ফিচার

৭ নভেম্বর : অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

ড.অরুণ কুমার গোস্বামী : যতই দিন গড়িয়ে যায়, বর্তমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের লক্ষ্যে ইতিহাস ততই ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যায় উপস্থাপিত হতে থাকে। তবে এর মধ্য থেকে সত্য অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। উপমহাদেশের খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার তার ‘পাস্ট অ্যাজ প্রেজেন্ট’ শীর্ষক বইতে বলছেন, ‘যদি বর্তমানকে বৈধতা দেয়ার জন্য অতীতকে স্মরণ করতে হয় তাহলে এ ধরনের একটি অতীতের সত্যপরায়ণতা অব্যাহতভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষা করতে হবে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকা-ের পর ওই বছরের ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকা-ের পর ৭ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের হত্যা করা হয়েছিল। প্রথম হিসেবেই সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের হত্যাকা- মুক্তিযোদ্ধা নামধারী কারো কারো সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একাত্তরের পরাজিত সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানি মতাদর্শের অনুসারী মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে আরো শক্তিশালী করেছে। মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পথ থেকে বিচ্যুত করে পাকিস্তানীকরণের জন্য ৭ নভেম্বর ছিল একটি উল্লেখযোগ্য ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের অংশ।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের রক্তাক্ত অভ্যুদয়ের পরিপ্রেক্ষিতে এদেশের আদিকাল থেকে চলে আসা ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পুনরুজ্জীবিত তথা বাস্তবায়নের এক ঐতিহাসিক সুযোগ আসে। কিন্তু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর থেকে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত সাম্প্রদায়িক শক্তি অসাম্প্রদায়িকতাকে বিতাড়িত করে দেশকে পাকিস্তানীকরণের পথে নিয়ে যেতে থাকে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর বিজয়ী জাতিকে ভেতর থেকে পরাভূত, পরাজিত শক্তিকে উজ্জীবিত এবং বঙ্গবন্ধু সরকারকে বিব্রত করার লক্ষ্যে উঠেপড়ে লেগেছিল ‘মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ কেউ’।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি বিপ্লবের নামে মুক্তিযোদ্ধা-সৈনিকদের হত্যা প্রক্রিয়া একজন ‘মুক্তিযোদ্ধা’ জিয়াউর রহমান কর্তৃক শুরু হয়েছিল এবং ১৯৮১ সালের ৩০ মে সামরিক একনায়ক জিয়াউর রহমানের হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে তার সমাপ্তি ঘটেছিল।
মুক্তিযোদ্ধাদের এই হত্যা প্রক্রিয়াটি আরো আগে ১৯৭৫ সালের আগস্টে সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা এবং ওই বছরের ৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। তথাকথিত সিপাহি বিপ্লবের সম্পর্কে সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস বলেন, ‘উচ্ছৃঙ্খল সেনারা একজন নারী চিকিৎসকসহ ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করেছিল এবং তারা একজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রীকেও হত্যা করেছিল।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতা হত্যার চারদিন পর কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে খালেদ মোশাররফকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ততর হয়েছিল। কর্নেল তাহেরই ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে নতুন জীবন দান করেছিলেন এবং মূলত তিনিই খালেদ মোশাররফ হত্যার জন্য দায়ী। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যে জিয়াকে কর্নেল তাহের মুক্তির স্বাদ দিয়ে নতুন জীবন দান করেছিলেন, ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই সেই জেনারেল জিয়ার নীলনকশা অনুযায়ী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সামরিক ট্রাইব্যুনালে গোপন বিচারের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
লেখক-গবেষক গোলাম মুর্শিদ তার বই ‘ওয়ার অব লিবারেশন অ্যান্ড আফটারওয়ার্ডর্স’-এ লিখেছেন, ১৯৭৫ এর ৬ নভেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর একজন স্বঘোষিত খুনি কর্নেল ফারুক-এর একটি লেন্সার স্কোয়াড, বঙ্গবন্ধু হত্যায় মূল ভূমিকা পালনকারী আর একজন খুনি লেন্সার মহিউদ্দীনের নেতৃত্বে জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি থেকে ছাড়িয়ে এনেছিল এবং তাকে কর্নেল রশীদের আর্টিলারি রেজিমেন্ট অফিসে নিয়ে গিয়েছিল। গোলাম মুর্শিদ আরো লিখেছেন যে গৃহবন্দি থেকে তার ছাড়া পাওয়ার অব্যবহিত পরে, সে সময়ের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবু সাদত মোহাম্মদ সায়েম-এর সঙ্গে কোনোরকম পরামর্শ ছাড়াই জিয়া বেতার স্টেশনে গিয়ে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। এর পরে জিয়াউর রহমান তার শাসনের বৈধতা প্রমাণের জন্য প্রথমে গণভোট বা রেফারেন্ডাম, তারপরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচন এবং শেষে সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং মোট ২০টি সামরিক ‘ক্যু’-এর মাধ্যমে ক্ষমতাকে পাকাপোক্তভাবে আঁকড়ে ধরেছিল।
১৯৭৭ সালের রেফারেন্ডামে জিয়া একাই প্রার্থী ছিলেন। এই ভোটাভুটিতে মোট ভোটারদের মধ্যে শতকরা ৮৫ ভাগ ভোট দিয়েছিল বলে সে সময়ের নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছিল। প্রকৃতপক্ষে ওইটি ছিল একটি ভোটারবিহীন নির্বাচন। তবে প্রদর্শিত শতকরা ৮৫ ভাগ প্রদত্ত ভোটের মধ্যে জিয়াউর রহমানের পক্ষে ৯৯.৫ ভাগ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল! উল্লেখ্য, সামরিক শাসকগণ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে এ ধরনের মিথ্যা রেফারেন্ডামের প্রচলন পাকিস্তান আমলে শুরু করেছিলেন আইয়ুব খান। পাকিস্তান থেকে মুক্ত হওয়ার পরও ‘মুক্তিযোদ্ধা’ জিয়াউর রহমান ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য সেই পাকিস্তানি সামরিক কৌশলটিই স্বাধীন বাংলাদেশে ব্যবহার করেছিলেন। এরপরে জেনারেল এরশাদও এই মিথ্যা নির্বাচনি কৌশল ব্যবহার করেছেন।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর থেকে হিসাব করলে দেখা যাবে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখলের পর থেকেই এক দিকে যেমন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হত্যা করা হয়েছে, পাশাপাশি আবার বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুনর্বাসিত করা, রাজনীতি করার জন্য খুনিদের ফ্রিডম পার্টি গড়ার সুযোগ করে দেয়া, বঙ্গবন্ধু ও জেলখানায় চার জাতীয় নেতা হত্যার বিচার বন্ধের জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা, মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের পাশাপাশি তাদেরকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। অবৈধভাবে সংবিধান সংশোধন করে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতার রাষ্ট্রীয় মৌলনীতি পরিত্যাগ করে পাকিস্তানি কায়দায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দেয়া হয়েছে। এভাবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চেতনা পুনর্বাসনের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাকে পাকিস্তানি আদলে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার সব আয়োজন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হয়ে ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে তা শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি পেয়েছিল। অবশেষে ১৯৮১ সালের ৩০ মে এ ধরনেরই একটি সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জিয়াউর রহমান নিজেই নিহত হয়েছিল। তার হত্যার পর মেজর জেনারেল মঞ্জুরসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা অথবা নিয়মবহির্ভূত অন্যায় বিচারে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছিল। এভাবে সত্য অনুসন্ধানের চেষ্টা করলে স্বাধীন বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জনমনে সচেতনতা জাগ্রত হবে।
লেখক : চেয়ারম্যান
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ও পরিচালক
সাউথ এশিয়ান স্টাডি সার্কেল
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা