রাজনীতি

খালেদার মা ও সমঝোতার গুজব

বিভুরঞ্জন সরকার : কয়েকদিনের টানটান উত্তেজনা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শান্তিপূর্ণভাবেই ১২ নভেম্বর জনসভা শেষ করেছে। জনসভা করার অনুমতি পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন মহলেরই সংশয় ছিল। বছর দেড়েক ধরে সরকার বিএনপিকে জনসভা করার অনুমতি দিচ্ছিল না। তাই এবারও অনুমতি পাওয়া নিয়ে দ্বিধা-সংশয় ছিল। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, দেশে যে গণতন্ত্র আছে তার প্রমাণ দিন জনসভা করার অনুমতি দিয়ে। জনসভার অনুমতি দিয়ে দেশে যে গণতন্ত্র আছে তার প্রমাণ সরকার দিয়েছেÑ এমন দাবি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের করেছেন।
কেমন হলো বিএনপির এই জনসভা? এই প্রশ্নের উত্তরে এক কথায় বলা যায় দীর্ঘদিন পর বিএনপি একটি বড় জনসভা করে নিজেদের সবল উপস্থিতির কথা জানাতে সক্ষম হয়েছে। সরকার এবং সরকারি দলের মধ্যে এমন একটি ভাব এসেছিল যে, বিএনপি শেষ হয়ে যাচ্ছে, বিএনপি আর নেই ইত্যাদি। কিন্তু ১২ নভেম্বরের জনসভার পর নিশ্চয়ই তাদের ভুল ভাঙবে। বিএনপি এই জনসভা সফল করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। তাদের সর্বাত্মক চেষ্টা ছিল বিপুল জনসমাগম করার। সরকারের দিক থেকে কী কী ধরনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকায় তারা আগেভাগেই সবকিছু গুছিয়ে একটি সফল সমাবেশ করতে সম হয়েছে। তাই বলা যায় বিএনপির উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। তারা এক জনসভা করে কয়েক কদম এগিয়ে গেছে। সারাদেশে বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীরা মনোবল ফিরে পাবে, চাঙা হয়ে উঠবে।
সরকার তথা আওয়ামী লীগ বেশি চালাকি করতে গিয়ে ধরা খেয়েছে। বিএনপিকে জনসভার অনুমতি দিয়ে প্রশংসিত হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে জনসভায় লোক সমাগম কম করার জন্য কিছু পচা ও অকার্যকর অপকৌশল অবলম্বন করে। সরকার যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করেছে, যাতে মানুষ বিএনপির জনসভায় যেতে না পারে। এতে জনদুর্ভোগ বেড়েছে, আকস্মিকভাবে যান চলাচলে বিঘœ ঘটায় মানুষ গন্তব্যে পৌঁছতে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছে। এতে মানুষ বিএনপির ওপর ুব্ধ হয়নি, গালাগাল দিয়েছে সরকারকে, সরকারি দলকে। তাই বলা যায় বিএনপির জনসভার অনুমতি দিয়ে সরকার উদারতার যে উদাহরণ তৈরি করতে চেয়েছে তা ব্যর্থ হয়েছে ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোয় পরিবহন সংকট তৈরি করে। এই অপকৌশল কোনো কাজ দেয়নি। জনসভায় তাতে লোক কম হয়নি। আগের অভিজ্ঞতা থেকে বিএনপি জানত, সরকার এমনটি করতে পারে। সে জন্য ঢাকার বাইরের নেতাকর্মীরা একদিন আগেই ঢাকা চলে এসেছিল। তাই বলা যায় বিএনপির জনসভায় লোক কম দেখানোর সরকারি বাসনা পূরণ হয়নি। জনসভাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে বিএনপি জিতেছে, সরকার তথা আওয়ামী লীগ হেরেছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে ফেরার পর যেসব রাজনৈতিক কৌশল নিচ্ছেন তাতে বিএনপি সুবিধা পাচ্ছে বলেই মনে হয়। তিনি দুর্নীতি মামলায় আদালতে আত্মপ সমর্থন করে দীর্ঘ রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন। গণমাধ্যমে তার বক্তব্য প্রচার হচ্ছে। মানুষের মনে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা নিয়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি তিনি তৈরি করতে পারছেন। আমাদের দেশের মানুষ সাধারণত সরকার পরে কথা কম বিশ্বাস করে। এই সুযোগটি খালেদা জিয়া ভালোভাবেই গ্রহণ করছেন। তিনি দুর্নীতি করেছেন কী করেননি সে প্রশ্ন থেকে এখন বড় হয়ে আসছে তাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দেয়ার জন্য সরকার তড়িঘড়ি করে মামলাটি শেষ করতে চাচ্ছে কি না, সেটা। আদালত স্বাধীনভাবে কাজ করছেÑ এটা কত ভাগ মানুষ বিশ্বাস করেন তা এক গবেষণার বিষয়। খালেদা জিয়া আদালতে কেঁদেছেন। তার অসহায়ত্বের কথা বলেছেন। তিনি যে হয়রানির শিকার, তাও বলেছেন। তার এসব কথা মানুষের মনে সহানুভূতি জাগাতে পারছে কি না তা বলা না গেলেও এটা বোঝা যাচ্ছে যে, তার প্রতি কিছু কিছু মানুষের বিরূপতা কমছে। আওয়ামী লীগের একশ্রেণির নেতাকর্মীর নানা ধরনের বাড়াবাড়ি মানুষকে বিকল্প চিন্তার জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় খালেদা জিয়া নতুন কথা কিছু বলেছেন কি? শেখ হাসিনা বা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন তিনি। সহায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি যদি অটল থাকে তা হলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? সরকার প দৃঢ়তার সঙ্গে বারবার সহায়ক সরকারের দাবি নাকচ করছে। আবার বিএনপি বলছে শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে তারা যাবে না। খালেদা জিয়া তার বক্তৃতায় নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়ে বলেছেন, শুধু মোতায়েন করলে হবে না, ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিতে হবে, যাতে জনগণ ভোট দিতে পারে। যদি সেনাবাহিনী দেয়া না হয়, তা হলে হাসিনার গু-াবাহিনী কেন্দ্র দখল করে মানুষের ওপর অত্যাচার চালাবে। সাধারণ মানুষকে ভোটকেন্দ্রে যেতে দেবে না। তারা একচেটিয়া সিল মারবে আর মতায় থাকবে।
খালেদা জিয়ার এসব কথায় নতুনত্ব কিছু নেই। তবে আওয়ামী লীগের উদ্দেশে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভা থেকে খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘আপনাদের সাধারণ সম্পাদক মাঝে মধ্যে সত্য কথা বলে ফেলেন, পিঠ বাঁচাতে মতায় থাকতে হবে। আমি বলি, না। আমরা আপনাদের মতো ধরব, মারব, জেলে পুরবÑ সেটা করব না। আমরা সহিংসতার রাজনীতি করি না। আমরা আপনাদের শুদ্ধ করব। আপনারা যে মানুষ মারেন, খুন করেন, গুম করেনÑ এগুলো খারাপ কাজ। এগুলো বাদ দিয়ে আপনাদের সত্যিকারের মানুষ বানানোর চেষ্টা আমরা করব।’
এসব কথা বলে বিএনপি নেত্রী কি আওয়ামী লীগের কর্মীদের আশ্বস্ত করলেন, না আরও বেশি ভয় দেখালেন? তার এসব কথা আওয়ামী লীগকে প্রীত করবে, না রুষ্ট করবে? বিএনপি সহিংসতার রাজনীতি করে নাÑ এটা কি বিশ্বাসযোগ্য বয়ান?
খালেদা জিয়া আরও বলেছেন, ‘আমাদের রাজনীতি হলো জাতীয় ঐক্যের। সেজন্য জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছি। বহুদলীয় গণতন্ত্রে বহুমত ও পথ থাকবে। কিন্তু দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে এক হতে হবে।’ খালেদা জিয়ার এসব কথা শুনতে ভালো। চর্চা করা কঠিন। জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি বলতে তিনি কী বোঝাতে চান তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। কারা দেশ ও জনগণের স্বার্থের প,ে সেটা নির্ধারণের মাপকাঠি কী? মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে কি জাতীয় ঐক্য সম্ভব? জোড়াতালি দিয়ে সে রকম ঐক্য হলেও তা কি টেকসই হবে? বহুদলীয় গণতন্ত্রে বহুমত ও পথ থাকার কথা খালেদা জিয়া বলেছেন। কিন্তু সব মত প্রচারের স্বাধীনতা কি কোনো গণতন্ত্র দেয়? গণতান্ত্রিক পশ্চিমা দুনিয়ায়ও বর্ণবাদ, ফ্যাসিবাদের পে প্রকাশ্য প্রচারণা কি চালানো যায়? খালেদা জিয়া মতায় গেলে বাংলাদেশে কি নাস্তিকতাবাদ প্রচারের সুযোগ দেবেন? মুখরোচক কথা বলে মানুষের মনে বিভ্রান্তি না বাড়িয়ে খালেদা জিয়ার উচিত, যতটুকু তিনি করতে পারবেন ততটুকু বলার মধ্যেই সীমিত থাকা।
সম্প্রতি আদালতে বক্তব্য দিতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ করলেও তিনি শেখ হাসিনাকে মা করে দিচ্ছেন। মনে করা হচ্ছিল, তিনি সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতায় আসতে চান বলেই শেখ হাসিনাকে মার কথা বলছেন। প্রশ্ন উঠেছিল, তিনি শেখ হাসিনাকে মা করার কে? অথবা শেখ হাসিনা কি তার কাছে মাপ্রার্থী হয়েছেন? খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা। তিনি মতায়ও নেই। অন্যদিকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এখন দেশের কোনো আদালতে কোনো মামলা নেই। তাহলে শেখ হাসিনাকে মা করার প্রশ্ন আসছে কেন? খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হলে এবং শেখ হাসিনা মতায় না থাকলে মামলা না দেয়ার বিষয়টিই কি তিনি এই ‘মা’র কথা বলে বোঝাতে চেয়েছেন? গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল বোধহয় একেই বলে!
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় মার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘বলেছি, আমি তাদের মা করে দেব। কিন্তু জনগণ জানে, এরা কত অবিচার তাদের সঙ্গে করেছে। সেজন্য জনগণ সেটা মানতে রাজি নয়। তারপরও আমরা বলেছি, আমরা দেশের রাজনীতিতে সুন্দর ও সুষ্ঠু একটা পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চাই। তার জন্য প্রয়োজন গণতন্ত্র।’ তিনি কি তবে আদালতের বক্তব্য থেকে সরে এলেন? তিনি মা করতে চাইলেও জনগণ শেখ হাসিনাকে মা করবে না। এটা কি হুমকিমূলক কথা হয়ে গেল না? খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অন্ধ আক্রোশের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার ‘আক্রোশ’ যে আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আক্রোশের ‘নগ্ন’ বহিঃপ্রকাশ কি রাজনীতির সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে?
বিভিন্ন গণমাধ্যমে সম্প্রতি খবর বের হয়েছে যে, সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতায় আসার চেষ্টা করছে বিএনপি। কী শর্তে, কী পেয়ে, কী ছেড়ে সমঝোতা চেষ্টা চলছে তা এখনো পরিষ্কার নয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপিকে জনসভা করার অনুমতি দেয়া, জনসভায় ব্যাপক উপস্থিতি এবং খালেদা জিয়ার এক ঘণ্টার বেশি সময়ের বক্তৃতাÑ এসব কিছু রাজনীতিতে নতুন কোনো উপাদানের লণ কি না তা ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলেই মনে হয়। ততদিন পর্যন্ত আশা এবং আশাভঙ্গের দোলাচলেই দুলতে হচ্ছে দেশের মানুষকে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক