প্রতিবেদন

রাজধানীর স্কুলে ভর্তি যুদ্ধ : কঠিন লড়াইয়ে ছাত্রছাত্রী-অভিভাবক

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে ভর্তি যুদ্ধ সমাগত। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হবে ২৬ ডিসেম্বর। সরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে ভর্তি আবেদন শুরু হবে আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে। আবেদন চলবে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ১৯, ২০ ও ২১ ডিসেম্বর যথাক্রমে ক, খ ও গ গ্র“পের স্কুলগুলোতে ভর্তি পরীা অনুষ্ঠিত হবে। ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যেই ফল প্রকাশ করা হবে এবং নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেই কাস শুরু হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিা অধিদপ্তরের (মাউশি) ভর্তি কমিটির এক সভায় ১৯ নভেম্বর এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ভর্তি হওয়ার ভাগ্যযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে কয়েক লাখ সোনামণি। আরো কয়েক লাখ শিক্ষার্থী লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এবং ডোনেশনের মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য প্রস্তুত। মানসম্পন্ন স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করানোর জন্য অভিভাবকদের দৌড়ঝাঁপের কমতি নেই। ভর্তি কোচিং চলছে বেশ জোরেশোরে। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির লোকজনকে ম্যানেজ করে সন্তানকে কাক্সিক্ষত স্কুলে ভর্তি করানো যায় কি নাÑ সে বিষয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। ম্যানেজিং কমিটির লোকজনও বাজার খুলে বসেছে। ডোনেশনের অঙ্ক তারা ক্রমেই বাড়াচ্ছে। ডোনেশন প্রদান নিয়ে সচ্ছল অভিভাবকদের অবশ্য কোনো চিন্তা নেই। দশ লাখ টাকা ডোনেশন দিয়েও যদি একমাত্র কন্যাকে ভিকারুননিসায় বা আইডিয়ালে পড়ানো যায় তাহলে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। এক লাফে জাতে ওঠা যাবে। এলিট শ্রেণি অন্য চোখে তাকাবে। কারণে-অকারণে যেখানে-সেখানে যখন-তখন বলা যাবে ‘আমার মেয়ে ভিকারুননিসা, আইডিয়ালে পড়ে’। এজন্য এই শ্রেণির অভিভাবকরা শুধু অথেনটিক পার্টি খুঁজছে এবং তাদের কার্যক্রম চলছে গোপনে। কিন্তু চরম উদ্বিগ্নের মধ্যে আছেন মধ্যবিত্ত শ্রেণির অভিভাবকরা। তারা ধরেই নিয়েছেন, ডোনেশনের প্রতিযোগিতায় তিনি উচ্চবিত্তের সমান্তরালে থাকতে না পারলে তার সন্তানটি যতই মেধাবী হোক, লিখিত পরীক্ষায় একশতে একশ এবং মৌখিক পরীক্ষায় প্রশ্নের উত্তর যত ঝটপট ও নির্ভুলই দিক না কেন ভর্তি খাতায় নাম ওঠানো খুব সহজ হবে না। তারাও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কোনোরূপ ঝুঁকি নিতে চান না। তাই এই শ্রেণির অভিভাবকরাও চেষ্টায় আছেন জানুয়ারির আগেই কিভাবে লাখ পনের জমিয়ে ফেলা যায় সন্তানকে আইডিয়াল কিংবা মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরিতে ভর্তি করানোর আশায়। মানসম্পন্ন স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করানোর দুর্দমনীয় আশায় অনেক মধ্যবিত্ত এফডিআর ভাঙানোর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন, কেউ কেউ ঢাকার পাশে পুবাইল কিংবা সাভারে অনেক চেষ্টায় যে একখ- জমি রেখেছিলেন, তা বিক্রি করে দেয়ার চিন্তা করছেন, কেউ স্ত্রীর গহনা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত পাকা করেছেন।
রাজধানী ঢাকা, বিভাগীয় এবং জেলা শহরের স্বনামধন্য বেসরকারি স্কুলে একটি ভর্তি আসন অভিভাকদের কাছে যেন সোনার হরিণ। শিাবিদ আর অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সন্তানকে পছন্দের শিা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি নিশ্চিত করতে নানা পন্থা বেছে নিচ্ছেন অভিভাবকরা। কেউ সন্তানের বয়স বাড়িয়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ নতুন জন্মসনদ নিয়ে বয়স কমিয়ে নিচ্ছেন। পছন্দের স্কুলে ভর্তি নিশ্চিত না করতে পেরে অনেকে পরের বছরের জন্য অপো করেন। ভর্তির মৌসুমে অভিভাবকদের নির্ঘুম রাত কাটে। দিনে শিার্থীদের নিয়ে কোচিংয়ে ছোটাছুটি। রাতে বাসায় পড়ানো। এমন চাপে পিষ্ট কোমলমতি শিশুরা। এ ধরনের প্রতিযোগিতায় বেড়ে যাচ্ছে শিাবাণিজ্য। ধনী-গরিবের লেখাপড়ায় বাড়ছে বৈষম্য।
২০১৮ শিাবর্ষের ভর্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে এমন অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষাদান পদ্ধতি নিয়ে আস্থাহীনতার কারণে সরকারি স্কুলগুলোর প্রতি আকর্ষণ নেই অভিভাবকদের। বেসরকারি স্কুলে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে বিকল্প হিসেবে তারা বেছে নেন সরকারি স্কুল। অবশ্য এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন সরকারি শিা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা। তাদের বক্তব্য হলো নামিদামি স্কুলে সন্তান লেখাপড়া করলে সামাজিক মর্যাদা বাড়ে এমন ধারণা থেকেই অভিভাবকরা সরকারি স্কুলবিমুখ। আরেক অভিভাবক জানান, সরকারি স্কুলে ঠিকমতো লেখাপড়া হয় না। কাসে শিক থাকে না। শিক্ষক থাকেন কোচিংয়ে। সরকারি বলে ছাত্রছাত্রীদের ফলাফল নিয়ে শিকদের চিন্তা করতে হয় না। তাই বাধ্য হয়েই বেসরকারি ভালো স্কুলে দৌড়াতে হয় তাদের।
রাজধানীর সরকারি ভালো স্কুলগুলোর অন্যতম মতিঝিল বালক উচ্চ বিদ্যালয়। এই স্কুলের একজন শিক আপে করে বলেন, নামিদামি বেসরকারি স্কুলে সন্তান পড়ালেখা করলে অভিভাবকরা গর্বিত বোধ করেন। ফল ভালো হলেও সরকারি স্কুলে আসতে চায় না। যখন কেউ বেসরকারি স্কুলে সুযোগ না পায়, তখন সরকারি স্কুলে আসে। তবে বেসরকারি স্কুলের পাশাপাশি অনেক সরকারি স্কুল বিশেষ করে জেলা সদর এবং রাজধানীর কয়েকটি স্কুলে ভর্তিতেও অনেক প্রতিযোগিতা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব সরকারি বিদ্যালয়ে লেখাপড়া খারাপ হয় এমন অভিযোগ সঠিক নয়। বিগত কয়েকটি প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেসরকারি স্কুলের চেয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফলাফল অনেক ভালো হচ্ছে।
শিাবিদ তরিকুল ইসলাম মজুমদার এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেও থাকবে শিা গ্রহণের সুযোগ, সেটা অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত ব্যয়ে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বাণিজ্যকীকরণ বেড়ে যাচ্ছে। ধনী-গরিবের লেখাপড়ায় বাড়ছে বৈষম্য। অধিকতর শিা ব্যয় বহনে পিছিয়ে যাচ্ছেন মধ্যবিত্ত আয়ের অভিভাবকরা।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ঢাকা মহানগরীতে ৩টি ফিডার শাখাসহ ৩৮টি সরকারি এবং ৪৫৬টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সরকারি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে মাত্র ১ হাজার ৬৮০টি আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। অন্য শ্রেণিতে ১০ হাজার ২৩৭টি ভর্তির আসন রয়েছে। তবে বেসরকারি স্কুলের সঠিক কোনো ভর্তির আসনের পরিসংখ্যান নেই। অভিভাবকদের পছন্দের তালিকায় আছে রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল মডেল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আ. রউফ পাবলিক কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ নুর মোহাম্মদ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, বিএফ শাহীন স্কুল, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, হলিক্রস উচ্চ বালিকা স্কুল ও কলেজ, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, অগ্রণী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট জোসেফ উচ্চ বিদ্যালয়, মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উইলস লিটল ফাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জুনিয়র ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজ, গ্রিনফিল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল ও ডেমরার শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ অন্তত ৪০টি স্কুল।
এই স্কুলগুলোতে সন্তানকে ভর্তি করানোর জন্য অভিভাবকরা রীতিমতো যুদ্ধে নেমে পড়েছেন। ডোনেশনের অঙ্ক ক্রমেই স্ফীত হওয়ায় তাদের উদ্বেগ বাড়ছে। তবুও সন্তানকে মানসম্পন্ন স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। সে জন্য যদি অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করতে হয়, দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়তে হয় তাতেও কোনো অন্যায় দেখছেন না অনেক অভিভাবক!