আন্তর্জাতিক

অভ্যন্তরীণ সংকটে কঠিন সময় পার করছে সৌদি আরব

নিজস্ব প্রতিবেদক : আপাতদৃষ্টিতে যদিও মনে হয় সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু গভীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মনে হবে নিজের সঙ্গেই যেন নিজে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে সৌদি আরব। সে যুদ্ধ ক্ষমতার যুদ্ধ। সৌদি আরব নামের রাষ্ট্রটির মতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৌদি রাজপরিবার নিজেদের মধ্যে প্রচ- দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে। এ দ্বন্দ্বে কে জয়ী হবে এই মুহূর্তে বলা না গেলেও এ সংঘাত রাষ্ট্র হিসেবে সৌদিকে অশান্ত করে তুলতে পারে। পাশাপাশি চলমান অভ্যন্তরীণ এ দ্বন্দ্বের কারণে দেশটি ইতোমধ্যেই দুর্বল হতে শুরু করেছে। ‘বিজনেস ইনসাইডার’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে দেশটিতে এ মুহূর্তে যা ঘটছে, তা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। দেশটির বর্তমান বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে তার সৎ ভাই সাবেক বাদশাহ আবদুল্লাহ আল-সৌদের মৃত্যুর পর মতার মসনদে বসেন। তিনি মতায় আসেন দেশটির সরল উত্তরাধিকার সূত্রেই। তবে এরপরই মতার দ্বন্দ্ব একটি জটিল রূপ নেয়।
উত্তরাধিকারের সহজ সমীকরণের বাইরে গিয়ে বাদশাহ সালমান নিজের ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা করেন। ফলে মাত্র ৩২ বছর বয়সী মোহাম্মদ বিন সালমান অল্প সময়ের মধ্যে দেশের সবচেয়ে মতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হন। তবে পর্দার আড়ালের এ মতার দ্বন্দ্ব নগ্নভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ে চলতি বছরের ৪ নভেম্বর। এদিন বাদশাহ সালমান ও তার ছেলে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান দুর্নীতি দমন অভিযানের নামে রাজপরিবারের বহু প্রিন্স, সরকারের সাবেক ও বর্তমান বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেন। সৌদি কর্তৃপরে হিসাবে এ সময়ের মধ্যে পাঁচ শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিশালসংখ্যক এ গ্রেপ্তারের পেছনের কারণটিও খুব সরল। আর সেটা হচ্ছে বাদশাহ সালমান তার ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে সৌদি আরবের পরবর্তী বাদশাহ’র আসনে বসানোর জন্য সব প্রতিবন্ধকতা দূর করার চেষ্টা।
উত্তরাধিকার বাছাইয়ের েেত্র সৌদি আরবের বিশেষ যে ঐতিহ্য ছিল আধুনিক রাজতন্ত্রের ইতিহাসে বাদশাহ সালমানই প্রথম কোনো ব্যক্তি, যিনি সেই ঐতিহ্য ভঙ্গ করেছেন। সৌদি রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আল সৌদের ছেলেদের সর্বসম্মতিতেই সচরাচর উত্তরাধিকার বাছাই করা হয়। কিন্তু বর্তমানে রাজপরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রায় সবাই মৃত। একই সঙ্গে রাজপরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের প্রিন্সের সংখ্যা অনেক হওয়ায় দেশের পরবর্তী বাদশাহ কে হবেন, এটা বেছে নেয়া বেশ কঠিন। বাদশাহ সালমান এেেত্র নিজের ছেলেকেই বেছে নিয়েছেন। রাজপরিবারের মধ্যে মতা বণ্টনের েেত্র অন্যান্য যে ঐতিহ্য ছিল তাও লঙ্ঘন করেছেন তিনি। নিজের ছেলেকে দেশের নিরাপত্তা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণ করে তার হাতকে আরও শক্তিশালী করেছেন। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ এখন একাধারে দেশের প্রতিরামন্ত্রী, কৌশলগত অর্থনৈতিক কাউন্সিলের প্রধান, সৌদির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর পরিচালক এবং গত ৪ নভেম্বর গঠিত দুর্নীতি দমন কমিটির প্রধান। আর বাদশাহ সালমান এর সবই করেছেন তার এক সৎ ভাই ও এক ভাইপোকে মতা থেকে সরিয়ে দিয়ে। তাদের উভয়ই ক্রাউন প্রিন্স ছিলেন এবং তাদের উভয়েরই সৌদি আরবের বাদশাহ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
গুজব ছড়িয়েছে, বাদশাহ সালমানের বিরুদ্ধে রাজপরিবারের করা এক ষড়যন্ত্রের জবাবে পিতা-পুত্র মিলে ৪ নভেম্বরের গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করেন। তবে এ ঘটনা সত্য কি না তা স্পষ্ট নয়। তবে গুজব সত্য হোক বা গ্রেপ্তার অভিযান পূর্বপরিকল্পিতই হোক, ফলাফল একই। সৌদি রাজপ্রাসাদে মোহাম্মদ বিন সালমানের মতার প্রতি এ মুহূর্তে হুমকি তেমন নেই বললেই চলে। মিতাব বিন আবদুল্লাহ নামের এক প্রিন্স প্রতিরা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনীর সমান্তরাল ন্যাশনাল গার্ড বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। মোহাম্মদ সালমান ও মিতাব বিন আবদুল্লাহ গত ৪ নভেম্বর পর্যন্ত সৌদির সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্ব ভাগাভাগি করেছিলেন। সে দিনই মিতাবকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব ব্যক্তিবর্গকে গ্রেপ্তারে দুইটি কাজ সম্পন্ন হয়। প্রথমত, মোহাম্মদ বিন সালমানের নিকট তাদের আনুগত্য নিশ্চিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সালমানপন্থি অংশের দুর্নীতি দমন অভিযানের পথ আরও সুবিন্যস্ত করেছে।
মিতাব বিন আবদুল্লাহকেই যে মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা হচ্ছিল এমন নয়। মিতাবের চেয়েও আরও বড় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল মোহাম্মদ বিন সালমানের। তারা হলেন সাবেক যুবরাজ মুকরিন বিন আবদুল আজিজের পুত্র মানসুর বিন মুকরিন ও সাবেক বাদশাহ ফাহাদের পুত্র আবদুল আজিজ। সাবেক যুবরাজ মুকরিন বিন আবদুল আজিজের পুত্র মানসুর বিন মুকরিন হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহতের কয়েক ঘণ্টা পরেই শোনা যায় সাবেক বাদশাহ ফাহাদের পুত্র আবদুল আজিজ নিহত হয়েছেন। ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)-এর সাবেক স্পেশাল এজেন্ট আলী এইচ সৌফান টুইটের মাধ্যমে আজিজের মৃত্যুর বিষয়টি জানান। তবে ওই টুইটে কিভাবে আজিজের মৃত্যু হয়েছে সে বিষয়ে সৌফান কিছুই লেখেননি। পরে জানা যায়, আবদুল আজিজ বিন ফাহাদ গ্রেপ্তার এড়াতে গিয়ে গুলিতে নিহত হয়েছেন।
৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় ১৭ জন যুবরাজকে গ্রেপ্তারের একদিন পরই ২ যুবরাজের মৃত্যুর খবর জানা যায়। বলা হয়, যে যুবরাজরা মোহাম্মদ বিন সালমানের পথের কাঁটা নয়, তাদের অন্তরীণ রাখা হয়েছে। আর যারা পথের কাঁটা তাদের মেরে ফেলা হয়েছে। মানসুর বিন মুকরিন ও আবদুল আজিজ বিন ফাহাদ দুজনেই ছিলেন সৌদি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। মোহাম্মদ বিন সালমানের পথের কাঁটা দূর করতে এই দুই যুবরাজের মৃত্যু ছাড়া গত্যন্তর ছিল না।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি রাজপরিবারে যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রবল তা ৪ ও ৫ নভেম্বরের ঘটনায় প্রতীয়মান হয়েছে। ৪ নভেম্বর মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রতিদ্বন্দ্বী ১৭ জন প্রিন্সকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর ৫ নভেম্বর মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ২ প্রিন্সকে হেলিকপ্টার ভূপাতিত ও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার মসনদ সুসংহত করার জন্য প্রিন্স গ্রেপ্তার ও মেরে ফেলার যে ঘটনা ঘটেছে, তা ৪ ও ৫ নভেম্বরই শেষ হয়ে যায়নি। সৌদি আরবে ততদিন পর্যন্ত এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া হয়ে থাকবে, যতদিন না সৌদি আরবের বর্তমান বাদশাহ সালমান তার পুত্র মোহাম্মদ বিন সালমানকে সৌদি সিংহাসনে বসাতে পারছেন।