দুর্নীতি প্রতিরোধে দৃঢ় অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে পালিত হলো দুদকের ১৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

| November 27, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : দুর্নীতি প্রতিরোধে দৃঢ় অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে ২১ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের ১৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়েছে। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয় প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও শান্তির পায়রা উড়িয়ে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এরপর দিবসটি উপলে শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালায় এক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টির সভাপতি ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য রাখেন দুদক কমিশনার ড. নাসির উদ্দীন আহমেদ, কমিশনার এএফএম আমিনুল ইসলাম, সচিব ড. মো. শামসুল আরেফিন, মহাপরিচালক মো. জাফর ইকবাল।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, দেশে বাজার অর্থনীতি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতিবাজ, লুটেরার সংখ্যা বেড়েছে। অর্থপাচার করে দুর্নীতিবাজরা দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করছে। রাষ্ট্রের সব অঙ্গ দুর্নীতিগ্রস্ত হলে শুধু দুদক এককভাবে দুর্নীতি দূর করতে পারবে না। দুর্নীতি অঙ্কুরে বিনাশ করতে হবে। মানুষের মধ্যে যেন দুর্নীতি করার প্রবণতা তৈরি না হয় সে দিকটি রাষ্ট্রকেই খেয়াল রাখতে হবে।
দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, দদুদকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা। তাই সম্মিলিতভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধে মানুষের সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতা একান্তভাবেই প্রয়োজন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান আরও বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজ, সরকারি কর্মকর্তা, গণমাধ্যমসহ সকলকে সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি করতে চাই। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই বড় প্রত্যাশা।
এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলÑ সবাই মিলে গড়ব, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ। আলোচনাসভা শুরুর আগে চেয়ারম্যান সভায় উপস্থিত দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতিবিরোধী শপথবাক্য পাঠ করান। ঢাকাসহ সারাদেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ২২ নভেম্বর দুদকের ১৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে ওইসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর একজন চেয়ারম্যান ও দুইজন কমিশনারের সমন্বয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ রাষ্ট্রপতির সম্মতি পায় ২০০৪ সালের ২৩ ফেব্র“য়ারি। দেশের দুর্নীতি দমন, নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ এবং সমাজে সততা ও নিষ্ঠাবোধ সৃষ্টির দায়িত্ব এ আইনের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর অর্পণ করা হয়। ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন ইকবাল মাহমুদ। এরপর থেকে বর্তমান পর্যন্ত দুদক বেশ কিছু সাফল্য অর্জন করেছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থও হয়েছে। দুর্নীতি মামলায় তার সময়ে কয়েকশ লোক গ্রেপ্তার হয়েছে। গত দেড় বছরে তিনি মানুষকে একটা বার্তা দেয়ার চেষ্টা করছেন, সেটা হলো কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ তার সংস্থার ১৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সাপ্তাহিক স্বদেশ খবরকে বলেন, আমার ধারণা, যারা দুর্নীতি করে তারা এখনও মনে করে, দুর্নীতি করলে পার পাওয়া যাবে। এটা হচ্ছে দুটো কারণে। হয় টাকার জোরে। নতুবা মতার জোরে। তবে ভবিষ্যতে টাকা কিংবা মতার জোরে আর পার পাওয়া যাবে না। গত দেড় বছরে ভীষণভাবে সেই বার্তাটা দেয়ার চেষ্টা করেছি। এটি আমরা কন্টিনিউ করতে চাই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যেসব অনুষ্ঠান আমরা পালন করি, তার মধ্য দিয়েও একই বার্তা দেয়ার চেষ্টা করছি।
ইকবাল মাহমুদ আরও বলেন, একই সময়ে আমরা দুদকের মামলা পরিচালনার েেত্র আরও গতি আনার চেষ্টা করেছি। আগে যেখানে সাজার হার ছিল ২০ ভাগ, তা আমরা ৫৪ ভাগে উন্নীত করেছি। তবে আমি মনে করি, দুদকের মামলায় শতভাগ সাজা হওয়া উচিত। আর সেটা করার জন্যই আমরা মানসম্মত মামলা করছি। গড়পড়তা মামলা করছি না।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, গত এক বছরে আরেকটা কথা বলার চেষ্টা করেছি, সেটা হলো দেশের মানুষ যেন নিজেরাই আইন মানার চেষ্টা করেন। দুদকের পে আইন প্রয়োগ করার জন্য মাত্র ১ হাজার ৭৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। হিসাব করে দেখেছি, ২০ লাখ লোকের জন্য দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা মাত্র একজন। মানুষ যদি নিজেরা আইন মানে, দুর্নীতি না করে, তাহলে দুদকের তদন্তেরও দরকার হয় না। কিন্তু কেউ আইন না মানলে, তাকে তো তার খেসারত দিতেই হবে।
এ প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান স্বদেশ খবরকে বলেন, একটা বিষয়ে অনেকের মাঝেই ভুল ধারণা আছে। সেটা হলো দুদক মানুষকে গ্রেপ্তার করার জন্যই কাজ করছে। আসলে তা নয়। আমরা কাউকে গ্রেপ্তার করতে চাই না। করতে হলে ফোর্স লাগে। পুলিশ লাগে। আমরা চাই, মামলা হোক। আসামিরা আইনের আশ্রয়ে চলে যাক। কিন্তু যারা আইনের আশ্রয়ে যায় না বা যারা দুদকের ডাকে সাড়া দেয় না তারাই গ্রেপ্তার হচ্ছে। আমার ধারণা, তদন্ত কর্মকর্তারা কথা বলার জন্য তাদের খুঁজে পায় না। সংবিধানে আছে, কারও বক্তব্য না শুনে তাকে সাজা দেয়া যায় না। এটা তার মৌলিক অধিকার। কিন্তু তার কথা শুনতে হলে তো তাকে পেতে হবে। কিন্তু তিনি যখন দুদকের কর্মকর্তার কাছে ধরা দেন না বা তিনি নিজে আইনের আশ্রয় নেন না, তখন অনুসন্ধান ও তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে হচ্ছে।
ইকবাল মাহমুদ স্বদেশ খবরকে বলেন, আমরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মতো কিছু তদন্ত করতে চাই। গড়পড়তা তদন্ত করতে চাই না বলেই আমাদের হাতে মামলার সংখ্যাও কমে গেছে। বড় ধরনের দুর্নীতির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করতে চাই। যাকে পুকুর চুরি বা সাগর চুরি, যে ভাষায়ই বলা হোক না কেন তা ধরার জন্য আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি।
ইকবাল মাহমুদ বলেন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের দুর্নীতি খুঁজে বের করতে আমরা ২০টি প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করেছি। যেসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে টিম গঠন করা হয়েছে ওইসব প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান সিস্টেম কী, দুর্নীতির উৎস কী সেটা শনাক্ত করছে প্রাতিষ্ঠানিক টিম। বিদ্যমান সিস্টেম পরিবর্তন করে দুর্নীতিমুক্ত সিস্টেম চালুর সুপারিশও করছে ওই টিম। এজন্য টিমের সদস্যরা ওইসব প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে, কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলছে। নিজেদের চোখ দিয়ে দুর্নীতি দেখছে। এরপর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুপারিশ করছে। এই বিষয়টি চলমান আছে। দুদক এই বিষয়টিতেই এখন সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে। তবে দুর্নীতি প্রতিরোধে জনসচেতনতা, জনসম্পৃক্ততা ও জনগণের সহায়তা খুবই জরুরি বলে মনে করেন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ।

Category: প্রতিবেদন

About admin: View author profile.

Comments are closed.