আন্তর্জাতিক

যে কারণে পদত্যাগ করলেন মুগাবে

স্বদেশ খবর ডেস্ক : জনতার বিােভের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও নিজ দলের মধ্যে থেকে প্রচ- চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে। যদিও প্রথম দিকে পদ ছাড়বেন না বলে অনড় ছিলেন ৯৩ বছর বয়সী জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে। এ অবস্থায় মুগাবেকে মতা থেকে সরে দাঁড়াতে সময় বেঁধে দেয় তারই মতাসীন দল জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়ন-প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট (জানু-পিএফ)। দলীয় প্রধানের পদ থেকে রবার্ট মুগাবেকে বহিষ্কার করে জানু-পিএফ পার্টি জানায়, ২০ নভেম্বর দুপুর ১২টার মধ্যে মুগাবে মতা থেকে সরে না দাঁড়ালে তাকে অভিশংসন করা হবে। অবশেষে ২০ নভেম্বর বিকেলে পার্লামেন্টে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর প্রক্রিয়ার মধ্যেই শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন মুগাবে। ফলে দেশটিতে ৩৭ বছরের মুগাবে শাসনের অবসান ঘটে।
এর আগে জনতার বিােভের মুখে রবার্ট মুগাবেকে জানু-পিএফের প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। দলীয় প্রধানের নতুন দায়িত্ব দেয়া হয় দেশটির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এমারসন নানগাগওয়াকে। ধারণা করা হচ্ছে এমারসন নানগাগওয়াই হচ্ছেন জিম্বাবুয়ের নতুন প্রেসিডেন্ট। জানু-পিএফ পার্টির উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্বের মধ্যে ১৯ নভেম্বর সেনাবাহিনী জিম্বাবুয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার কথা জানায়। এরপরই মুগাবেকে হারারেতে তার বিলাসবহুল ভবন ‘ব্লু রুফ’ এ গৃহবন্দি করে রাখার খবর আসে।
২১ নভেম্বর জিম্বাবুয়ের পার্লামেন্টের স্পিকার জ্যাকব মুডেনডা মুগাবের পদত্যাগের কথা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মুগাবে তার পদত্যাগপত্রে লিখেছেন, তিনি চাপের মুখে নয়, স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। নির্বিঘেœ মতা হস্তান্তরের সুযোগ করে দিতেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। পদত্যাগের কারণে তার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া অভিশংসন প্রক্রিয়াও পরে স্থগিত করে পার্লামেন্ট। পার্লামেন্ট ভবনে মুগাবের অভিশংসন নিয়ে বিতর্ক চলার সময় তার পদত্যাগের ঘোষণা এলে পার্লামেন্ট সদস্যরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে হাত উঁচিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার খবর পেয়ে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে উল্লাস প্রকাশ করেন। আগে থেকে রাজপথে অবস্থান নেয়া সেনাসদস্যদের সঙ্গে যোগ দিয়ে তারা উল্লাস প্রকাশ করেন। দেশটির অনেক মন্ত্রী এমপিও জনতার সঙ্গে উল্লাসে যোগ দেন। তারা বলেন, একটা ‘দমবন্ধ শাসন’ থেকে বেরিয়ে এলো জিম্বাবুয়ে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট এমারসন রবার্ট মুগাবের ঘনিষ্ঠদের একজন ছিলেন। কিন্তু মুগাবে চেয়েছিলেন মতা ছাড়ার পরও যেন মতার কাছাকাছি থাকতে পারেন। তাই স্ত্রী গ্রেস মুগাবেকে প্রেসিডেন্ট করার চেষ্টায় ছিলেন তিনি। ফলে এমারসনের সঙ্গে তৈরি হয় মুগাবের মতার দ্বন্দ্ব। সম্প্রতি সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে এমারসনকে বরখাস্ত করেন মুগাবে। এ কারণে তার বিরুদ্ধে ুব্ধ হয় সেনাবাহিনী। ফলশ্রুতিতে এক ‘অদৃশ্য ক্যু’র মাধ্যমে নাড়িয়ে দেয়া হয় মুগাবের মসনদ।
মুগাবের চার দশকের শাসনামলে এক সময়ের সমৃদ্ধ দেশটির অর্থনীতির বিপর্যয় ঘটে। বিরোধীদের নির্যাতন ও দমন পীড়ন চালানো হয়। ১৯৪০ সালে জিম্বাবুয়ে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীন হয়। মুগাবে স্বাধীনতা যুদ্ধে লড়াই করেছেন। ঔপনিবেশিক পরবর্তী সময়ে জিম্বাবুয়ের জাতির পিতায় পরিণত হন তিনি। তবে অনেকেই দাবি করেন, তিনি জিম্বাবুয়ের অর্থনীতিকে ধ্বংস করেছেন।
প্রতিবেশী দণি আফ্রিকায় ১৯৯৪ সালে জাতিগত বিদ্বেষের অবসানের পে দৃঢ় অবস্থান জানানো নেতাদের মধ্যে মুগাবে ছিলেন অন্যতম। কালোদের নেতা মুগাবে পাশ্চিমা দেশগুলোতেও থিংকিং ম্যানস গেরিলা নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তবে ১৯৯০ সালের পর জিম্বাবুয়ের অর্থনীতি খারাপ হতে থাকলে দেশে তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়তে থাকে। সে সময় মুগাবে সমালোচকদের থামাতে দমন-নিপীড়নের আশ্রয় নেন, যাতে নায়ক মুগাবে দিন দিন জনগণের চোখে খলনায়কে পরিণত হতে থাকেন।
২০০৪ সালের দিকে মুগাবে আকস্মিক এক ঘোষণায় দেশের সব কৃষি জমি জাতীয়করণ করে ফেলেন। জিম্বাবুয়ে থেকে ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষি জমির বিলুপ্তি ঘটে। এর বাইরে ব্যক্তি মালিকানাধীন বিভিন্ন কৃষজ খামারও জাতীয়করণের আওতায় আনা হয়। পত্রিকায় এক বিজ্ঞপ্তিতে সব জমির মালিকদের প্রতি তাদের জমি সরকারের হাতে সমর্পণের নির্দেশ দেয়া হয়। দেশটির অর্থনীতিবিদরা একে কুখ্যাত সামন্ততান্ত্রিক যুগের শুরু বলে সমালোচনা করেন। ব্যাপক ােভ তৈরি হয় সাধারণ মানুষের মাঝেও। কিন্তু তারপরও রাস্তায় নামতে সাহস পায়নি কেউ। নীরবে সরকারি আদেশ মেনে নেয়। এর আগে থেকেই মুগাবের সরকার ভূমি সংস্কার কর্মসূচির আওতায় সাড়ে ৪ হাজারের বেশি শ্বেতাঙ্গ মালিকের জমি জব্দ করে সেগুলো কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বিতরণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। জমি জাতীয়করণের ফলে কৃষ্ণাঙ্গরাও জমির মালিকানা হারায়।
ব্যক্তিগত জীবনে মুগাবে গ্রেসকে বিয়ে করেন ১৯৯৬ সালে। তখন তার ভূমিকা ছিল কেবলই ফার্স্ট লেডির। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি বড় রাজনীতিকের ভূমিকায় বসেন। ২০১৪ সালে মতাসীন দল জানু পিএফ-এর নারী শাখার প্রধান নিযুক্ত হন। এই পদাধিকার বলে তিনি দলের প্রেসিডিয়ামেও স্থান পান। তিনি ওই বছরই ভাইস প্রেসিডেন্ট জয়েস মুজুরুকে দল থেকে বের করে দেন। তার ল্য ছিল স্বামী মতা ছাড়ার পর সেই পদে স্থলাভিষিক্ত হওয়া। কিন্তু মুগাবের পদত্যাগের কারণে তার সেই আশা ভঙ্গ হলো।
এদিকে সেনাবাহিনী দেশ ছেড়ে পালানোর সুযোগ দেবে এমন শর্তে মুগাবে পদত্যাগে রাজি হয়েছেন। ২১ নভেম্বর রাতেই তার দেশ ছাড়ার কথা। তবে সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তার স্ত্রী গ্রেসকে তারা মুগাবের সাথে দেশ ছাড়তে দেবে না। এযাবৎ তিনি যত দুর্নীতি করেছেন তার বিচারের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। মুগাবের দলের সদস্যরা বলেছেন, স্ত্রীর মতার মোহ মুগাবের পতন ডেকে এনেছে। অবরুদ্ধ হয়ে থাকা বাড়ি থেকে যেকোনো সময় মুগাবের স্ত্রী গ্রেসকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে।
মুগাবের পদত্যাগের খবরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বলেন, এবার জিম্বাবুয়ে নির্যাতনমূলক শাসন থেকে বের হয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবার একটা সুযোগ পেল। তিনি বলেন, জিম্বাবুয়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে নতুন প্রেসিডেন্টের পাশে থাকবে তার দেশ। অন্যদিকে হারারেতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস তার প্রতিক্রিয়ায় বলে, এটা জিম্বাবুয়ের জন্য একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দেশটির মানুষ তাদের দাবি আদায় করতে সম হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনৈতিক প্রধান ফেডারিকা মোঘারিনি মুগাবের পদত্যাগকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেন। দণি আফ্রিকার প থেকেও মুগাবের পদত্যাগকে স্বাগত জানানো হয়।