সারাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণের স্বীকৃতি উদযাপন

| November 27, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে জাতিসংঘের শিা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ায় দেশব্যাপী সরকারিভাবে ২৬ নভেম্বর আনন্দ শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ শামিল হন এই আনন্দ শোভাযাত্রায়। এ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সকল জেলা, উপজেলা পর্যায়ে, বিদেশে বাংলাদেশের সব মিশনে আনন্দ শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আনন্দ শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণও প্রদান করেন।
২৬ নভেম্বর জয়বাংলা স্লোগানে-স্লোগানে প্রকম্পিত হয় ঢাকার রাজপথ। দুপুর ১২টার পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে শোভাযাত্রা নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করে হাজারো মানুষ। এ সময় তাদের প্রত্যেকের কণ্ঠে বাজনার তালে তালে ছিল জয়বাংলা স্লোগান। আর মূল শোভাযাত্রাটি ধানমন্ডি বঙ্গবন্ধু জাদুঘর থেকে শুরু হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসে শেষ হয়। বেলা দেড়টার দিকে প্রেসকাব, মৎস্য ভবন, শাহবাগ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মূল অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মূল অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ হবে জাতির পিতার সোনার বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এই দেশ গড়ে তুলবো। বাংলাদেশ বিজয়ী জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। যে ভাষণ জাতির পিতা দিয়েছিলেন, সেই ভাষণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্থান করে নিয়েছে। যারা এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান দেশকে পুনরায় গড়ে তুলেছিলেন। সাড়ে তিন বছরে যখনই বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে দাঁড়িয়েছিল তখন তাকে হত্যা করে দেশকে অন্ধকারে ঢেকে দিয়েছিল নর পিশাচরা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আড়াই হাজার বছরে সব ভাষণের মধ্যে এই ভাষণটি স্থান পায়। ইতিহাসকে কেউ মুছে ফেলতে পারে না। জাতির পিতার হাতে কোনো নোট ছিল না। কিছুই ছিল না। তাকে বারবার ফাঁসির মঞ্চে নেয়া হয়েছিল। মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছিল। তারপরও আন্তর্জাতিক চাপে বাধ্য হয়ে পাকিস্তান শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
এর আগে দুপুর ১২টায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণের মধ্য দিয়ে এ কর্মসূচি শুরু হয়। পরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিশু-কিশোর, ক্রীড়া সংগঠন ও খ্যাতিমান ক্রীড়াবিদ, সাংস্কৃতিককর্মী ও সংগঠক, শিল্পকলা একাডেমি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, এনজিও, স্কাউটস ও রোভার, পুলিশের সুসজ্জিত ঘোড়া, পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপি এবং শিা প্রতিষ্ঠানের সুসজ্জিত বাদক দল, সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়ি এবং সর্বস্তরের জনতার অংশগ্রহণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উদ্দেশে আনন্দ শোভাযাত্রা শুরু হয়। শোভাযাত্রাটি রাসেল স্কয়ার, কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, এলিফ্যান্ট রোড, শাহবাগ হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসে সমবেত হয়।
এর আগে এ আনন্দ শোভাযাত্রায় সব সরকারি চাকরিজীবীকে অংশ নেয়ার নির্দেশ দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এ সংক্রান্ত নির্দেশনা সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও বিভাগীয় কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়। নির্দেশনায় বলা হয়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর ‘ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার’ এ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের’ স্বীকৃতি লাভ করায় ২৫ নভেম্বর ঢাকা মহানগরীসহ সব জেলা ও উপজেলায় আনন্দ শোভাযাত্রা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচিটি যথাযথভাবে উদযাপনের জন্য মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের ঢাকায় অবস্থানরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠেয় কর্মসূচিতে এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
২৪ নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদ সভাকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম আনন্দ শোভাযাত্রার বিস্তারিত কর্মসূচি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইউনেস্কো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর হয়েছে। এ গৌরবময় অর্জনকে উৎসবমুখর ও বর্ণাঢ্য আয়োজনের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উদযাপনের ল্েয এসব কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
ঢাকার মতোই অনুরূপ কর্মসূচির আয়োজন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে সারা দেশেও। জেলা, উপজেলা পর্যায়ে সকাল দশটায় এসব কর্মসূচি শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা করে উপজেলায় এসে সমবেত হয়। জেলাতেও বিভিন্ন এলাকা থেকে শোভাযাত্রা করে জেলার নির্ধারিত স্থানে সমবেত হয়। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনসমূহেও অনুরূপ কর্মসূচির উদযাপন করা হয়। আনন্দ শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে বাংলাদেশি কমিউনিটির লোকজন সম্পৃক্ত হয়।
ইউনেস্কো মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা প্যারিসের ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে গত ২৯ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। ইউনেস্কো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐতিহ্যের তালিকা সংরণ করে থাকে। মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারের অন্তর্ভুক্ত প্রামাণ্য ঐতিহ্যের তালিকা বিশ্ব প্রোপটে গুরুত্ববহ। ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারের ল্য হচ্ছে বিশ্বের প্রামাণ্য ঐতিহ্য সংরণ করা এবং বিশ্ববাসী যাতে ঐতিহ্য সম্পর্কে সহজে জানতে পারে তা নিশ্চিত করা।
উল্লেখ্য, ঐতিহাসিক ৭ মার্চ বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্বর্ণারে লেখা অবিস্মরণীয় গৌরবের এক অনন্য দিন। সুদীর্ঘকালের আপসহীন আন্দোলনে বিস্ফোরণোন্মুখ একাত্তরের এই দিনে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক উত্তাল জনসমুদ্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বঙ্গবন্ধুর এই তেজোদীপ্ত ঘোষণাই ছিল প্রকৃতপে আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি।

Category: প্রতিবেদন

About admin: View author profile.

Comments are closed.