রাজনীতি

নির্বাচনে সেনা মোতায়েন নিশ্চিত, তবে কী প্রক্রিয়ায় তা এখনও অনিশ্চিত

নিজস্ব প্রতিবেদক : আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন অনেকটাই নিশ্চিত, তবে কোন পদ্ধতিতে বা কী প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে তা এখনো অনিশ্চিত। ১৩ নভেম্বর আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মাহবুব তালুকদার এসব কথা বলেন। নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন নিয়ে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের এ ধরনের বক্তব্যের ১২ ঘণ্টার মাথায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার মো. নুরুল হুদা অবশ্য স্পষ্ট করে জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েন বিষয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। ১৩ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের সেনা মোতায়েন বিষয়ে বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি ১৪ নভেম্বর বলেন, বক্তব্যটি তার ব্যক্তিগত। এ ব্যাপারে কমিশন এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে সেনাবাহিনী নির্বাচনে থাকতে পারে কি না এ ব্যাপারে কথাবার্তা হচ্ছে।
মাহবুব তালুকদার ১৩ নভেম্বর বলেছিলেন, ‘সেনা মোতায়েন হবে আগামী নির্বাচনে। এখানে একটা কিন্তু আছে। সেনাবাহিনীকে আমরা কিভাবে কাজে লাগাবো, নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনী কিভাবে যুক্ত হবে, সেটি বলার সময় এখনো হয়নি। কমিশনে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কমিশন এ পর্যন্ত বিষয়টিতে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে আমরা কমিশনাররা প্রধান নির্বাচন কমিশনার মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছি এবং আমাদের সবারই অনুভূতি হচ্ছে সেনা মোতায়েন হোক। তবে এটাকে কমিশনের সিদ্ধান্ত বলা যাবে না। সময়ই বলে দেবে যে কখন এবং কিভাবে সেনা মোতায়েন হবে।’
সেনা মোতায়েনের বিষয়ে তিনি আরো বলেন, এখন হয়ত আমরা একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। কিন্তু সময়ের পরিপ্রেেিত সিদ্ধান্তটা উঠে আসবে। কারণ সময়ই বলে দেবে কী সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। আমি কখনোই বলতে পারবো না যে সেনা মোতায়েন হবে না।
সংলাপে বিএনপি ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার বা বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েন চেয়েছিল। তাহলে কি এটা বলা যায় যে বিএনপির দাবি কিছুটা পূরণ হতে যাচ্ছেÑ এ প্রশ্নের জবাবে মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘আমি এটা মনে করি না। বিএনপি বলেছে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারসহ সেনা মোতায়েন করতে হবে। বিএনপির দাবির বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই।’
নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার মো. নুরুল হুদা’র পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েন প্রশ্নে ইসি সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। নির্বাচনের এখনো এক বছর বাকি। কমিশন এ ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রসঙ্গে সচিব বলেন, সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করতে হলে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), সংবিধান ও সিআরপিসি সংশোধন করতে হবে। সেনাবাহিনী হচ্ছে দেশরা বাহিনী, তারা কোনো অবস্থাতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়। ইসি সচিব বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতি বিবেচনায় কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনা মোতায়েন হবে না অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় হবে।
এ প্রসঙ্গে ইসি সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ইতঃপূর্বে দেশে যতগুলো সাধারণ নির্বাচন হয়েছে, প্রত্যেকটিতে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত কোনো নির্বাচনেই বিচারিক মতা দিয়ে সেনা মোতায়েন হয়নি। এর আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যখন নির্বাচন কমিশনের সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়, তখন বিএনপি ও বিএনপি ঘরানার দলগুলো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানায়। এর বিপরীতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ ঘরানার দলগুলো নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, সেনাবাহিনী একটি বিশেষায়িত বাহিনী। নির্বাচন পরিচালনার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে তাদের মেলানো ঠিক হবে না। তবে জাতীয় পার্টি আগামী নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের পক্ষে অবস্থান নেয়।
নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে ইসির সংলাপে গণপ্রতিনিধিত্ব আইন সংশোধন করে সেনাবাহিনীকে নির্বাচনি দায়িত্বে ফিরিয়ে আনতে ইসিকে পরামর্শ দেন সাবেক নির্বাচন কমিশার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন (অব.)। একই সংলাপে আইন সংশোধন না করে নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে রাখার পাল্টা পরামর্শ দেন আরেক সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ইসির সংলাপে যোগ দিয়ে সমাজের বিশিষ্ট নাগরিকরা সকলেই নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পে একমত হন। তবে বর্তমান নির্বাচনি আইন অনুযায়ী সেনাবাহিনীকে সরাসরি নির্বাচনে ব্যবহারের সুযোগ আছে কি না সে বিষয়ে মতামত দেন সাবেক নির্বাচন কমিশনাররা।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নির্বাচনি আইনে না থাকায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও সিআরপিসি অ্যাক্ট অনুযায়ী ১২৭ ও ১৩৩-এর ধারা অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করতে পারেনি সেনাবাহিনী।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে থাকবে না তাদের বিচারিক ক্ষমতা দেয়া হবেÑ এ নিয়ে স্পষ্টতই দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে নির্বাচন কমিশন। একজন নির্বাচন কমিশনার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনে সেনা মোতায়েন প্রশ্নে বিপরীতমুখী বক্তব্য দেয়ায় বিষয়টি সারাদেশে এখন আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু। কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে রাখা আর না রাখা সমান কথা। নির্বাচনি কেন্দ্রে গ-গোল হবে, অথচ ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া সেনাবাহিনী গ-গোল থামাতে পারবে না; এমনকি নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা না ডাকলে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে যেতে পারবে না বা যাবে না। এই অবস্থায় নির্বাচনি মাঠে সেনাবাহিনী থাকার দরকার কী। কারণ এতে সেনাবাহিনীর অহেতুক বদনামই হবে। মানুষ অবশ্যই বলবে, সেনাবাহিনী থাকার পরও নির্বাচনে গ-গোল হলো। মানুষ কিছুতেই ভাববে না যে, সেনাবাহিনীর বিচারিক ক্ষমতা না থাকায় তাদের পক্ষে আসলে কিছুই করা সম্ভব ছিল না।
আবার অনেকের মতে সেনাবাহিনীকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অবশ্যই ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়ে মাঠে নামানো উচিত। কারণ মানুষের আস্থার জায়গায় সবচেয়ে বড় স্থান দখল করে আছে সেনাবাহিনী। বিচারিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত সেনাবাহিনী নির্বাচনের মাঠে থাকলে তবেই কেবল মানুষ ভয়-শঙ্কা ভুলে গিয়ে নির্বিঘেœ ভোট দিতে পারবে বলে মনে করেন দেশের বেশিরভাগ মানুষ।