সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমছে!

| November 25, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এবার সংস্থাটি সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমাতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছে। উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্রের কারণে সরকার কম সুদে ব্যাংক থেকে এখন আর ঋণ নিচ্ছে না। উল্টো সঞ্চয়পত্র থেকে পাওয়া ঋণের অর্থে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছে সরকার। এতে ব্যাংকে অলস টাকার পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। আবার অনেকে শেয়ারবাজার ও বন্ড মার্কেট থেকে বিনিয়োগ তুলে এনে সঞ্চয়পত্র কিনছে। এতে এ দুটি বাজারও তিগ্রস্ত হচ্ছে আশঙ্কা করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, সামগ্রিক আর্থিকখাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফাও কমে যাচ্ছে। তির মুখে পড়ছে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আগামী ২৬ নভেম্বর সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রাবিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভা হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সভায় সামগ্রিক অর্থনীতির পাশাপাশি মুদ্রা ও ঋণ, মূল্যস্ফীতি এবং প্রবাসী আয় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদেেপর সুপারিশ করা হবে। অর্থমন্ত্রী ওই সভায় সভাপতিত্ব করবেন। জানা গেছে, ওই সভাতেই সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে এও জানা গেছে, রাজনৈতিক কারণে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের নিরাপদ বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান ত্রে সঞ্চয়পত্রের সুদহার অন্তত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত কমানোর পে নয় সরকার। কারণ এতে ভোটের রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ মুহূর্তে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তে সমর্থন দেবেন না।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক চিঠিতে বলা হয়েছে সঞ্চয়পত্রে বেশি সুদ থাকায় সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় অংশ এ খাত থেকেই আসছে। এতে বাজারে সুদহার কমানো যেমন সহজ হচ্ছে না, তেমনি সরকারের বেশি সুদবাহী দায় বাড়ছে। অন্যদিকে বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য জমছে, যা সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিল বিক্রি করে বাজার থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। এমতাবস্থায় সঞ্চয়পত্রের সুদহার যৌক্তিকীকরণে সরকার উদ্যোগ নিতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মাহফুজা আকতার স্বারিত চিঠিতে বলা হয়েছে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সরকার অধিক পরিমাণ ঋণ পাওয়ায় ব্যাংকিং খাত থেকে সরকার ঋণ নেয়ার বদলে আগের নেয়া ঋণ পরিশোধ করছে। তবে এটি বলা প্রয়োজন যে সঞ্চয়পত্রের সুদহার অর্থবাজারে বিদ্যমান সুদহারের চেয়ে বেশি হওয়ায় সরকারের দায় বেড়ে যাচ্ছে এবং সার্বিকভাবে আর্থিক খাতে সুদহার হ্রাস ও বন্ড বাজারের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া ব্যাংকিং খাত থেকে সরকার ঋণ নেয়ার বদলে আগের ঋণ পরিশোধের ফলে এ খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের সৃষ্টি হচ্ছে, যা নিষ্ক্রিয়করণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে।
বর্তমানে বাজারে ৪ ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবার সঞ্চয়পত্র। ১ লাখ টাকার পরিবার সঞ্চয়পত্রে ৫ শতাংশ উৎসে কর কাটার পর গ্রাহকরা মাসে ৯১২ টাকা সুদ পাচ্ছেন। পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দেয়া হয় ৩ মাস পর পর। ১ লাখ টাকার বিপরীতে উৎসে কর কেটে প্রতি ৩ মাসে ২ হাজার ৭৯৩ টাকা পায় গ্রাহক। আর ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে ১ লাখ টাকার বিনিয়োগে ২ হাজার ৬২২ টাকা পায় গ্রাহক। বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র ৫ বছর মেয়াদি। মেয়াদ শেষে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ সুদ পায় গ্রাহক। আর ১ লাখ টাকা ব্যাংকে আমানত রাখলে এখন মাস শেষে ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত সুদ পাওয়া যায়।
ব্যাংকের সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের সুদের হারে বড় ফারাক হওয়ার প্রোপটে অর্থমন্ত্রী গত জুন মাসে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর কথা বলেছিলেন। ব্যাংকের সুদের হারের সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের সুদের হারের বর্তমান ব্যবধান কমিয়ে ২ শতাংশের মধ্যে নামানোর কথা বলেছিলেন তিনি। তবে এর তীব্র বিরোধিতা করেন সরকারের অন্য মন্ত্রীরা। তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে বিপুলসংখ্যক সঞ্চয়পত্রের ক্রেতাকে হতাশ না করার পক্ষে মত দেন। পরে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সীমা নতুন করে নির্ধারণ করে দেয়াসহ ুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য সুদহার না কমিয়ে বড় ক্রেতাদের সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে রাজনৈতিক কারণে সেই উদ্যোগও স্থবির হয়ে আছে।
বেশ কিছুদিন ধরে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো হবে কি না, তা নিয়ে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। অবশ্য স্বল্প ও মধ্যম আয়ের সঞ্চয়কারীরা চান না কোনোভাবেই তা কমে যাক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ১২ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকার বিভিন্ন সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। গত অর্থবছরের এই তিন মাসে ১১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। শুধু সেপ্টেম্বর মাসে বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র। সেপ্টেম্বর শেষে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ২৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের ল্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। গত ৬ নভেম্বরের তথ্যানুযায়ী ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ স্থিতি ৮৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা। গত জুনের তুলনায় যা ২ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা কম। বর্তমানে ব্যাংক খাতে ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। এর মধ্যে অলস পড়ে আছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ শামসুল আলম এ বিষয়ে বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর চিন্তাটি হবে সরকারের জন্য আত্মঘাতী। প্রতি মাসে মানুষ গড়ে সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র কেনে। এই সঞ্চয়পত্র কেনে লাখ লাখ মানুষ। তারা সঞ্চয়পত্র কেনে মাস শেষে যে সুদ পাওয়া যাবে, সে সুদ দিয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহের জন্য। এখন সেই সুদের হার কমিয়ে দিলে প্রায় প্রতিটি পরিবারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নামবে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছরও বাকি নেই। এই সময়ে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানো আর সরকারের নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা সমান কথা।

Category: অর্থনীতি

About admin: View author profile.

Comments are closed.