সরকারের যে নীতি ও কর্মপরিকল্পনার কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.২৮ শতাংশ মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬১০ ডলার ছাড়ালো

| November 27, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : বর্তমান সরকারের গৃহীত নানামুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নীতি বাস্তবায়নের কারণে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধির েেত্র বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে জাতিসংঘ প্রণীত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বা এমডিজির প্রায় সবগুলো সূচকে বাংলাদেশ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভালো করেছে। এ জন্য জাতিসংঘ বাংলাদেশকে এমডিজি অর্জনের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমডিজির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এখন জাতিসংঘ প্রণীত সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল বা এসডিজি বাস্তবায়ন করছে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নেও অন্যান্য দেশের কাছে ইতোমধ্যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এমডিজি ও এসডিজির ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর। অর্থনৈতিকভাবে বৈশ্বিক মন্দাবস্থা চললেও বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙাই রয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা থাকার পেছনে গ্রামের মানুষের হাতে উৎপাদনশীল ও অনুৎপাদনশীল কাজ থাকাটা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বিদেশে গিয়ে যে ব্যক্তি দৈনিক ১ হাজার টাকা উপার্জন করলেই খুশি থাকতেন, সে ব্যক্তি এখন দেশের কোনো অজপাড়াগাঁয় বসেই দৈনিক ১ হাজার টাকা উপার্জন করছেন। গ্রামে উপার্জনের বিভিন্ন খাত তৈরি হয়েছে। সেই সব খাতকে অবলম্বন করে কেউ ব্যবসা করছেন, কেউ শ্রম দিচ্ছেন। এর একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয়ের ওপর। প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের মানুষকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় শেখ হাসিনা বলেন, এটি অর্জন সম্ভব হয়েছে দেশের সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের যার যার অবস্থান থেকে অবদান রাখার কারণে। তাই সকলে মিলে কাজ করে গেলে আমরা কাক্সিক্ষত ল্েয পৌঁছতে পারব।
চূড়ান্ত হিসাবে গত অর্থবছরে (২০১৬-১৭) জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে প্রাথমিক হিসাবে প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ প্রাক্কলিত প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। পরপর দুই বছর ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের নজিরও সাম্প্রতিক বিশ্বে বিরল। অন্যদিকে প্রাক্কলিত হিসাব থেকে ৮ ডলার বেড়ে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। প্রাক্কলিত হিসাব ছিল ১ হাজার ৬০২ ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৪৬৫ ডলার। এ হিসাবে এক বছরে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৪৫ ডলার। বর্তমানে জিডিপির আকার ২৪৯ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। জিডিপির আকার ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে স্বাধীনতার পর ৩৮ বছর লেগেছিল। আর গত ৮ বছরে জিডিপিতে যোগ হয়েছে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয়ের এই হিসাব দিয়েছে।
প্রবৃদ্ধি নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল বলেন, এক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ-সংশয় থাকা উচিত নয়। আমরা গত ৫ বছরে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছি। ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির কাজও দ্রুত গতিতে এগুচ্ছে। কাজ শেষ হলে কেবল এসব অঞ্চলে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। আর এসবই দৃশ্যমান বাস্তবতা।
উল্লেখ্য, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৭ বছরে সারাবিশ্বে গড়ে জিডিপিতে ৬ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে মাত্র ১৭টি দেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ঘর (৭ দশমিক ১১) অতিক্রম করে। এর আগে প্রায় এক দশক দেশের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বৃত্তে আটকে ছিল। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার অন্যতম ল্য অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সামষ্টিক অর্থনীতির অগ্রযাত্রা তারই বড় প্রমাণ। স্বাধীনতার পর ২০০৫-০৬ অর্থবছর পর্যন্ত মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৫৪৩ ডলার। এরপর গত এক দশকে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ডলারেরও বেশি বেড়েছে। এর মধ্যে বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৩১৬ মার্কিন ডলার। এর আগের দুই অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ১৮৪ ডলার এবং ১ হাজার ৫৪ ডলার। দেশ যে দ্রুত উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এটি তারই লণ।
চূড়ান্ত হিসাবে জিডিপিতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রথমবারের মতো ৩০ শতাংশ অতিক্রম করেছে। এ বিষয়টিকে দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ঘটনা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, ভারতসহ আরও কয়েকটি দেশে জিডিপিতে বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক আগেই ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের ঘরে পৌঁছেছে। আমরাও সেদিকে এগোচ্ছি। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ছে, যা প্রত্য ও পরোভাবে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করছে। উল্লেখ্য, জিডিপিতে এবার মোট বিনিয়োগের ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ বেসরকারি খাতের, বাকি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ সরকারি বিনিয়োগ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জিডিপিতে বিনিয়োগের মোট পরিমাণ ছিল ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল ২২ দশমিক ৯৯ শতাংশ আর সরকারি বিনিয়োগ ছিল ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
বিবিএস জানিয়েছে, গতবারের মতো এবারও সেবা এবং শিল্প খাতের ওপর ভর করে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ২২ শতাংশ। সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। চূড়ান্ত হিসাব মতে, এখন বাংলাদেশের জিডিপির আকার ২৪৯ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫-১৬ বছরে জিডিপির আকার ছিল ২২১ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে ১ বছরে জিডিপির আকার আর্থিক মূল্যে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ যে সমস্ত নীতি ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে জাতিসংঘ প্রণীত এসডিজির বিভিন্ন সূচক বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন, তাতে আশা করা যায় ২০২১ সালের আগেই বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ঘর স্পর্শ করবে এবং মাথাপিছু জাতীয় আয়ও ২ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

Category: প্রতিবেদন

About admin: View author profile.

Comments are closed.