প্রতিবেদন

টু-ডে এ্যাপারেল গার্মেন্টসের স্টোরকিপার হেলালউদ্দিনের বিপুল পরিমাণ অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার নেপথ্যে

নিজস্ব প্রতিবেদক : ছিলেন গার্মেন্টস কর্মী। এখন কয়েক কোটি টাকার মালিক। ঢাকায় যাপন করেন বিলাসী জীবন। গ্রামে গড়ে তুলছেন প্রাসাদসম বাড়ি। জমি-জমা, ব্যবসা বাড়াচ্ছেন প্রতিদিনই। অথচ এই ব্যক্তি কয়েক বছর আগে সংসারে অভাবের কারণে লেখাপড়া এগোতে পারেননি। দু’বেলা খাবারের নিশ্চয়তা পেতে মেট্রিক পরীক্ষা না দিয়েই চলে আসেন ঢাকা শহরে। এদিক-সেদিক ঘুরে কাজ জুটিয়ে নেন সাভারের একটি গার্মেন্টসে। অপারেটরের হেল্পার থেকে আস্তে আস্তে নিজেই হয়ে ওঠেন অপারেটর। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কোনো রকম করে চলে যেতে থাকে জীবন। একপর্যায়ে একই গার্মেন্টসে কর্মরত এক নারী কর্মীর প্রেমে পড়েন তিনি। সম্পর্ক গড়ায় বিয়ে পর্যন্ত। বিয়ের পর স্ত্রীকে গার্মেন্টসের কাজ থেকে সরিয়ে নেন। সংসারে নতুন করে দেখা দেয় আর্থিক অনটন। হন্যে হয়ে নিজের আয় বাড়াতে উদ্যোগী হন তিনি। এর পরের গল্প কেবলই এগিয়ে যাওয়ার। হঠাৎই ঢাকার মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের বুড়িগঙ্গা সিএনজি পাম্প সংলগ্ন টু-ডে এ্যাপারেল গার্মেন্টসে স্টোরকিপার পদে চাকরি মিলে যায় তার। আর কয়েক বছরের ব্যবধানে কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে যান তিনি। এই আশ্চর্য প্রদীপ হাতে পাওয়া ব্যক্তির নাম হেলালউদ্দিন মোল্লা। মাগুরার শত্রুজিৎপুর গ্রামে তার স্থায়ী ঠিকানা।
মাগুরায় তার গ্রামের বাড়িতে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, ঢাকার মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের বুড়িগঙ্গা সিএনজি পাম্প সংলগ্ন টু-ডে এ্যাপারেল গার্মেন্টসে স্টোরকিপার পদে কর্মরত হেলালউদ্দিন গ্রামের বাড়িতে গড়ে তুলছেন প্রাসাদসম বাড়ি। মূলত বাড়ির কাজ শুরু করার মধ্য দিয়েই এলাকাবাসীকে নিজের আর্থিক সক্ষমতার পরিচয় দিতে শুরু করেন হেলাল। গ্রামে বাড়ি বানাতে এরইমধ্যে কোটি টাকা খরচ করে এলাকাবাসীকে চমকে দিয়েছেন তিনি। করছেন ধান-পাট মজুদের ব্যবসা। এলাকায় কিনেছেন প্রায় এক শ’ বিঘা জমি। হেলালউদ্দিনের বিষয়ে জানতে চাইলে এলাকাবাসী জানান, গোডাউনে হেলাল এ বছর মজুদ করেছে প্রায় ৬শ’ মণ ধান। বাজারমূল্যে যার দাম ৫ লাখ টাকা। পাট মজুদ করেছেন ৩শ’ মণ। যার দাম আরও ৬ লাখ টাকা। দাম বাড়লে পণ্য বিক্রি করার এ ব্যবসাকে স্থানীয়রা ‘রাখি মালের’ ব্যবসা বলে জানে।
সূত্র জানায়, টু-ডে এ্যাপারেলে টানা ৮ বছর কাজ করছেন হেলাল। এ গার্মেন্টসে স্টোরকিপার পদ পেয়ে রাতারাতি কোটিপতি বনে যান তিনি। এলাকায় বাড়ি-জমি, একাধিক ব্যবসা শুরুর পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থবিত্তের সুরক্ষায় স্ত্রী বিউটি আক্তারের নামে করেছেন একাধিক ব্যাংক একাউন্ট। নিজের একাউন্টে নামমাত্র অর্থ রাখলেও স্ত্রীর একাউন্টে জমা কয়েক কোটি টাকা। হেলাল এলাকার জমি-জমাও নিজের নামে করেননি। সব জমি-জমা স্ত্রী বিউটির নামে।
জানা গেছে, সাত তলাবিশিষ্ট বিশাল গার্মেন্টসে কয়েক বছর আগেও ছিল না কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাতের আঁধারে গাড়ি গাড়ি গার্মেন্টপণ্য চোরাইভাবে বিক্রি করা শুরু করেন হেলালউদ্দিন। এভাবে রাতারাতি কোটিপতি বনে যান তিনি। তার এ চুরির কাজে গার্মেন্টসের আরও কয়েকজন সহযোগী ছিল। তবে চোরাইপণ্যের বিক্রির টাকা ভাগাভাগি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় হঠাৎ হেলালউদ্দিন কিডন্যাপ হন। ২০১৪ সালের ঘটনা এটি। তবে এ যাত্রায় বেঁচে যান তিনি। গার্মেন্টের একটি সূত্রের দাবি, সে যাত্রায় হেলালউদ্দিনের স্ত্রী বিউটি আক্তার ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে স্বামীকে ফিরে পেতে সক্ষম হন।
এসব অভিযোগের বিষয় নিয়ে হেলালউদ্দিনের বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত তিনটি নম্বরে ফোন দেয়া হয়। রবি ও এয়ারটেল নম্বরে ফোন দেয়া হলে তা রিসিভ করেন তার স্ত্রী। তিনি বলেন, আমার স্বামীর অর্থবিত্তের পরিমাণ সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। হেলালউদ্দিনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, তাকেই ফোন দিন। তিনি বাসায় নেই, তিনি এখন অফিসে।
হেলালউদ্দিনকে ফোন দেয়া হলে তিনি ফোন রিসিভ করে এ প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে চান। পরিচয় জানানো হলে ফোন কেটে দেন তিনি। পরে গার্মেন্টসের ঠিকানায় গিয়ে তাকে খুঁজে বের করা হয়। বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বনে যাওয়া বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমার অর্থবিত্তের বিষয়ে আমি কেন আপনার সঙ্গে কথা বলবো? দুদকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা হয়েছে এ তথ্য জানালে তিনি বলেন, এসব অভিযোগের বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। আপনি যা খুশি তা লিখতে পারেন। একটি চক্র আমার পেছনে লেগেছে মন্তব্য করে হেলালউদ্দিন বলেন, চক্রটিকে আমি চিনি। যত টাকা খরচ হয় হোক, এবার আমি তাদের শায়েস্তা করে ছাড়বো।