কলাম

ন্যায় বিচারের বদলে ‘নাই বিচার’

জাফর ওয়াজেদ : ইতিবাচক পথে তিনি হাঁটতে রাজি নন। রাজি না হওয়ারই কথা। কারণ নেতি থেকে যার উত্থান, তিনি তো নেতিতেই প্রাণ খুঁজে পান। তাই সত্যকে চাপা দিয়ে মিথ্যাচারকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি অনর্গল যা বলে যান, তাতে বাস্তবতার কোন ঠিকুজি থাকে না। আয়নায় নিজের মুখ নয়, তিনি দেখেন প্রতিপরে অবয়ব। আর বাড়ে ুব্ধতা। ােভে-বিােভে ফেটে পড়েন তখন। নেতিবাচক মন তার সত্যকে পদপিষ্ট করে অসত্যের পতাকা ওড়াতেই পছন্দ করে। সেই পছন্দ তার একার বা নিজের নয়, অনুসারীরাও সেই সুরে বাজান মিথ্যার ঢোল। তারা হয়ত মনে করেন শক্তিশালী গদ্যকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষ্যকেই সঠিক। যেখানে মানিক বলেছেন, ‘মিথ্যাচারেও মহত্ত্ব আছে। হাজার হাজার মানুষকে পাগল করিয়া দিতে পারে মিথ্যার মোহ।’ সেই চল্লিশের দশকে এই উচ্চারণ ছিল বিক্রমপুরের সন্তান মানিকের। পাগল তো অবশ্যই করে, পাগলামিতে উর্বর যাদের মস্তিষ্ক তারা তো উল্লাস করবেনই। হয়েছেও তাই। এক সময় তো সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মিথ্যার হিস্ট্রিরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মতায় সমাসীন করেছিল। কিন্তু ফল যা পেয়েছে, তাতে জনগণ পরবর্তীকালে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। জার্মান একনায়ক এডলফ হিটলার তার মধ্যে বসত করে নির্বিবাদেই, কোনো রাখঢাক ছাড়াই সম্ভবত। হিটলার যেমন বলতেন, ‘যদি কোনো মিথ্যাকে তুমি বার বার এবং সাবলীলভাবে বলতে পার, তবেই তা বিশ্বাসযোগ্য হবে।’ এই মিথ্যাচারের পরীায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। দেখিয়ে দিয়েছেন, মিথ্যার পথ ধরে মতার সিঁড়িতে আসীন হওয়ার মোজেজা। ‘আওয়ামী লীগ মতায় গেলে দেশ বিক্রি হয়ে যাবে’ ‘মসজিদে শোনা যাবে উলুধ্বনি’ কিংবা পার্বত্য শান্তি চুক্তিকালে বলেছিলেন, ‘চুক্তি সম্পাদন হলে চট্টগ্রাম ও ফেনী ভারতের অংশ হয়ে যাবে।’ সবই যে তার চেতনাপ্রসূত মনগড়া, সেসব উপলব্ধি মানুষ তাৎণিকভাবে হয়ত করতে পারেনি। কিন্তু ঘটনার ঘনঘটায় সেসব যে বেফাঁস মন্তব্য, তা কাচের মতো স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর সম্পর্কে মানুষ সজাগ হয়ে গেছে। তাই সত্যকে দলিত মথিত করে মিথ্যাকে উচ্চাসনে রেখে তিনি যা-ই বলেন না কেন, তাতে মানুষ আর মুগ্ধ হয় না। হতো, যদি শেখ হাসিনার মতো মানুষ বুঝতে পারত ‘যে মিথ্যায় মঙ্গল নিহিত, তা অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত সত্য অপো শ্রেষ্ঠতর।’ কিন্তু মঙ্গল নিহিত আছে যে পথে সেই পথে তিনি এগিয়ে যেতে চান না, যাননি কখনও। অমঙ্গলের অশুভকেই তিনি মেলে ধরেছেন সব সময় জনগণের কাছে। জনগণ হয়ত ভাবে অমন শোভন অবয়ব থেকে মিথ্যার ফুলঝুরি অনায়াসে টুপটাপ ঝরে পড়ার নেপথ্যে মাহাত্ম্য কিছু রয়েছে। তা থাকারই কথা। জনগণকে বিভ্রান্তির ঘেরাটোপে আবদ্ধ করা গেলে, তাকে যা খুশি গেলানো যায়। সহজ-সরল দেশের মানুষ হয়ত তার বাক্যবাণে হয়েছিল আবেগ আপ্লুত। ভেবেছিল, মতার বাইরে যা-ই বলুন না কেন, মতায় সমাসীন হলে তিনি রাষ্ট্রনায়কের আচরণ করবেন। জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করবেন। কিন্তু সেসব কিছুরই দেখা মেলেনি। দু’দফায় মতায় থেকে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। তিনি এবং তার পুত্রধন মিলে সরকার ব্যবস্থাকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে তার স্বামী জান্তা শাসকের উচ্চারিত, ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’-কেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের সম্পদ লুটপাট, অপচয়, জনগণকে নিপীড়নÑ সবই চালানো হয়েছে। তাদের সেসব আচরণ মানুষ ভুলে যায়নি। সময়ের সঙ্গে খাপ-খাওয়ানোর জন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের কোনো পরিবর্তন আসেনি। মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য, সম্ভাবনাময় ও বাস্তবসম্মত কোনো ভবিষ্যৎ কর্মসূচি ও পরিকল্পনা তারা তুলে ধরতে পারেনি। প্রতিপকে খারাপ প্রতিপন্ন করার মধ্যেই তিনি ইহজাগতিক সুখ লাভ করেন বলে প্রতীয়মান হয়। বেগম জিয়া ও তার নিয়ন্ত্রিত দল বিএনপি এবং জামায়াত এ পর্যন্ত যত আন্দোলন-সংগ্রাম আর কর্মসূচি দিয়েছে তার প্রায় সবই হচ্ছে মতায় পৌঁছার সিঁড়ি খোঁজার। জনকল্যাণমুখী কোনো দাবি নিয়ে রাজপথে জনপদে নামার আগ্রহ দেখায়নি কখনও। মতায় থেকে বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেনি সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য। বরং দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের ঐতিহ্যই তৈরি করেছে। আর বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধানের মূলমন্ত্র, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে মেনে চলার ধারে কাছেও নেই। হেয় করে কথা বলার যে সংস্কৃতি তিনি ধারণ করে আছেন, সেই অন্তঃস্থল থেকে উদ্গীরিত হয়, ‘তেনাদের আমলে এক নেত্রী ছিলেন’ জাতীয় অভব্য বাক্য। আবার বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভাব এনে নাম ধরে বলেন, ‘হাছিনা’। শিষ্টাচার, বভ্যতার কোনো রেশ বা লেশমাত্র যার নেই, মানুষকে অপমান আর অপদস্থ করার স্বভাব পরিত্যাগ করতে পারেননি, দুদফা প্রধানমন্ত্রী থাকার ফলে। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতায় যদি বিশ্বাসই করতেন, তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্কের অবতারণা করতেন না। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে তার বক্তব্য ছিল অপাঙক্তেয় এবং অমার্জিত। এ নিয়ে আলোচনা করাও স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য লজ্জাকর ও ঘৃণার। একাত্তরের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের পে তিনি দৃঢ় অবস্থান নিয়ে, সহিংসতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহি অবস্থান নিয়েছিলেন। আর তা ধারণ করা তার পূর্বাপর জীবনধারারই অংশ। মুক্তিযুদ্ধকালীন তার অবস্থান নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া স্বামীর আহ্বানে তিনি সাড়া দেননি। পাকিস্তানি হানাদারদের নিরাপত্তাব্যূহ ছেড়ে তিনি মুক্তাঞ্চলে যেতে কেন রাজি হননি, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন এখনও রয়েছে। যার কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। অর্বাচীন আচরণকে সামনে এনে তিনি ত্রিশ লাখ শহীদদের তালিকা চান। অথচ তার জানা সঙ্গত যে, বিশ্বযুদ্ধ এমনকি পৃথিবীর নানা অঞ্চলের গণহত্যায় মৃতের সংখ্যা মাথা গুনে হিসাব করার সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক নানা সূত্রের ওপর নির্ভর করে একটি গড়পড়তা হিসাব হয়। বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার আগেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ত্রিশ লাখের মতো একটি প্রাথমিক হিসাব প্রকাশ হয়েছিল। হিসাব করলে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। শরণার্থী শিবিরে যারা মারা গেছেন, তারা হিসাবের বাইরে রয়ে গেছেন। সেই সংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি হওয়ার কথা। বেগম জিয়া ও তার সারিন্দারা এমনও বলেছেন, মতায় গেলে তারা শহীদদের সংখ্যা গুনে বের করবেন। বাচাল আর উন্মাদ ছাড়া এমন ভাষ্য আর কোথাও মিলবে না। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরে প্রচারিত ও গৃহীত একাত্তরের শহীদদের আনুমানিক পরিসংখ্যান বিশ্ববাসীও জানে। কেন তারা এই সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক তৈরির প্রয়াস পায়; তার উত্তর জানা। পাকিস্তান কোনোভাবেই স্বীকার করতে চায় না, একাত্তরে গণহত্যা হয়েছে। ত্রিশ লাখ শহীদ হবার বিপরীতে পাকিস্তানের অবস্থানকেই বিএনপি-জামায়াত তাদের অবস্থান হিসেবে ধারণ করে আসছে এসব প্রশ্ন তুলে বিএনপি-জামায়াত নেত্রী মুক্তিযুদ্ধকে ‘খেলো’ করে তোলা শুধু নয়, মুক্তিযুদ্ধের আবেগ আর মহিমার ওপর আঘাতও হানছে। মস্তিষ্কে ও চেতনায় যাদের পাকিস্তান ভর করে আছে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার অর্থসহায়তায় নির্বাচনে অংশ নিয়ে যারা মতায় আসেন, তারা মুক্তিযুদ্ধকে পদপিষ্ট করার উদগ্র বাসনাকে তুলে ধরবেন, সেটাই স্বাভাবিক। সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমান পঁচাত্তর-পরবর্তী মতা দখল করে রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসনে যতটা নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন, ততটা মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত সুফল এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস করতে সচেষ্ট ছিলেন। সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানের পর অভ্যুত্থান ঘটেছে তার এই পাকিস্তানি হয়ে ওঠার বিপরীতে। তিনি সশস্ত্র পন্থায় সৈন্য নিধন শুধু নয়, মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও সৈনিকদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলাতে দ্বিধা করেননি। দুর্নীতির টোপে বহু রাজনীতিককে বশংবদ বানিয়ে তাদের বিরাজনীতিক প্রক্রিয়ায় ঠাঁই দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক দল ভাঙা, নেতাদের চরিত্র হনন, রাজনীতিকে সেনা ছাউনির নিয়ন্ত্রিত করার কাজটি দতার সঙ্গে সম্পাদন করেছিলেন। সেই বেগম জিয়া নানা সময় সেনাবাহিনীকে উসকে দিতে চেয়েছেন মতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে। জেনারেলের স্ত্রী হিসেবে তিনিও সেই একই স্টাইলে ছড়ি ঘুরিয়েছেন। তাই এবার নির্বাচনের সময়ও তিনি সেনা মোতায়েন ও তাদের বিচারিক মতা প্রদানের দাবিতে সোচ্চার। ২০০১ সালে সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার জন্য সচেষ্ট ছিলেন তিনি। অবশ্য বিএনপির প থেকে সেনাবাহিনীকে জাতীয় ইস্যু তৈরির প্রবণতা বরাবরই এদেশের মানুষ দেখে আসছে। ২০১২ সালে সেনাবাহিনীতে একটা অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত হয়ে পালিয়ে যাওয়া এখনও পলাতক এক কর্মকর্তাকে নিয়েও মিথ্যাচার করতে কসুর করেননি বেগম জিয়া। পুলিশ যেখানে বলেছে, জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত মেজর জিয়া তখন পালিয়ে যায়। আর বিএনপি থেকে বলা হলো সেনাবাহিনীর অফিসারও নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। এই ব্যক্তির জঙ্গিপনাকে বিএনপি বৈধতা দিতে চেয়েছে। আর অভ্যুত্থান মানেই তো জেনারেলের স্ত্রীকে মতায় বসানো। সেই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যে বিএনপি জড়িত থাকতে পারে, এসব ভাবাই তা প্রমাণ করে। আরও দেখা যায়, ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার আশঙ্কায় তা বানচাল করার জন্য বিএনপি মনোনীত স্বাধীনতাবিরোধী রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ২০ মে সেনাবাহিনীর ভেতরে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টির যে অপচেষ্টা করেছিলেন, দেশবাসী তা প্রত্য করেছে। নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবি স্বচ্ছ নির্বাচনের প্রয়োজনে নয়, বরং সুশৃঙ্খল বাহিনীকে বিতর্কিত করে ফায়দা লোটার চেষ্টা বললে অত্যুক্তি হয় না। অযথা রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে ফেলার ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়ার প্রবণতাই পরিলতি হয়, যা প্রকৃতপে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য তিকর। পুলিশের জায়গায় সেনাবাহিনীকে ঠেলে এনে সেনাবাহিনী ও জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়ার মধ্যে স্বচ্ছ ও ভালো কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে না। তাই অপ্রয়োজনীয় সেনা মোতায়েনের দাবির পেছনে অতীতের মতোই দুরভিসন্ধি কাজ করছে।
বিএনপি-জামায়াত নেত্রী জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি করতে চান বলে জনসভায় ঘোষণা দিয়ে পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটেছেন। যিনি জাতির পিতা, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ঘোষণা, সংবিধানের মূলমন্ত্রকে স্বীকার করেন না। বরং পাকিস্তানি ধারায় বিতর্কিত করে তোলার ল্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে এনে চালাকির মাধ্যমে ছলচাতুরী প্রকাশ করছেন। তিনি কিসের ঐক্য চান, তা জনগণের কাছে স্পষ্ট। জামায়াত ও স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে নিয়ে যে ঐক্য গড়তে চান, তা বাংলাদেশকে দ্বিতীয় পাকিস্তানে পরিণত করার ঐক্য বৈকি। তার বিরুদ্ধে মতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির যে মামলা বিচারাধীন, তা তারই সৃষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারই করেছে। মিথ্যাচারকে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি বলে বেড়াচ্ছেন এসব মামলা করেছে বর্তমান সরকার। আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি অসত্য বাক্য উচ্চারণ করে বলেছেন, এসব মামলা ভুয়া, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এসব মামলা থেকে দায়মুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সরকারেরও সেই এখতিয়ার নেই। সহায়ক বা নির্দলীয় বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামক বায়বীয় সরকারের দাবি তুলছেন, সেই সরকার পেলে তিনি প্রথমেই বাধ্য করবেন মামলা থেকে দায়মুক্তির জন্য। অন্যথায় নির্বাচনে যাবেন না। এমনকি বোমা মেরে জীবন্ত মানুষ হত্যার দায়ে করা মামলাও প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেবেন। তার ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড-এর অর্থই হচ্ছে সকল অপকর্ম, দুর্নীতি ও মানুষ হত্যার অপরাধকে মুছে দিয়ে কলুষমুক্ত নিরপরাধীতে পরিণত করার সুযোগ প্রাপ্তি, যা কখনোই হওয়ার নয়। তার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দেখেছে এ দেশের মানুষ ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ সময়ে। তার আগ্রাসী শাসনকালে ২১ আগস্ট যে নারকীয় হতাকা- ঘটিয়েছেন তা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য নির্দলীয় সরকার চাইছেন। কিন্তু বিচারের মুখোমুখি হতে চান না বলেই আদালতে যথাসময়ে হাজিরা দেন না। ফলে মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। আদালতে তিনি যে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন, তা বিষোদ্গারপূর্ণ। এতিমদের অর্থ নিয়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে, আদালতই তা নিষ্পন্ন করবে, সরকার নয়। বিচার ব্যবস্থার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে তিনি আদালতের প্রতি বিরূপ ভাষ্য উচ্চারণ করতেও দ্বিধাগ্রস্ত হননি। বর্তমান সরকারের আমলে যেখানে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া বিচার বিভাগ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র অবস্থানকে পোক্ত করছে, সেখানে আদালতের ওপর শাসকদের রাজনৈতিক চাপ ও কর্তৃত্ব আর নেই, যা ছিল বিএনপির সময়ে। সুপ্রিমকোর্টের অপ্রকাশিত রায় বাড়িতে নিয়ে এসে বিএনপি নেতাদের পাশে বসিয়ে শোনাতে পারেন যে বিচারক, তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়। এই বিচারক মফস্বলের একটি জেলার বিএনপি নেতা ছিলেন। রাষ্ট্রপতি বি. চৌধুরীকে ধাওয়া শুধু নয়, মেয়াদ শেষের অনেক আগেই তাকে মতাচ্যুত করা হয়েছিল। বি. চৌধুরী ন্যায় বিচার নয়, নাই বিচারই পেয়েছিলেন।
আদালতের কাছে ন্যায় বিচার পাবেন কি না, সে নিয়ে বেগম জিয়া সংশয় প্রকাশ করেছেন। এমনটাও বলেছেন, বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ আতঙ্কগ্রস্ত করে ফেলা হয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে আদালতে দাঁড়িয়ে বেগম জিয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাজনৈতিক মিথ্যাচার সম্পর্কিত বক্তৃতা প্রদর্শন করেছেন কিভাবে? পেট্রলবোমায় নিহতদের পরিবার বলতে পারে, তারা বিচারই পাচ্ছে না। ন্যায় বিচার তারাও চায় বেগম জিয়ার মতোই। কিন্তু তারা আশা ছাড়েনি, তারা আজ হোক, কাল হোক ন্যায় বিচার পাবে বলে আশাবাদী। তাদের সেই আশাবাদ বেগম জিয়াকে অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করার বিষয় নয়। সত্য উদ্ঘাটিত হবেই। মিথ্যার আবরণে তা ঢাকা পড়বে না।