অর্থনীতি

নতুন ব্যাংক কোম্পানি আইনে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে পরিবারতন্ত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক : ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের চার সদস্য থাকার সুযোগ তৈরি করে দিতে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন প্রস্তাব পাসের সুপারিশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। সুপারিশের পরপরই অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদন সংসদেও উঠেছে। ২২ নভেম্বর সংসদে বিলটি পাসের সুপারিশ করে প্রতিবেদন আইনসভায় উপস্থাপন করেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি মো. আব্দুর রাজ্জাক। জানা গেছে, শেষ পর্যন্ত সংসদের সমাপনী দিনে বিলটি পাস হয়নি। সংসদের সদ্য শেষ হওয়া অধিবেশনে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের বহুল কাক্সিক্ষত এই বিলটি পাস না হওয়ায় পরিবারের চার সদস্যকে এখনই পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করতে পারছেন না তারা। এজন্য জাতীয় সংসদের শীতকালীন অধিবেশন পর্যন্ত বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের অপেক্ষা করতেই হচ্ছে।
সেপ্টেম্বরে বিলটি সংসদে ওঠার পর তা পরীা করে সংসদে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। অক্টোবরে বিলটি নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনার কথা ছিল। তবে ওই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত উপস্থিত না থাকায় আলোচনা হয়নি।
প্রস্তাবিত আইনে একটানা নয় বছর পরিচালক পদে থাকার বিধানও রাখা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে এক পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুজন সদস্য একটি ব্যাংকের পরিচালক হতে পারেন। আর ৩ বছর করে পরপর দুই মেয়াদে মোট ৬ বছর একই ব্যক্তি পরিচালক হতে পারেন। এরপর ৩ বছর বিরতি দিয়ে আবারও পরিচালক হতে পারেন। বিদ্যমান আইনে অনেকেরই পরিচালক থাকার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছিল। নতুন ব্যাংক কোম্পানি আইন পাস হলে বর্তমান পরিচালকরা আরো ৩ বছর পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারবেন। এর মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের কাছে সরকারের নতিস্বীকার হলো বলেও মনে করছেন অনেকেই।
সংশোধনীতে পরিচালকের মেয়াদ সংক্রান্ত ধারায় বলা হয়েছে এই আইন কার্যকর হওয়ার পর কোনো ব্যক্তি কোনো ব্যাংক কোম্পানির পরিচালক পদে একটানা ৯ বছরের বেশি থাকতে পারবেন না। একই ধারায় বলা হয় একটানা ৯ বছর পদে থাকার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ৩ বছর অতিবাহিত না হলে তিনি পরিচালক পদে পুনঃনিযুক্তির জন্য যোগ্য হবেন না। এই ধারার ব্যাখ্যায় বলা হয় কোনো ব্যক্তি পরিচালক পদে ৩ বছরের চেয়ে কম সময় অধিষ্ঠিত না থাকলে একটানা ৯ বছর গণনার েেত্র ওই সময়ও অন্তর্ভুক্ত হবে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ পাস হওয়ার পর থেকে বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালকদের মেয়াদ সম্পর্কিত ধারাটি এ পর্যন্ত ৫ বার সংশোধন করা হয়েছে। এই ধারায় ব্যাংকের পর্ষদে একজন পরিচালক কত বছর পরিচালক থাকতে পারবেন, সে কথা বলা রয়েছে। সর্বশেষ ধারাটি সংশোধন করা হয় ২০১৩ সালে। এবার ষষ্ঠবারের মতো সংশোধনের প্রস্তাব এসেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনে ষষ্ঠবারের মতো সংশোধনের প্রস্তাব দেখেই বোঝা যায়, এই আইনের বিভিন্ন ধারা কার পক্ষে যাচ্ছে অথবা কার বিপক্ষে যাচ্ছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ধারাগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে ব্যাংক মালিক ও গ্রাহক উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়। কিন্তু ব্যাংক মালিকরা মনে করছেন, বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইন তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করছে না। তাদের স্বার্থের দিকটি বিবেচনা করে এ পর্যন্ত পাঁচবার ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধন করা হয়েছে। ষষ্ঠবারের মতো সংশোধনের প্রস্তাব দিয়ে ব্যাংক মালিকরা সরকারকে চাপ দিচ্ছেন ব্যাংক কোম্পানি আইনের কয়েকটি ধারা যেন সংশোধন করে একজন ডিরেক্টরকে একটানা ৯ বছর বোর্ড অব ডিরেক্টর্সে থাকার সুযোগ দেয় এবং ব্যাংক মালিকের পরিবারের ৪ জন সদস্যকে বোর্ড অব ডিরেক্টর্সে যেন স্থান করে দেয়া হয়।
অবাক করা বিষয় হলো সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় ব্যাংক মালিকদের এই বায়না কোনোরূপ শর্ত ছাড়াই মেনে নেয়ার সমস্ত ব্যবস্থা চূড়ান্ত করেছে। তাই এ নিয়ে শুরু হয়েছে সমালোচনা। অনেক সমালোচক বলছেন, মাত্র ৪০-৫০টি পরিবারের স্বার্থ দেখতে গিয়ে সরকার অন্তত ২ কোটি পরিবারের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিচ্ছে। ব্যাংক মালিকসহ তার পরিবারের ৪ জন সদস্যই যদি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বোর্ড অব ডিরেক্টর্সে থাকেন, তাহলে ওই ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া কোনো অবস্থাতেই সাধারণ গ্রাহকের অনুকূলে যাবে না। একই পরিবারের ৪ জন সদস্যের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে ওই ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া। আবার অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাবে ব্যাংক মালিকসহ পরিবারের ৪ সদস্যের নামে-বেনামের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কাছেই যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের দেয় ঋণের ৮০ শতাংশ। ফলে মোটা দাগে বিনিয়োগের ওপর একটি বিরূপ প্রভাব পড়বে। দেশি বিনিয়োগ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে কয়েকটি পরিবারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। ব্যাংকটির ঋণদান প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ায় এক সময় ব্যাংকটি কলাপস করবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের লাখ লাখ গ্রাহক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, টানা ৯ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা সরকারের পক্ষে টানা তৃতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার জন্য বেসরকারি ব্যাংকের বিষয়ে ষষ্ঠবারের মতো ব্যাংক কোম্পানি আইনে সংশোধনী আনা মোটেই ঠিক হবে না। এতে মুষ্টিমেয় কয়েকটি পরিবারের হাতে জিম্মি হয়ে পড়বে দেশের গোটা ব্যাংক ব্যবস্থা। এখন যারা বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকের ডিরেক্টর হিসেবে আছেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিদ্যমান আইনটি চালু থাকলে তাদের প্রায় সকলেরই মেয়াদ চলতি বছরেই শেষ হয়ে যাবে। তাদের জায়গায় আসবেন নতুন ডিরেক্টর্স। নতুনরা নতুনভাবে ব্যাংকের ঋণদান নীতি ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবেন। কিন্তু ব্যাংক কোম্পানি আইন ষষ্ঠবারের মতো সংশোধন হলে বিদ্যমান ডিরেক্টররাই আরো ৩ বছরের জন্য থেকে যাবেন বোর্ড অব ডিরেক্টর্সে। ডিরেক্টর হিসেবে পেয়ে যাবেন পরিবারের আরো ২ সদস্যকে। ফলশ্রুতিতে আগামী ১ বছর এই ডিরেক্টররা তাদের পারিবারিক মালিকানাধীন ব্যাংকটি থেকে যত ধরনের অনৈতিক সুবিধা আছে, তা নেয়ার চেষ্টা করবেন। এতে দেশের গোটা অর্থনীতির ওপরই একটা বিরূপ প্রভাব পড়বে। এই প্রভাব গিয়ে পড়বে ভোটারের ওপরও। সুতরাং সরকারকেই চিন্তা করতে হবে ষষ্ঠবারের মতো ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করলে তা গ্রাহক তথা জনগণের পক্ষে যাবে, না ব্যাংক মালিকদের পক্ষে। যদি এই সংশোধনী জনগণের পক্ষে না যায় তাহলে সরকারের এই শেষ সময়ে এসে ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধন মোটেও সমীচীন হবে না।