প্রতিবেদন

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক : বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির অস্তিত্ব, বাঙালি জাতির ইতিহাস। এই ভাষণ এ দেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এই ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শুধু স্বাধীনতার ঘোষণাই দেননি, বাংলার মানুষকে অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে চেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করায় জাতিসংঘের শিা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা-ইউনেস্কোকে ধন্যবাদ জানিয়ে ১৪ নভেম্বর সংসদে আনা প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
এ নিয়ে সংসদে সাধারণ আলোচনার পর সর্বসম্মতভাবে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ সরকারি ও বিরোধী দলের ৫৮ সদস্য প্রায় ৬ ঘণ্টা এই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করেন। এ সময় অনেকেই ৭ মার্চকে জাতীয় দিবস হিসেবে পালনের দাবি জানান। কার্যপ্রণালি বিধির ১৭৪ ধারায় সাধারণ আলোচনার জন্য প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্বপ্রামাণ্য (ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজ) হিসেবে সংস্থাটির ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দেশ ও জাতির সঙ্গে আমরা গর্বিত এবং এজন্য ইউনেস্কোসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে জাতীয় সংসদ ধন্যবাদ জানাচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দুর্ভাগ্য এই জাতির। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর এই ভাষণ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিল। পাকিস্তানিরাও যা পারেনি, তা-ই করা হয়েছিল এ দেশে। মনে হচ্ছিল, পাকিস্তানের প্রেতাত্মারাই দেশ চালাচ্ছিল। শেখ হাসিনা বলেন, ইতিহাস সত্যকে তুলে ধরবেই। হাজার চেষ্টা করেও তা বন্ধ করা যাবে না। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুধু ভাষণই নয়, এ ভাষণ শোষিত, নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের প্রেরণা জোগায়, শক্তি জোগায়। পাকিস্তানি শাসকরা ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এ ভাষণ প্রচার বন্ধ রাখলেও পরদিন ৮ মার্চ রেডিও-টেলিভিশনে এ ভাষণ বাজাতে বাধ্য হয়েছিল ইয়াহিয়া খান।
সংসদ নেতা বলেন, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের সঙ্গে জাতির অস্তিত্ব ইতিহাস জড়িত। এ ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতি উজ্জীবিত হয়েছিল। জনগণের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর যে আত্মার সম্পর্ক, তা তার কালজয়ী ভাষণে প্রকাশ পেয়েছে। সাধারণ মানুষ এ ভাষণ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিল। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৪৮ সাল থেকে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতা ৭ মার্চ ছিল চরম মুহূর্ত। সেদিন তিনি শুধু স্বাধীনতার ইঙ্গিত ও পূর্ব প্রস্তুতির ঘোষণাই দেননি, অর্থনৈতিক মুক্তির কথাও স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি যেমন একদিকে ইতিহাস তুলে ধরেছেন, অসহযোগে কী করতে হয় তা বলেছেন, হরতাল চললেও গরিব মানুষের যাতে কষ্ট না হয় সে নির্দেশনা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু জানতেন, এরপর হয়ত তাকে কথা বলার সুযোগ নাও দিতে পারে পাকিস্তানি শাসকরা। তার অনুপস্থিতিতে কী করতে হবে, সে নির্দেশনাও দিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৪৬ বছর ধরে এই ভাষণ মানুষ শুনছে। আজও এটা পুরনো হয়নি। কিন্তু ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত একটা প্রজন্ম বঞ্চিত হয়েছে। প্রকৃতপে ’৭৫-এর পর ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছিল। পাকিস্তানি প্রেতাত্মারাই তখন দেশ চালিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সত্যকে তুলে ধরবে। হাজার চেষ্টা করলেও তা বন্ধ করা যায় না, এটা প্রমাণ হয়েছে। এই স্বীকৃতি পাওয়ার পুরো প্রক্রিয়া বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ভাষণ দিতে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তের স্মৃতি তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেকে অনেক পয়েন্ট দিয়ে যাচ্ছেন। ঠিক আড়াইটায় মিটিংয়ে যাওয়ার আগে আমার মা বাবাকে ডেকে নিয়ে বললেন, কিছুণ রেস্ট নাও। আমি ছিলাম আব্বার মাথার কাছে বসা। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম।’ শেখ হাসিনা বলেন, তখন বেগম মুজিব বলেছিলেন, অনেকে অনেক কিছু বলবে, এ দেশের মানুষের জন্য কী করতে হবে, তা বঙ্গবন্ধুর চেয়ে ভালো কেউ জানে না। বেগম মুজিব তখন বলেছিলেন, ‘তোমার মনে যে কথা আসবে, তুমি ঠিক সে কথাই বলবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা ছিল একটা উপস্থিত বক্তৃতা। ভাষণটি ২৩ মিনিটের ছিল, তবে ১৮-১৯ মিনিটের মতো রেকর্ড করা হয়েছিল।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। এ ভাষণে বঙ্গবন্ধু একাধারে বিপ্লবী ও রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকায় ছিলেন। এই ভাষণ বাঙালি জাতির জন্য অহঙ্কারের। ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে আরেকবার বিশ্ব দরবারে সম্মানিত করলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণ, আজ তা প্রমাণিত। ইউনেস্কোর এ স্বীকৃতি ছিল অত্যন্ত প্রত্যাশিত। বঙ্গবন্ধুর অলিখিত ১৮ মিনিটের ভাষণ বাঙালি জাতিকে জাতীয় মুক্তির মোহনায় দাঁড় করিয়েছিল। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। বঙ্গবন্ধুর দীপ্ত কণ্ঠের ঘোষণা, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ কেবল বাঙালি জাতিকে আলোড়িত করেনি, বরং বিশ্ববিবেককেও নাড়া দিয়েছে। ইউনেস্কোর এ স্বীকৃতি তারই প্রমাণ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ৭ মার্চের সমাবেশে গিয়েছিলাম একজন শ্রোতা হিসেবে, ফিরে এসেছি একজন যোদ্ধা হিসেবে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। তেমনিভাবে ৭ মার্চের স্মৃতিকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে শিশুপার্ক করার মধ্য দিয়ে। কতটা জঘন্য হলে মানুষ এমনটা করতে পারে, এটাই তার প্রমাণ।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাজনীতির কবি। হাজার বছর পরে পুরো জাতিকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। তার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ তিনি সেদিন দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৫ আগস্টের পর ইতিহাসের খলনায়করা মতায় এসে বারবার ইতিহাস বিকৃতি ও বঙ্গবন্ধুকে খাটো করার চেষ্টা করেছে। খালেদা-এরশাদ এই ভাষণকে নিষিদ্ধ করে রেখেছিল। ভয় হয়, ঘাতকের দল আবার মতায় এলে এই ভাষণ নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। তাই দানবের শক্তিকে পরাজিত করতে হবে।