আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তাদের অভিমত : ২০৩০ সালের মধ্যে ব্লু-ইকোনমি থেকে আরও ৫ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধির আশা

| November 27, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের ব্লু-ইকোনমির অপার সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র সম্পদ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ ব্লু-ইকোনমি থেকে আরও ৫ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে। ২২ নভেম্বর রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে জাতিসংঘের উদ্যোগে ব্লু-ইকোনমি বিষয়ক দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, ইন্টারন্যাশনাল সি বেড অথরিটির সেক্রেটারি জেনারেল মাইকেল লজ ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিট প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) খুরশেদ আলম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ হওয়ায় সমুদ্র অর্থনীতি দেশের অর্থনীতিতে একটি অসাধারণ ত্রে সৃষ্টি করেছে। আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ সমুদ্র অর্থনীতি থেকে আরও ৫ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে। বিভিন্ন দেশ সমুদ্র অর্থনীতি কাজে লাগিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধিশালী করছে। তারা পারলে আমাদেরও পারতে হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, সমুদ্র অর্থনীতি খাতে উন্নয়ন করতে উপকূলীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সমুদ্র সম্পদ আহরণে অন্যদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ তদারকিতে কিভাবে সমুদ্র সম্পদের উন্নয়ন করা যায় সে বিষয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে ও কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল সি বেড অথরিটির সেক্রেটারি জেনারেল মাইকেল লজ বলেন, বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্র সীমানা রয়েছে। বাংলাদেশকে এই সম্পদের মর্ম বুঝতে হবে এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সমুদ্র থেকে প্রাপ্ত সম্পদের মাধ্যমে একটি দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের বলেন, সরকার যেসব উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছে তার মধ্যে এই বিষয়কেও প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। সমুদ্র অর্থনীতির উন্নয়নে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করারও পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিট প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) খুরশেদ আলম বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সমুদ্র থেকে আমরা মৎস্য আহরণ করে থাকি। তবে ছোট বোটের কারণে গভীর সমুদ্রে গিয়ে আমাদের জেলেরা মাছ ধরতে পারে না। সে কারণে গভীর সমুদ্রে গিয়ে মাছ ধরার উপযোগী বোট প্রয়োজন। এছাড়া বিভিন্ন দেশ সমুদ্রের মাছ থেকে জ্যাকেট ও কসমেটিকও তৈরি করছে। আমাদেরও এসব শিল্পের দিকে নজর দিতে হবে। সমুদ্রপথে বাণিজ্য প্রসারের উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া জাহাজ নির্মাণ শিল্পে আরও বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য তিনি সুপারিশ করেন।
সম্মেলনের বিভিন্ন পর্বে বক্তারা বলেন, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ হওয়ার পর অর্থনৈতিক এলাকা সম্প্রসারিত হয়েছে। দেশের মূল ভূখ-ের সমপরিমাণ সমুদ্র থেকে সম্পদ আহরণের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, সমুদ্রের পরিবেশ নষ্ট না করে যথাযথভাবে তা কাজে লাগাতে সম্ভব সব কিছু করতে হবে। তারা আরও বলেন, সমুদ্র সৈকতে প্রাপ্ত বিভিন্ন মূল্যবান খনিজসম্পদ আহরণের সুযোগ রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের তলদেশ থেকে ইতোমধ্যে খনিজসম্পদ উত্তোলন শুরু হয়েছে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানা সুনির্দিষ্ট হওয়ায় সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও ব্যবসাবাণিজ্যের েেত্র দেশি-বিদেশি জাহাজের নিরাপদ চলাচলের সুযোগও বেড়েছে। এই সুযোগ আরও বাড়াতে হবে।
জাতিসংঘের উদ্যোগে ব্লু ইকোনোমি ধারণা নিয়ে প্রথম বৃহৎ আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি ২০১৪ সালে বাংলাদেশেই অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালা শেষে সরকারের ১৯টি মন্ত্রণালয় নিয়ে ব্লু ইকোনোমি বাস্তবায়নের মহাপরিকল্পনাও নেয়া হয়।
জাতিসংঘের ব্লু ইকোনোমি টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে। টেকসই উন্নয়ন মানে উন্নয়নের েেত্র আন্তঃআঞ্চলিক সাম্য নিশ্চিত করা। অর্থাৎ এই প্রজন্মের উন্নয়ন যেন এমন আগ্রাসী না হয় যাতে পরবর্তী প্রজন্ম বঞ্চিত হয় আবার এমন আগ্রাসীও না হয় যাতে এই প্রজন্মের এক অঞ্চলের উন্নয়নের ফলে অন্য অঞ্চলের ভাগে কম পড়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা সুন্দরবন ধ্বংস করলে পরবর্তী প্রজন্ম কি এটাকে রিভাইভ করতে পারবে? যদি না পারে তাহলে এই উন্নয়ন মডেল টেকসই হবে না। আর টেকসই না হলে ব্লু ইকোনোমির মডেলও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
সমুদ্রসম্পদকে উন্নয়নের নিয়ামক হিসেবে ব্যবহার সম্ভব। এেেত্র যথাযথ পরিকল্পনা, উপযুক্ত জ্ঞান ও প্রযুক্তির সুবিধা থাকতে হবে। এগুলোর ঘাটতি থাকলে সমুদ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আর এসব সুবিধা বিদ্যমান থাকলে অর্থাৎ যথাযথ পরিকল্পনা থাকলে, ওশানোগ্রাফি সম্পর্কে উপযুক্ত জ্ঞান থাকলে এবং সর্বোপরি সাগর সেচে মুক্তো আনার মতো প্রযুক্তিগত সুবিধা থাকলে ভূ-কেন্দ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি আমাদের সামনে খুলে দিতে পারে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত। জাতিসংঘের উদ্যোগে ব্লু-ইকোনমি বিষয়ক দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তারা এ বিষয়েই আলোকপাত করে বলেছেন, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনায় ব্লু-ইকোনোমি বিষয়ক পরিকল্পনাগুলো যদি সরকার বাস্তবায়ন করতে পারে তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত থেকে আরো ৫ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি আসবে।
বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তায় সমুদ্রের খনিজ সম্পদের ব্যবহার, সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সমুদ্রের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রার মাধ্যমে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরকে উন্নয়নের নিয়ামক হিসেবে ব্যবহার করতে পারে নিঃসন্দেহে। যদিও সমুদ্র সম্পদের প্রাপ্যতা, উত্তোলন এবং ব্যবহার সম্পর্কে বাংলাদেশের পর্যাপ্ত দ জনবল এবং প্রযুক্তির অভাব রয়েছে; তারপরও বলা চলে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ধীর পদক্ষেপে হলেও এগুচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে আরো বেশি সক্ষম করে গড়ে তোলা হচ্ছে। সমুদ্র সম্পদ ট্রেস ও আহরণ করার জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি বেসামরিক জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে ব্লু ইকোনোমি বিষয়ে দ জনবল তৈরির জন্য আশির দশক থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্রবিজ্ঞান (ওশানোগ্রাফি) বিষয় চালু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ওশানোগ্রাফি চালু করা হয়েছে। গবেষণা ও উচ্চতর শিা গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ২টির সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
দুই.
আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ায় বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চল, ২০০ নটিক্যাল মাইলের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার অধিকার পেয়েছে। এক সময় বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার েেত্র মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত সীমানা বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল। ফলে অনেক সময়ই ভারত ও মিয়ানমারের বাধার মুখে কেবল সমুদ্র সম্পদ আহরণের প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্ত হয়নি, দ্বিপীয় বা ত্রিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্কও তিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু আশার কথা হলো সমস্যাটি মিটে গেছে। এখন প্রয়োজনে ভারত ও মিয়ানমারকে সঙ্গে নিয়ে সমুদ্র সম্পদ আহরণের বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।
বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে দেশ সমুদ্রকে যত বেশি ব্যবহার করতে পেরেছে, সে দেশ তার অর্থনীতিকে তত এগিয়ে নিতে সম হয়েছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুরোপুরি সমুদ্রনির্ভর। বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ হয় সমুদ্র পরিবহনের মাধ্যমে। এই বিষয়টি ঠিক থাকলেও আরো অনেকগুলো বিষয়ে আমরা সমুদ্রকে তত বেশি ব্যবহার করতে পারছি না। যেমন বঙ্গোপসাগর থেকে আমাদের জেলেরা সারা বছরে যে পরিমাণ মাছ আহরণ করে, থাইল্যান্ডের জেলেরা আমাদের বঙ্গোপসাগর থেকে তার তিনগুণ মাছ আহরণ করে চুরির মাধ্যমে। এটা থাইল্যান্ডের জেলেদের পক্ষে সম্ভব হয় উন্নত প্রযুক্তির কারণে। আর বাংলাদেশের জেলেরা পিছিয়ে থাকে মান্দাতার আমলের অ্যানালগ প্রযুক্তির সাহায্যে মাছ ধরার কারণে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মালিকানাধীন বঙ্গোপসাগরের তলের গঠন বিবেচনায় এ অঞ্চলে তেল-গ্যাস ছাড়াও রুটাইল, ইলমেনাইট, গারনেট, মোনাজাইট, ম্যাগনেটাইট, কায়ানাইট, লিউকক্সিন ও জিরকনসহ নানা ধরনের মূল্যবান খনিজ পদার্থ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রুটাইল রঞ্জক পদার্থের কাঁচামাল। ওয়েল্ডিং রডের বহিরাবরণ ও টাইটেনিয়াম নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহার হয় মোনাজাইট। এটি তেজস্ক্রিয় থোরিয়ামের একটা ফসফেট যৌগ, যার মধ্যে কিছু পরিমাণ সিরিয়াম, ল্যানথানাম ও ইত্রিয়াম থাকে। একইসঙ্গে এটি পারমাণবিক চুল্লির জ্বালানি। এছাড়া পরমাণু বোমার কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার হয় এটি। ইলমেনাইট উড়োজাহাজ, গাড়ি ও কেমিক্যাল প্লান্টের যন্ত্রাংশ এবং সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট তৈরিতে ব্যবহার হয়। মোনাজাইট রঙিন টেলিভিশন ও গ্যাস প্লান্টে ব্যবহার হয়। ম্যাগনেটাইট পরমাণু চুল্লি, এক্স-রে মেশিন থেকে বের হওয়া তেজস্ক্রিয় বিকিরণ রোধ করে। জিরকন ইস্পাত কারখানায় তাপ সহনীয় ইক (ব্রিক) হিসেবে ব্যবহার হয়। সিনথেটিক ডায়মন্ড তৈরিতেও ব্যবহার হয় এটি। গারনেটে রয়েছে লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ও সিলিকা। ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপকদের মতে, বঙ্গোপসাগর গ্যাস সম্পদের জন্য একটা ভালো জায়গা। ভারতের সমুদ্র এলাকা ও মহানন্দা বেসিনে গ্যাস হাইড্রেট পাওয়া গেছে। এই গ্যাস হাইড্রেট বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরেও পাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা আছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৩ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা মাছ ধরা, মাছ চাষ ও বাণিজ্যিক পরিবহনের মতো সমুদ্র অর্থনীতির কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই ৩ কোটি মানুষের কাজ চলছে অপরিকল্পিত ও অদক্ষভাবে এবং অবশ্যই উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া। জাতিসংঘের উদ্যোগে ব্লু-ইকোনমি বিষয়ক দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই বিষয়গুলোও উঠে এসেছে। বলা হয়েছে দেশের ৩ কোটি মানুষের সমুদ্র নিয়ে কর্মযজ্ঞকে যথাযথ পরিকল্পনা, দক্ষতা ও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা গেলে ব্লু-ইকোনোমি থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে আরো ৫ শতাংশ বেশি প্রবদ্ধি অর্জন করা যাবে।
তিন.
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মৎস্যজীবীরা মাছ ধরার জন্য চট্টগ্রাম উপকূল থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারেন। আমাদের মৎস্যজীবীদের ট্রলারের দৈর্ঘ্য ২০ থেকে ৩০ ফুট। তাদের ব্যবহৃত জাল সর্বোচ্চ ২০ মিটার পানির গভীরে যেতে পারে। অথচ টুনা মাছ ধরার জন্য পানির ১০০ মিটার গভীরে জাল যেতে হয়। সমুদ্রের মাছ শিকার এবং অন্যান্য সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের জন্য আমাদের বর্তমান সমতা আরো বহুগুণে বাড়াতে হবে। ব্লু-ইকোনমির বাস্তবায়ন খুব বড় ধরনের একটি উদ্যোগ, সে অনুসারে আমাদের প্রয়োজনীয় ট্রলার, জাল ও যন্ত্রপাতি কিছুই নেই। যদিও বছর খানেক ধরে অনেকেই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু মাছ নয়, ব্লু-ইকোনমি বা সাগর অর্থনীতিকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে সামুদ্রিক শৈবাল, কাঁকড়া ও কোরাল এসবের দিকেও নজর দিতে হবে। বঙ্গোপসাগরে প্রচুর পরিমাণ উন্নত জাতের টুনা মাছের মজুদ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু টুনা মাছ রপ্তানি করেই বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। বর্তমানে বিশ্বে টুনা মাছের বাজার ১০০ বিলিয়ন ডলারের। বাংলাদেশের উপকূল অংশে টুনা মাছের বিচরণ সবচেয়ে বেশি। সব প্রস্তুতি থাকলে আমাদের সমুদ্র অঞ্চলে বছরে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টন টুনা মাছ ধরা পড়ার কথা। সাধারণত প্রতিটি টুনা মাছ ১ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত হয়। প্রতি কেজি মাছের রপ্তানিমূল্য প্রায় ৪ হাজার টাকা। যথাযথ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে ইলিশের পর টুনা মাছ দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানিকারী মাছের তালিকায় স্থান করে নেবে। বাংলাদেশের মালিকানাধীন বঙ্গোপসাগরের তলের গঠন বিবেচনায় এ অঞ্চলে তেল-গ্যাস ছাড়াও নানা ধরনের মূল্যবান খনিজ পদার্থ রয়েছে। বঙ্গোপসাগর গ্যাস সম্পদের জন্য একটা ভালো জায়গা। ভারতের সমুদ্র এলাকা ও মহানন্দা বেসিনে গ্যাস হাইড্রেট পাওয়া গেছে। এই গ্যাস হাইড্রেট বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরেও পাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সময় এখনই। জাতিসংঘের উদ্যোগে ব্লু-ইকোনমি বিষয়ক দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও এ কথাগুলো বলা হয়েছে। সম্মেলনে বক্তারা বলেছেন, ব্লু-ইকোনোমি বিষয়ে বিদ্যমান অসঙ্গতিসমূহ দূর করা গেলে এবং পর্যাপ্ত টুনা মাছ ও খনিজ-সম্পদ আহরণ করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের জিডিপিতে আরো ৫ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি যুক্ত হবে।

Tags:

Category: প্রতিবেদন

About admin: View author profile.

Comments are closed.