খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও উত্তরাধিকারীদের সংবর্ধনা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সশস্ত্র বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকে ভাতা প্রদান করবে সরকার

| November 27, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : সশস্ত্র বাহিনী দিবস ২০১৭ উপলে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরাধিকারীদের সংবর্ধনা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর সরকার আগামী জানুয়ারি মাস থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য বিশেষ করে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, আনসার-ভিডিপি এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (তৎকালীন ইপিআর)-এর সদস্য যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তাদের ভাতা প্রদান করবে।
২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তারা সে সময় বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন বলে সে সময়ে তাদের ভাতা প্রদান করা হয়নি। তারা প্রায় সকলেই এখন অবসরে এবং তাদের পরিবারের সদস্যরাও সমস্যায় রয়েছেন। আমরা এদের সকলকেই আগামী জানুয়ারি থেকে ভাতা প্রদান করবো ইনশাআল্লাহ। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, সশস্ত্র বাহিনী দিবসে তিনি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এলেই প্রতি বছর এই দাবি উঠতো। কাজেই আমরা এটি (ভাতা) প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে তাঁর সরকার সম্ভাব্য সব কিছু করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং আত্মহুতি দিয়েছেন তাদেরকে আমরা মর্যাদা দেয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।
সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাহফুজুর রহমান খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরাধিকারীদের সংবর্ধনা প্রদান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকী (অব.), সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মুহম্মদ শফিউল হক, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানে সম্মানী চেক এবং মোবাইল ট্যাবসহ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী ৭ বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার এবং মুক্তিযুদ্ধে সম্মাননা পদকপ্রাপ্তদের মাঝে বিতরণ করেন। শান্তিকালীন পদক ২০১৬ বিজয়ী ১২ জন এবং অসামান্য সেবা পদক বিজয়ী ১৪ জনসহ সশস্ত্র বাহিনীর ২৬ জন সদস্যের মাঝে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী পদক বিতরণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, যার ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। মুক্তিযোদ্ধারা নিজের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদান রেখে আমাদেরকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ উপহার দিয়েছেন। জাতির বীর সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তাদের অবদানের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি দিতে তাঁর সরকার নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ভাতার পরিমাণ ৯০০ টাকা থেকে পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করে ১০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে এবং ভাতাভোগীর সংখ্যা ১ লাখ থেকে বৃদ্ধি করে দ্বিগুণ অর্থাৎ ২ লাখে উন্নীত করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ৬৭৬ জন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার ভাতা ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে যথাক্রমে বীরশ্রেষ্ঠদের জন্য ৩০ হাজার টাকা, বীর উত্তমদের জন্য ২৫ হাজার টাকা, বীর বিক্রমদের জন্য ২০ হাজার টাকা এবং বীর প্রতীকদের জন্য ১৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণির যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারবর্গের মাসিক রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা সর্বনিম্ন ২৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাগণকে শিা ভাতা, কন্যা সন্তানের েেত্র বিবাহ ভাতা, উৎসব ভাতা, দেশে-বিদেশে চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রতিটি জেলায় ভবন নির্মাণ করা হবে। যার মধ্যে ৪৯টি জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন এবং হস্তান্তর করা হয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে মোট ১ হাজার ৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৭০টি উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় ইতোমধ্যে ২৫১টি মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অভূতপূর্ব অবদান কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরণের ব্যাপারে আমাদের সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
বক্তৃতার শুরুতে প্রধানমন্ত্রী মহান সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সকল সদস্যকে শুভেচ্ছা ও আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ঐতিহাসিক এই দিনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর অকুতোভয় সদস্য এবং আপামর জনসাধারণ সম্মিলিতভাবে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণ সূচনা করে। ডিসেম্বরের শুরুতে যুক্ত হয় ভারতীয় মিত্র বাহিনী। সশস্ত্র বাহিনী, বাংলার মুক্তিপাগল জনতা ও মিত্র বাহিনীর একযোগে শত্র“কে আক্রমণ আমাদের বিজয়কে ত্বরান্বিত করে। আমরা অর্জন করি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।
সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সার্বভৌমত্ব রার সুমহান দায়িত্ব সশস্ত্র বাহিনীর ওপর ন্যস্ত। এ পবিত্র দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আমাদের দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম, অবকাঠামো নির্মাণ, আইনশৃঙ্খলা রা ইত্যাদি েেত্র প্রতিনিধিত্বশীল অংশগ্রহণ বজায় রাখছে। আমি এজন্য সশস্ত্র বাহিনীর সকল সদস্যকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকার সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সব ধরনের কল্যাণমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। আজ দেশের সকল বাহিনী এবং প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে এবং বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা আজ বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছি। আমরা সেই সমতা এবং সামর্থ্য অর্জন করেছি এবং আমাদেরকে তা ধরে রাখতে হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাঙালি জাতি বিজয়ী জাতি এবং এ জাতি কখনো মাথা নত করে থাকবে না।

Category: প্রতিবেদন

About admin: View author profile.

Comments are closed.