প্রতিবেদন

কে হচ্ছেন পরবর্তী প্রধান বিচারপতি

মেহেদী হাসান : বাংলাদেশে এস কে সিনহা অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে এ সংক্রান্ত নথি ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এখন প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করবে আইন মন্ত্রণালয়। পদত্যাগপত্র গ্রহণের মধ্য দিয়ে কার্যত দেশের প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হয়ে পড়েছে। তবে পরবর্তী বিচারপতি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি দায়িত্ব পালন করে যাবেন। আনুষ্ঠানিকভাবে কবে নাগাদ প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে তা সরকারের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত জানানো হয়নি। এমতাবস্থায় পরবর্তী প্রধান বিচারপতি কে হচ্ছেনÑ তা নিয়ে এখন চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। রাষ্ট্রপতি নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিলেই অবসান ঘটবে সব আলোচনার।
সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করার একক মতা রাষ্ট্রপতির। দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগের পর এখন অপোর পালা কবে রাষ্ট্রপতি ২২তম প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবেন। রাষ্ট্রপতি যাকে নিয়োগ দেবেন তিনিই হবেন ১৯ নম্বর হেয়ার রোডের ২২তম বাসিন্দা।
এস কে সিনহার পদত্যাগপত্র গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হয়ে গেছে বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ও ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, এখন রাষ্ট্রপতিকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত পর্যন্ত অপো করতে হবে। কারণ সংবিধান অনুযায়ী এটা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতির একক এখতিয়ার।
বিদেশে অবস্থানরত বিচারপতি এস কে সিনহা গত ১০ নভেম্বর পদত্যাগপত্রে স্বার করে বিশেষ ব্যক্তির মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের কাছে জমা দেন। এরপর দূতাবাসের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয় সিনহার পদত্যাগপত্র। ১১ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পদত্যাগপত্র পৌঁছে। সংবিধানের ৯৬ (৮) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। পরে তা ১৪ নভেম্বর আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
জানা গেছে, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে আদালতের স্বাভাবিক বিচার কাজ নির্বিঘেœ চলার কারণে পরবর্তী প্রধান বিচারপতি নিয়োগে তাড়াহুড়ো দেখছেন না রাষ্ট্রপতি। কারণ গত ৩ অক্টোবর থেকে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহহাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনের মতা দেয়া হয়েছে। পরবর্তী প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ও দায়িত্বভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহহাব মিঞাই ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
তবে প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হওয়ায় ২২তম প্রধান বিচারপতি কাকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে তা নিয়ে সারাদেশে বিশেষ করে আদালত প্রাঙ্গণে আলোচনা ও কৌতূহলের শেষ নেই। শোনা যাচ্ছে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহহাব মিঞাকেই শেষ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হবে। তবে বিষয়টি রাষ্ট্রপতির ওপর নির্ভর করছে। কারণ রাষ্ট্রপতিই এক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
প্রধান বিচারপতি নিয়োগের েেত্র সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ত্রে ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করিবেন।
বিচারপতি এস কে সিনহার পদত্যাগের পর এখন আপিল বিভাগে ৫ জন বিচারপতি রয়েছেন। তারা হলেন বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা (অবসরে যাবেন ২০১৮ সালের ১০ নভেম্বর), বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন (অবসরে যাবেন ২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর), বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী (অবসরে যাবেন ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর), বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী (অবসরে যাবেন ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর) এবং বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার (অবসরে যাবেন ২০২১ সালের ২৮ ফেব্র“য়ারি)। এখন আপিল বিভাগে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা হবে নাকি তাকে ডিঙিয়ে আপিল বিভাগের অন্য কোনো বিচারপতিকে নিয়োগ দেয়া হবে তা দেখার অপোয় রয়েছে দেশবাসী। তবে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়ার যেমন রীতি রয়েছে, তেমনি অপোকৃত জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে ডিঙিয়ে অপোকৃত কনিষ্ঠ বিচারপতিকেও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের নজির রয়েছে।
বিচারপতি এস কে সিনহা ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত তার প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্বে থাকার কথা ছিল। কারণ সংবিধানের ৯৬ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ৬৭ বছর বয়স পর্যন্ত বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা যায়। কিন্তু উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের মতা সংসদের হাতে পুনর্বহালের বিধান সংবলিত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত রায়ে কিছু অভিমত দিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন এস কে সিনহা। এ অবস্থায় গত ২ অক্টোবর এক মাসের ছুটি নেয়ার পর এস কে সিনহা তা রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন। পরে তিনি বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন। ওই আবেদনে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত তার বিদেশে থাকার কথা উল্লেখ ছিল। রাষ্ট্রপতির অনুমতি পাওয়ার পর গত ১৩ অক্টোবর রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন এস কে সিনহা।
এর আগে নিজ বাসভবনের সামনে অপেমাণ গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি বলেছিলেন, আমি অসুস্থ না। আমি চলে যাচ্ছি। আমি পালিয়ে যাচ্ছি না। আবার ফিরে আসব। কিন্তু এর পরদিন ১৪ অক্টোবর সুপ্রিমকোর্ট একটি বিবৃতি দেয়। এ বিবৃতিতে এস কে সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, বিদেশে অর্থপাচার, নৈতিক স্খলনজনিত অভিযোগসহ সুনির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। ওই বিবৃতিতে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বসে বিচার কাজ পরিচালনা করতে আপিল বিভাগের অন্য ৫ বিচারপতির অস্বীকৃতির কথা বলা হয়। বিচারপতি এস কে সিনহা গত ৬ নভেম্বর অস্ট্রেলিয়া থেকে সিঙ্গাপুর যান। এরপর সেখান থেকে দেশে না ফিরে ১০ নভেম্বর কানাডা চলে যান। কানাডা যাওয়ার সময় এস কে সিনহা সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন।