প্রতিবেদন

রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতে সরব জাতিসংঘ : প্রবল চাপে মিয়ানমার

নিজস্ব প্রতিবেদক : রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে নতুন করে সরব হয়েছে জাতিসংঘ। রাশিয়া ও চীনের বিরোধিতার কারণে পর পর দুইবার নিরাপত্তা পরিষদের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করতে মিয়ানমারকে জোর তাগিদ দিয়ে গত ১৬ নভেম্বর একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। আইসল্যান্ডের কূটনীতিক ইনার গুনারসনের সভাপতিত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সামাজিক, মানবিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক ফোরাম থার্ড কমিটির ৪৭তম বৈঠকে আলোচনা শেষে সদস্য দেশগুলোর ভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।
প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন, নাগরিকত্ব প্রদান, অনতিবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করাসহ মিয়ানমারের প্রতি ১৬টি সুনির্দিষ্ট আহ্বান জানানো হয়েছে। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পে প্রস্তাবটি এনেছিল মিশর। প্রস্তাবের পে ভোট পড়েছে ১৩৫টি। চীন ও রাশিয়াসহ মোট ১০টি দেশ প্রস্তাবের বিপে ভোট দেয়। অন্যদিকে ভারত, নেপাল, ভুটানসহ মোট ২৬টি দেশ ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে।
জানা যায়, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গত দুই মাসে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রস্তাব আনার চেষ্টা চালানো হলেও চীন ও রাশিয়ার মতো ‘ভেটো’ মতাসম্পন্ন দেশের কারণে তা সম্ভব হয়নি। ১৬ নভেম্বর ওই দুটি দেশ প্রস্তাবের বিপে ভোট দিলেও ব্যাপক সমর্থন নিয়ে তা গৃহীত হয়েছে। এর ফলে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আবারও প্রবল বৈশ্বিক চাপে পড়ল মিয়ানমার।
জাতিসংঘে সৌদি আরবের প্রতিনিধি থার্ড কমিটির বৈঠকে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে বলেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা হচ্ছে। তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস করা হচ্ছে। তাদের সাগরে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে। মিয়ানমারে বিশেষ করে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের দুর্দশায় ওআইসি গভীর উদ্বিগ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ প্রস্তাবের সহপৃষ্ঠপোষক। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর ভয়ঙ্কর নির্যাতনে যুক্তরাষ্ট্র নীরব থাকতে পারে না।
ইরানের প্রতিনিধি বলেন, রোহিঙ্গাদের দুর্দশা, বিতাড়ন সারা বিশ্বেই ােভ সৃষ্টি করেছে। নিজ দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেয়ার মধ্য দিয়ে এ সংকটের সমাধান হবে না। বাস্তুচ্যুত সব রোহিঙ্গার নিজ ভূখ-ে সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন বলেন, এই প্রস্তাব রোহিঙ্গাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করবে। ৬ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা গত ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে ঢুকেছে। এখনো প্রতি সপ্তাহে ৪-৫ হাজারের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য আসছে। তিনি মিয়ানমারকে তাদের অঙ্গীকারগুলো কাজে রূপ দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দ্রুত এ সমস্যার সমাধান না হলে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যে ফেরত যাওয়ার আস্থা ও পরিবেশ ফিরে পাবে না।
সোমালিয়ার প্রতিনিধি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। মিয়ানমারের সামরিক অভিযান, নির্যাতন, যৌন সহিংসতায় সোমালিয়া অত্যন্ত উদ্বিগ্ন বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। মিয়ানমার রোহিঙ্গা হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দিচ্ছে।’
মিশরের প্রতিনিধি বলেন, তারা সাধারণত কোনো একক দেশের ব্যাপারে প্রস্তাবকে সমর্থন করেন না। কিন্তু মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
চীনের প্রতিনিধি বলেন, রাখাইন পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। মিয়ানমার সরকার পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। মিয়ানমার ও বাংলাদেশ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত পরিস্থিতি আরো জটিল না করা।
রাশিয়ার প্রতিনিধি বলেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিয়ে জটিলতা রাশিয়া অনুধাবন করে। তবে একই সঙ্গে রাশিয়া বিশ্বাস করে মিয়ানমারের সমালোচনা না করে বরং সহযোগিতা করা উচিত।
মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি ওই প্রস্তাবকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং তার দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তপে হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি প্রস্তাবটিকে মিয়ানমারের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ হিসেবেও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মানবাধিকারের নামে হস্তপে তারা মেনে নেবেন না। ওই প্রস্তাবের মাধ্যমে মিয়ানমারের জনগণকেও অপমান করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংকটের জন্য সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠী আরসাকে দায়ী করে তিনি বলেন, আরসা নেতা আতাউল্লাহ মিয়ানমারের কেউ নন। তার জন্ম পাকিস্তানে, বেড়ে উঠেছেন সৌদি আরবে। মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি দাবি করেন, রাখাইন রাজ্যের সংকট ধর্মীয় নয়। এটি ব্রিটিশ উপনিবেশের সংকট। ব্রিটিশরাই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে এনেছিল বলে তিনি জানান। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সদস্যদের এ প্রস্তাবের পে ভোট না দেয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে ভারত রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চাইলেও মূলত তিনটি কারণে ভোট দেয়া থেকে বিরত থেকেছে বলে জানা গেছে। এর প্রথমটি হলো প্রস্তাবটি এনেছে ওআইসি। ভারত সাধারণত ওআইসির কোনো প্রস্তাব সমর্থন করে না। কারণ ওআইসি অতীতে বিভিন্ন সময় কাশ্মির পরিস্থিতি নিয়ে প্রস্তাব এনেছে। দ্বিতীয় কারণটি হলো ভারত সুনির্দিষ্ট কোনো দেশকে ল্য করে আনা প্রস্তাব সমর্থন করে না। এর একটি ব্যতিক্রমী নজির আছে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে আনা একটি প্রস্তাব ভারত অতীতে সমর্থন করেছে। তৃতীয় কারণটি হলো এই প্রস্তাবে মিয়ানমারের ভেতর বিশেষ অঞ্চল গড়ার কথা বলা হয়েছে।
জানা গেছে, মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলোই মূলত ভোট দেয়া থেকে বিরত থেকেছে বা বিপে ভোট দিয়েছে। ভোটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পে এস্তোনিয়ার প্রতিনিধি প্রস্তাব গ্রহণকে স্বাগত জানান। তিনি বাংলাদেশের প্রশংসা করেন এবং সংকট সমাধানে মিয়ানমারকে পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
জাপানের প্রতিনিধি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ওপর জোর দেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের গৃহীত প্রস্তাবে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করা, তাদের প্রত্যাবাসন এবং নাগরিকত্বসহ সব ধরনের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ওই প্রস্তাবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পাশাপাশি কাচিন ও শান রাজ্যে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে। এছাড়া রাখাইন রাজ্যে গত আগস্ট মাস থেকে সহিংসতায় ৬ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় এবং রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর নির্বিচার বলপ্রয়োগের ঘটনায় সাধারণ পরিষদের চরম উৎকণ্ঠা স্থান পেয়েছে ওই প্রস্তাবে।