কলাম

শেখ হাসিনা সৎ মানুষ সৎ জাতি গঠনের প্রতীক

মুহম্মদ শফিকুর রহমান : জাতির পিতার গর্বিত কন্যা; ধর্মাচারে উদার অসাম্প্রদায়িক; যাপিত জীবনে মা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এবং নারী শিা আন্দোলনের পথিকৃৎ নওয়াব ফয়েজুন্নেছা ও বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন; চালচলনে, শালীনতায়, আপাদমস্তক বাঙালি নারী। অর্থ-সম্পদের প্রশ্নে নির্লোভ নিরহঙ্কারী এমনি গুণাবলির অধিকারী সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা। নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য এক জরিপে বিশ্বের সততার মূর্তপ্রতীক পাঁচ শীর্ষ রাষ্ট্রনেতার তালিকায় আপনার নাম অন্তর্ভুক্তি আমাদের গর্বিত করেছে, সম্মানিত করেছে, বিশ্বপরিম-লে বাঙালি জাতিকে সম্মানিত করেছে। আপনি আজ মর্যাদা এবং সৎ নেতৃত্বের যে উদাহরণ সৃষ্টি করলেন তা আমাদের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সৎ মানুষ, সৎ নাগরিক, সর্বোপরি সৎ রাজনীতিক হওয়ার পথ দেখাল। আমরা এবং আমাদের সন্তান আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ, আপনাকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাচ্ছি।
মাননীয় শেখ হাসিনা আমাদের সন্তান তথা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। বলা হতো কিশোর তরুণ-তরুণীদের সামনে অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় কোনো ব্যক্তিত্ব নেই যে, তাঁর বা তাঁদের দিকে তাকিয়ে ছেলেমেয়েরা নিজ নিজ জীবন সাজাবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো তা যে কোনোদিন পূরণ হবে তা ছিল নেহাতই অলীক কল্পনা। শেখ হাসিনা, আপনি সব হারিয়েও ৬ বছর প্রবাস জীবন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে জাতির হাল ধরলেন। জীবনবাজি রেখে বাঙালির সুখ-দুঃখের সঙ্গী হলেন। অসৎ অদেশপ্রেমিক রাজনীতিকের মাঝে সৎ রাজনীতির উদাহরণ সৃষ্টি করলেন। রাষ্ট্রমতায় থেকেও সকল প্রকার লোভের ঊর্ধ্বে ওঠে ‘সবার ওপর মানুষ সত্য, তাহার ওপর নাই’ নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করে চলেছেন। মেধা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শী নেতৃত্বে আজ বাংলাদেশ যে গতিতে এগিয়ে চলেছে তা বিশ্বের বিস্ময়, রোল মডেল।
প্যারাডাইস পেপার্স অব পানামায় ব্রিটেনের রানী কিংবা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনসহ অনেক রাষ্ট্রনেতার নাম ভিন দেশের ব্যাংকে টাকা রাখার তালিকায় যখন উঠে এলো এবং বিশ্বব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হলো, ঠিক তারপরই ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স’ নামের আন্তর্জাতিক সংস্থা তাবৎ রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতার ওপর জরিপ চালাল এবং জরিপের ফলাফলে দেখতে পেল বিশ্বের ৫ শীর্ষ রাষ্ট্রনেতা যাপিত জীবনে রাষ্ট্র পরিচালনায় সততার আলোকিত উদাহরণ সৃষ্টি করে চলেছেন। এই ৫ রাষ্ট্রনেতার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্থান তৃতীয়। নাম্বারিংয়ের মাধ্যমে তাদের অবস্থানও সংস্থাটি নির্ধারণ করে দিয়েছে। পাঁচটি প্রশ্নে মোট ১০০ নম্বরের ওপর ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স’ গবেষণা সংস্থা তাদের গবেষণাকার্য পরিচালনা করে। ৫টি প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে :
১. সরকার/রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে তিনি কি তাঁর রাষ্ট্রের বাইরে কোনো ব্যাংক একাউন্ট করেছেন?
২. মতায় আসীন হওয়ার পর তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ কতটুকু বেড়েছে?
৩. কোনো গোপন সম্পদ গড়েছেন কি না?
৪. সরকার/রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ আছে কি না?
৫. দেশের জনগণ তাঁর সম্পর্কে কী ভাবেন?
এই ৫টি প্রশ্নের উত্তর জানতে ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স’ সংস্থা ১৭৩টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের কর্মকা- গবেষণা এবং বিশ্লেষণ করে। তাদের গবেষণায় যে ৫ জন সবচেয়ে সৎ ও পরিচ্ছন্ন সরকার পরিচালনা করেছেন এবং করছেন তাদের মধ্যে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৯০ পেয়ে প্রথম হয়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর এ্যাঞ্জেলা মার্কেল। ১০০ নম্বরে ৮৮ পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং। ১০০ নম্বরে ৮৭ পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ১০০ নম্বরে ৮৫ পেয়ে চতুর্থ হয়েছেন নওরয়ের প্রধানমন্ত্রী ইরনা সোলবার্গ। ১০০ নম্বরে ৮১ পেয়ে পঞ্চম হয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি।
‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স’-এর গবেষণায় উঠে এসেছে শেখ হাসিনার বাংলাদেশের বাইরে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। সংস্থাটি গবেষণায় দেখেছে বেতন ছাড়া শেখ হাসিনার সম্পদের স্থিতিতে কোনো সংযুক্তি নেই। কোনো গোপন সম্পদও নেই বলে তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে। সর্বোপরি বাংলাদেশের ৭৮ ভাগ মানুষ মনে করে শেখ হাসিনা সৎ এবং সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে।
শেখ হাসিনা যে লোভ-লালসার কত ঊর্ধ্বে তা যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন বা সরাসরি কথা বলেছেন কেবল তারাই ভালোভাবে জানেন। এবার জাতি উপলব্ধি করতে পারবে। বস্তুত সৎ হওয়া বা ব্যক্তিগত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে ওঠার জন্য পারিবারিক ঐতিহ্য, পরিবেশ এবং শিা লাগে, যা শেখ হাসিনা পুরোপুরি পেয়েছেন জন্মসূত্রে। তিনি পিতাকে দেখেছেন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টি জেলে জেলে কাটাতে। রাজপথ ছিল তাঁর বেশি আপন। মাকে দেখেছেন এক সুশীলা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বঙ্গনারী হিসেবে, যিনি সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। স্বামী-সন্তানদেরও একইভাবে মানুষ করেছেন। গোটা পরিবারটিই যেমন ছিল সাদামাটা ধর্মপ্রাণ, তেমনি অসাম্প্রদায়িক মানবিকবোধসম্পন্ন পরিপূর্ণ বাঙালি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই নিজের পরিচয় তুলে ধরেছেনÑ ‘আমি বাঙালি, আমি মুসলমান, আমি মানুষ।’ এই শিা যিনি বা যারা পেয়েছেন তারা অবশ্যই ভাগ্যবান, গর্বিত পিতার গর্বিত সন্তান। বঙ্গবন্ধুর সন্তানরা সেভাবেই নিজেদের গড়ে তুলেছেন। শেখ হাসিনাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাসে এবং গণ-অভ্যুত্থানে ক্যাম্পাসে মিছিল করতে দেখেছি। তিনি ছিলেন আর দশজন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কথাবার্তা, আচার-আচরণ, পোশাক-আশাকে যেমন শালীন, তেমনি অভিজাত। সেই ছোটবেলায়ই তাঁর ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে। রাজনীতিতে এলে বা বাংলাদেশের রাষ্ট্রমতায় এলে তাঁর সেই পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতা তাঁকে বাঙালি জাতি ও সমাজের একজন অত্যন্ত বড় মাপের মানুষে পরিণত করে, যা আমাদের রাষ্ট্র ও জাতিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে।
এখানে একটা ব্যাপার উল্লেখ করা দরকার। পাঁচ সৎ রাষ্ট্রনেতার মধ্যে শেখ হাসিনার জীবন সম্পূর্ণরূপে অন্য রকম। শেখ হাসিনা যেভাবে বাবা-মা-ভাইদের হারিয়ে প্রবাসে শরণার্থী জীবনযাপনে বাধ্য হন এবং সব হারাবার বেদনা বুকে নিয়ে রাজনীতিতে আসেন। তাঁকে হত্যার জন্য যেভাবে গ্রেনেড হামলা থেকে শুরু করে বারবার হামলা চালানো হয়, তেমনটি আর কারও জীবনে ঘটেনি। এখানে শেখ হাসিনা সবার তুলনায় ব্যতিক্রম।
সৎ মানুষই তার জনগোষ্ঠীকে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে নিতে পারে বলে বাংলাদেশ আজ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। এই মুহূর্তে আমাদের জিডিপি ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ; খাদ্যে উদ্বৃত্ত, উৎপাদন ৪ কোটি টন; মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার, গড় আয়ু ৭১ বছর, শিার হার ৭১ শতাংশ; এভাবে উৎপাদন, নগরায়ণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সমতা এখন ১৬ হাজার ২০০ মেগাওয়াট; তথ্যপ্রযুক্তি তথা ডিজিটালাইজেশন উন্নয়নের সাফল্য নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে।
এখানে উল্লেখ করা দরকার, আমেরিকা, ব্রিটেন লুণ্ঠিত ধন ও অঢেল জমি পেয়ে বড়লোক। আমেরিকা যেমন আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশ লুণ্ঠন করে ধনী হয়েছে, ব্রিটেনও তেমনি জলদস্যুতা এবং এশিয়া-আফ্রিকা লুণ্ঠন করে ধনী হয়েছে। পান্তরে বাংলাদেশ লুণ্ঠিত হয়েছে। তারপরও এখন ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উদাহরণ সৃষ্টি করে চলেছে। এটাই শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রজ্ঞা।
বিশ্বব্যাংকের মিথ্যা অজুহাত এবং রক্তচু উপো করে নিজস্ব অর্থে দেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্প পদ্মাসেতু নির্মাণ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অদম্য শক্তিকে তুলে ধরেছে। আর তাঁর এই সাহসী দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়কোচিত ব্যক্তিত্ব বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে। ১৯৭৮ সাল থেকে কক্সবাজারে এসে বসবাসরত ৪ লাখ রোহিঙ্গার ওপর গত ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ৭ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ তাঁকে এতটুকু বিচলিত করেনি। বরং কেউ কেউ যখন বলছিলেন এভাবে ঢুকতে দেয়া কি ঠিক হচ্ছে? জবাবে তিনি মিয়ানমার আর্মির গণহত্যা থেকে বাঁচতে হাজার হাজার রোহিঙ্গার কক্সবাজার সীমান্তের দিকে নাফ নদী বা বঙ্গোপসাগরে নৌকা-ভেলায় ভাসমান নারী, শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলেছিলেন ‘ঞযবু ধৎব ধষংড় যঁসধহ নবরহম প্রয়োজনে খাবার ভাগ করে খাব।’ মানবিকতার এই দৃষ্টান্ত কেবল বাংলাদেশের রাষ্ট্রনেতা শেখ হাসিনাই দেখালেন। তাই তো বিশ্ব তাঁকে আজ গড়ঃযবৎ ড়ভ যঁসধহরঃু বা মানবতার জননী কিংবা ঝঃধৎ ড়ভ ঃযব বধংঃ বা প্রাচ্যের উজ্জ্বল তারকা অভিধায় অভিহিত করেছে এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
আজকের নিবন্ধে দেশের কারও সঙ্গে আমি শেখ হাসিনার তুলনা করছি না। তুলনীয় কেউ নেই বলে প্রয়োজনও নেই। আগেই শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সেরেস পুরস্কার, চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ প্রভৃতি আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, তেমনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকার বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়, ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়, সুইজারল্যান্ডের ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ ডজনেরও অধিক বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিতে ভূষিত করেছে। তাঁর নেতৃত্বেই আমাদের ২১ ফেব্র“য়ারি আজ জাতিসংঘভুক্ত দেশগুলোর মাতৃভাষা দিবস। এই তো সেদিন জাতিসংঘ শিা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা টঘঊঝঈঙ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে আন্তর্জাতিক প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রেজিস্ট্রিভুক্ত করেছে। যারা এতদিন বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে নানান কথা বলেছেন ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি তাদের প্রতি চপেটাঘাত।
আমাদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমাদের সৎ, যোগ্য, সাহসী, মেধাবী, দূরদর্শী রাষ্ট্রনেতা আছেন, সর্বোপরি মানবিকতায় চ্যাম্পিয়ন শেখ হাসিনা আছেন। এরপরও যারা ভবিষ্যতে সম্ভাবনা দেখেন না সেই অভাগাদের সামনে এবার এগোবার মহাসড়ক নির্মাণ করে দিলেন শেখ হাসিনা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি
জাতীয় প্রেসকাব