্যান্ডার্ডস অব পারফরমেন্স অব পার্লামেন্টারিয়ানস এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এই কনফারেন্সের আয়োজন করেছে। এতে ৫২টি দেশের ১৪৪টি জাতীয় ও ৪৪টি প্রাদেশিক সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, সংসদ সদস্যসহ ৫৫০-এর অধিক প্রতিনিধি অংশ নেন।
সিপিএ ভাইস পেট্রন শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ১৯৭৩ সালে সিপিএ-এর সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সিপিএ-এর নির্বাহী কমিটির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
এই পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিশ^ব্যাপী কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সংসদ সদস্যগণের প্রদত্ত এই স্বীকৃতি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক চর্চা ও মূল্যবোধের স্বীকৃতির একটি প্রামাণিক দলিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েমের যে আকাক্সক্ষা এ ভূখ-ের জনগণ লালন করেছিলেন, বহু ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে তা বাস্তবায়িত হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অগ্রভাগে থেকে এই সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এজন্য তাঁকে পাকিস্তান শাসনামলের ২৪ বছরের মধ্যে প্রায় অর্ধেকটা সময় কারাগারে অন্তরীণ থাকতে হয়েছে। যুদ্ধবিধস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের কাজে যখন বঙ্গবন্ধু নিমগ্ন ছিলেন, ঠিক তখনই পরাজিত শক্তির দোসররা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ২১ বছর পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়। আমরা শাসক নই, জনগণের সেবক হিসেবে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে আত্মনিয়োগ করি। মাঝখানে ৮ বছর বিরতির পর আমার দল আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়। আমাদের মূল লক্ষ্য গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ভিত শক্তিশালী করার মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সে লক্ষ্যে আমরা রূপকল্প-২০২১ প্রণয়ন করি। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে আমরা আমাদের কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
বাংলাদেশে তাঁর সরকার একটি দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, জাতীয় সংসদ, বিভিন্ন স্তরের স্থানীয় সরকারসহ আমরা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করেছি। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ দায়িত্ব পালন করছেন। নারীর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গ বৈষম্য নিরসনে আমাদের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে। শেখ হাসিনা বলেন, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অতন্দ্র প্রহরী স্বাধীন এবং শক্তিশালী গণমাধ্যম। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়েছে। নিশ্চিত করা হয়েছে তাদের অবাধ স্বাধীনতা। মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এমডিজি বাস্তবায়নের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় আমরা এসডিজি বাস্তবায়ন করছি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের চলমান সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এসডিজির বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সিপিএ ভাইস পেট্রন শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। ইতোমধ্যে আমরা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা লাভ করেছি। আমাদের প্রত্যাশা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ২০২১ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ^ মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। শেখ হাসিনা কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর প্রতি পৃথিবীকে বিশ্ববাসীর জন্য সুখময়, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাসভূমিতে পরিণত করার উদাত্ত আহ্বান জানান।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে
সহায়তা করুন : রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে রাজনৈতিক ও মানবিক সমর্থন অব্যাহত রাখতে আবারো বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ৭ নভেম্বর রাতে বঙ্গভবনে এক নৈশভোজে ভাষণদানকালে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ বলেন, আমাদের সরকার মানবিক কারণে ১০ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এতে বাংলাদেশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বিদায়ী সিপিএ চেয়ারপারসন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। আব্দুল হামিদ মিয়ানমারে তাদের স্বদেশ ভূমিতে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী প্রত্যাবাসন কামনা করেন। পাশাপাশি তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৫ দফা প্রস্তাব ও কফি আনান কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও যথাযথ মর্যাদাসহকারে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি হামিদ সিপিএ সম্মেলন উপলক্ষে রাজধানীতে আসা ১৪৪টি দেশের জাতীয় এবং ৪৪টি দেশের প্রাদেশিক সংসদের ৫৫০ জন প্রতিনিধির সম্মানে বঙ্গভবনে নৈশভোজের আয়োজন করেন। ৮ দিনব্যাপী ৬৩তম সিপিএ সম্মেলন উপলক্ষে ৫২টি দেশের সিপিএ সদস্যরা বাংলাদেশে আসেন।
রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ নাগরিকত্বসহ সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মুসলমানদের রক্ষায় দ্ব্যর্থহীনভাবে সিপিএ নেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। দেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন এবং নারী ক্ষমতায়নসহ জনগণের আর্থসামাজিক মুক্তি অর্জনের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আব্দুল হামিদ বলেন, আমরা মনে করি উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে কমনওয়েলথ সদস্য দেশগুলো আমাদের সঙ্গে থাকবে। ঢাকা কমনওয়েলথ পরিবারের সঙ্গে একসাথে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নৈশভোজে মন্ত্রী, হুইপ, সিপিএ নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে শেষ দিনেও
সোচ্চার ছিলেন অনেকেই
এজেন্ডায় স্থান না পেলেও ৭ নভেম্বর সম্মেলনের সমাপনী দিনেও সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে সোচ্চার ছিলেন বিভিন্ন দেশের জনপ্রতিনিধিরা। ভারতের রাজ্যসভার সদস্য ও দেশটির স্বনামধন্য অভিনেত্রী রুপা গাঙ্গুলিও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এই অভিনেত্রী বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে কী বলি, সেটা বড় কথা নয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্পিকারের কী অবস্থান সেটাই হচ্ছে কথা। যেদিন ঘটনা ঘটছে সেদিন থেকেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রতি মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
ব্রিটেনের প্রতিনিধি দলের প্রধান ও হাউজ অব লর্ডসের সদস্য জর্জ ফোকেজ বলেন, বাংলাদেশ মানবতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আমরা পশ্চিমারা শরণার্থীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিই। অথচ বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ রোহিঙ্গাদের বুকে টেনে নিয়েছে। তাদের আশ্রয়, খাদ্য, স্বাস্থ্য সেবাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের প্রতি মানবিক আচরণ করছে। এজন্য অনেক অর্থও খরচ করতে হচ্ছে। এজন্য বাংলাদেশ ও এ দেশের জনগণ অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করে কানাডার সংসদ সদস্য আলেক্সান্ডার ম্যান্ডেজ বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিকতা ও উদারতার ক্ষেত্রে বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। রোহিঙ্গা সমস্যাকে নাটকীয় ও জটিল সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সমস্যার সমাধানে কানাডা সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছে। এজন্য আমরা রিফিউজি হিসেবে সবাইকে না হলেও একটি অংশকে কানাডায় আশ্রয় দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এছাড়া ওদের বর্তমান চাহিদা পূরণে কানাডা সরকার সহযোগিতা করছে।

রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফিরিয়ে নিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আহ্বান

স্বদেশ খবর ডেস্ক
রাখাইন রাজ্যে আন্তঃসম্প্রদায় সহিংসতা ও সামরিক বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ বন্ধ করে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। গত ৬ নভেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে মিয়ানমার পরিস্থিতিতে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত প্রেসিডেনশিয়াল বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি ইতালির স্থায়ী প্রতিনিধি সিবাসতিয়ানো কার্ডি পরিষদের পক্ষে বিবৃতিটি পড়ে শোনান। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের তার দেশের নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকার না করলেও বিবৃতিতে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন জানায়, এ বিবৃতি রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের এ পর্যন্ত গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এটি পরিষদে গৃহীত দলিল হিসেবে লিখিত থাকবে।
চীনের আপত্তির কারণে নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের ব্যাপারে কোনো অবরোধমূলক প্রস্তাব আনতে পারছে নাÑ আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে এমন তথ্যের মধ্যেই চীনসহ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী-অস্থায়ী সব সদস্যের সম্মতিতে ওই বিবৃতি গৃহীত হয়েছে। এতে জাতিসংঘ মহাসচিবকে অনুরোধ জানানো হয়েছে যাতে তিনি এই সংকট উত্তরণে একজন বিশেষ উপদেষ্টা নিয়োগ করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখেন। সংকট নিরসনে তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রাখতেও জাতিসংঘ মহাসচিবকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমার পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখতে বদ্ধপরিকর বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতি গ্রহণের ৩০ দিন পর মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে বিবৃতি দিতেও জাতিসংঘ মহাসচিবকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত বর্ণনাতীত সহিংসতার নিন্দা জানানো হয়েছে এবং সেখান থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত মিয়ানমারের নাগরিকদের মানবিক সহায়তা দেয়ায় বাংলাদেশের ভূমিকার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ এই বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে নাখোশ হয়েছে মিয়ানমার। জাতিসংঘে মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি হাও দো সুয়ান এ বিবৃতিকে ‘অযৌক্তিক চাপ’ হিসেবে অভিহিত করে গভীর উদ্বেগ জানান। সংকট নিরসনে এ বিবৃতি সহায়ক হবে না উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, গত ২৫ আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার মধ্য দিয়ে এ ট্র্যাজেডির শুরু এবং বিদ্রোহীদের সঙ্গে বিদেশি জঙ্গিও লড়াই করছে। মিয়ানমারের প্রতিনিধি বলেন, ওই ট্র্যাজেডি মোকাবিলায় মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং দুটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। তবে বিবৃতির কিছু অংশ মিয়ানমার প্রত্যাখ্যান করলেও সংকটের টেকসই সমাধান খুঁজতে অঙ্গীকারের কথা জানিয়েছে। হাও দো সুয়ান বলেন, মিয়ানমার সরকার রাখাইনে শান্তি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করা অব্যাহত রাখবে।

Tags:

Category: প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

About admin: View author profile.

Comments are closed.