প্রতিবেদন

জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.২৮ শতাংশ মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬১০ ডলার

নিজস্ব প্রতিবেদক : মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জনের েেত্র বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে মাথাপিছু আয়েরও প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের মানুষকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তিনি বলেন, এটি অর্জন সম্ভব হয়েছে দেশের সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের যার যার অবস্থান থেকে অবদান রাখার কারণে। তাই সকলে মিলে কাজ করে গেলে আমরা কাক্সিক্ষত ল্েয পৌঁছতে পারব।
চূড়ান্ত হিসাবে গত অর্থবছরে (২০১৬-১৭) জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে প্রাথমিক হিসাবে প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ প্রাক্কলিত প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। পরপর দুই বছর ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের নজিরও সাম্প্রতিক বিশ্বে বিরল। অন্যদিকে প্রাক্কলিত হিসাব থেকে ৮ ডলার বেড়ে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। প্রাক্কলিত হিসাব ছিল ১ হাজার ৬০২ ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৪৬৫ ডলার। এ হিসাবে এক বছরে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৪৫ ডলার। বর্তমানে জিডিপির আকার ২৪৯ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। জিডিপির আকার ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে স্বাধীনতার পর ৩৮ বছর লেগেছিল। আর গত ৮ বছরে জিডিপিতে যোগ হয়েছে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জিডিপি, প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয়ের এই হিসাব দিয়েছে।
প্রবৃদ্ধি নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল বলেন, এক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ-সংশয় থাকা উচিত নয়। আমরা গত ৫ বছরে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছি। প্রতি বছর দেশে ২১ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের অভাব আছে, সেটা স্বীকার করি। তবে এটা সাময়িক। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এ চিত্র পাল্টে যাবে। কারণ বর্তমানে আমাদের ১৪শ প্রকল্প চলমান। এর মধ্যে বড় বড় অবকাঠামো সৃষ্টির প্রকল্প রয়েছে। আর অবকাঠামো হলো শিল্প ও ব্যবসাবাণিজ্যের ভিত্তি। ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির কাজও দ্রুত গতিতে এগুচ্ছে। কাজ শেষ হলে কেবল এসব অঞ্চলে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। আর এসবই দৃশ্যমান বাস্তবতা।
এর আগে সাময়িক হিসাব দেয়ার সময় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেয়। ওই সময় প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছিলেন, বিশ্বব্যাংক বরাবরই রণশীল পদ্ধতিতে প্রবৃদ্ধির হিসাব করে। এ েেত্র আমাদের তথ্য-উপাত্তও তারা ব্যবহার করে। আমরা স্বীকৃত রীতিনীতি মেনেই প্রবৃদ্ধির হিসাব করে থাকি। এতে লুকোছাপা বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোনো সুযোগ নেই।
উল্লেখ্য, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৭ বছরে সারাবিশ্বে গড়ে জিডিপিতে ৬ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে মাত্র ১৭টি দেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ঘর (৭ দশমিক ১১) অতিক্রম করে। এর আগে প্রায় এক দশক দেশের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বৃত্তে আটকে ছিল। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার অন্যতম ল্য অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সামষ্টিক অর্থনীতির অগ্রযাত্রা তারই বড় প্রমাণ। স্বাধীনতার পর ২০০৫-০৬ অর্থবছর পর্যন্ত মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৫৪৩ ডলার। এরপর গত এক দশকে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ডলারেরও বেশি বেড়েছে। এর মধ্যে বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৩১৬ মার্কিন ডলার। এর আগের দুই অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ১৮৪ ডলার এবং ১ হাজার ৫৪ ডলার। দেশ যে দ্রুত উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এটি তারই লণ।
চূড়ান্ত হিসাবে জিডিপিতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রথমবারের মতো ৩০ শতাংশ অতিক্রম করেছে। এ বিষয়টিকে দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ঘটনা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, ভারতসহ আরও কয়েকটি দেশে জিডিপিতে বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক আগেই ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের ঘরে পৌঁছেছে। আমরাও সেদিকে এগোচ্ছি। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ছে, যা প্রত্য ও পরোভাবে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করছে। উল্লেখ্য, জিডিপিতে এবার মোট বিনিয়োগের ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ বেসরকারি খাতের, বাকি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ সরকারি বিনিয়োগ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জিডিপিতে বিনিয়োগের মোট পরিমাণ ছিল ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল ২২ দশমিক ৯৯ শতাংশ আর সরকারি বিনিয়োগ ছিল ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
বিবিএস জানিয়েছে, গতবারের মতো এবারও সেবা এবং শিল্প খাতের ওপর ভর করে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। যদিও শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা কম হয়েছে। শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ২২ শতাংশ, যা ২০১৫-১৫ অর্থবছরে ছিল ১১ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত বছর কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলনের তুলনায় কমেছে। ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ হিসাব করা হলেও চূড়ান্ত হিসাবে এটি হয়েছে ২ দশমিক ৯৭ শতাংশ। চূড়ান্ত হিসাব মতে, এখন বাংলাদেশের জিডিপির আকার ২৪৯ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫-১৬ বছরে জিডিপির আকার ছিল ২২১ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে ১ বছরে জিডিপির আকার আর্থিক মূল্যে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
গত অর্থবছরে সরকার ৭ দশমিক ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের ল্য ঠিক করে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির ল্যমাত্রা ৭ দশমিক ৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছে এবং ২০২০ সালে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ বছরে প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে পৌঁছবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে গতিতে সরকার এগোচ্ছে তাতে ২০১৯ সালের মধ্যেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ঘর স্পর্শ করবে।