রাজনীতি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : জমজমাট ভোটের লড়াইয়ে প্রস্তুত ইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ততই উত্তেজনা বিরাজ করছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, তার দল আগাম নির্বাচনের জন্যও প্রস্তুত। ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদা বলেছেন, সরকার চাইলে আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রস্তুত রয়েছে। এর বিপরীতে অন্যতম বিরোধী দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, যেকোনো সময়েই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত বিএনপি; তবে সে নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে।
আগাম নির্বাচন নিয়ে যখন রাজনৈতিক আলোচনা তুঙ্গে তখন কম্বোডিয়া সফর শেষে দেশে ফিরে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় আগাম নির্বাচন হতেই পারে; যেটা হয়েছে ব্রিটেনে। কিন্তু বাংলাদেশে এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি যে, আগাম নির্বাচন দিতে হবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যথাসময়েই হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এমন বিবৃতির পর আগাম নির্বাচনের আশা চুপসে যায়। তবে ২০১৮ সালের শেষভাগেই যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সে বিষয়টিও নিশ্চিত হয়ে যায়। এখন ওই নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগের কোন ৩০০ নেতা মনোনয়ন পাবেন এবং বিএনপির কোন ৩০০ নেতা মনোনয়ন পাবেনÑ সে বিষয়ে উভয় দলেই চলছে নিবিড় পর্যবেক্ষণ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই ৩০০ সংসদীয় আসনের প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য বিভিন্ন পন্থা গ্রহণ করেছে। উভয় দলই প্রার্থীদের খোঁজ-খবর নিতে গোপনীয় দল গঠন করেছে। এসব গোপনীয় দল সশরীরে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় এলাকায় গিয়ে নেতাদের কার অবস্থান কেমন তা পর্যক্ষেণ করে সাধারণ সম্পাদক ও মহাসচিবের কাছে রিপোর্ট দিচ্ছেন। আবার কেন্দ্রীয়ভাবেও বড় দুটি দল পেশাদার প্রতিষ্ঠান দিয়ে জরিপ কার্যক্রম চালাচ্ছে। দলীয় অবস্থান কেমন, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা কেমন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠন করতে পারবে কি না, নির্বাচনে অংশ নেয়া ঠিক হবে কীনা, নির্বাচনে অংশ নিলে কী হবে, না নিলে কী হবেÑ ইত্যাকার বিষয় নিয়ে জরিপ কার্যক্রম বেশ জোরেশোরেই চলছে। আর এসব নিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের লড়াই ১ বছর বাকি থাকতেই বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছে।
ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কোন আসনে কোন নেতাকে মনোনয়ন দিবে, তা নিয়ে কিছুটা অস্বস্তিতে আছে। প্রতিটি সংসদীয় আসনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী গড়ে কমপক্ষে ৫ জন। এদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকায় নিজেকে নৌকার প্রার্থী হিসেবে জাহির করছেন। বলে বেড়াচ্ছেন, কেন্দ্র থেকে তাকে সবুজ সংকেত দেয়া হয়েছে যে তিনিই নৌকার প্রার্থী। এ নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় কোন্দল এখনও মাথাচাড়া দিয়ে না উঠলেও দিন যত যাবে, কোন্দল তত বাড়তে থাকবে বলে অনেকের ধারণা।
আওয়ামী লীগের এই অভ্যন্তরীণ বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত দলের নীতি-নির্ধারকরাও। কাকে রেখে কাকে মনোনয়ন দিবেন, তা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সরকারি কাজের পাশাপাশি সাংগঠনিক সফরেও তিনি জেলায় জেলায় যাচ্ছেন। জেলা সফরে গিয়ে নেতাদের সাইনবোর্ড-বিলবোর্ড এর বহর দেখে ওবায়দুল কাদের অবাকই হচ্ছেন। সব নেতাই মনোনয়ন প্রত্যাশা করে এলাকা ছেয়ে ফেলেছেন সাইনবোর্ড আর বিলবোর্ডে। সে তুলনায় সরকার যে গত ৯ বছর ধরে উন্নয়ন কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে, তার কোনো প্রচারণাই নেই। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। সবাই মনোনয়ন পেতে উদগ্রীব। এসব দেখেশুনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, সাইনবোর্ড আর বিলবোর্ডে নিজের ছবি প্রদর্শন করে মনোনয়ন পাওয়া যাবে না। মনোনয়ন পেতে হলে জনগণের কাছে যেতে হবে, তাদের কথা শুনতে হবে।
কিন্তু কে শোনে কার কথা। দেশজুড়েই আওয়ামী লীগ নেতাদের সাইনবোর্ড আর বিলবোর্ড। অনেকটা প্রতিযোগিতা করেই এসব সাইনবোর্ড লাগানো হচ্ছে। প্রতিটি সংসদীয় আসনেই নৌকার ভোট ৪/৫ ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এর সুবিধা নিচ্ছে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা আসন ধরে ধরে একক প্রার্থী নির্ধারণ করে সাইনবোর্ডহীন নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছেন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগের উপরোক্ত অবস্থার বিপরীতে বিএনপির প্রার্থীরা আছেন অন্য রকম অস্বস্তিতে। বিএনপির তৃণমূলের কোনো নেতাই নিশ্চিত নন, বিএনপি আদৌ নির্বাচনে যাবে কীনা? বিএনপির এমপি প্রার্থীরা একাধিক ছক কষে এগোচ্ছেন। শেখ হাসিনার অধীনেই যদি বিএনপি নির্বাচনে যায়, তাহলে হিসাব একরকম, আর যদি না যায়, তাহলে অন্য রকম। খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারলে তাদের প্রার্থী থাকবে একরকম। খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে না পারলে তাদের প্রার্থী থাকবে আরেক রকম। তবে যে বিষয়টি নিশ্চিত সেটি হলো, প্রতিটি সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী থাকলেও বেশির ভাগ আসনেই বিএনপির প্রার্থী কিন্তু এক জন। এটি একটি বড় ধরনের সুবিধা। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিএনপির এমপি প্রার্থীরা নীরবে নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর বিপরীতে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থীরা সাইনবোর্ড-বিলবোর্ড টানিয়ে সরব নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আওয়ামী লীগের সরব প্রচারণা আর বিএনপির নিরব প্রচারণা বেশ ভালোই উপভোগ করছেন সাধারণ ভোটাররা। শীত যতই বাড়ছে, ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তাপও ততই বাড়ছে। গ্রামবাংলার চায়ের কাপে এরই মধ্যে নির্বাচনি ঝড় উঠে গেছে। বিপিএল শেষ হওয়ার পর চা স্টলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এমপি প্রার্থীরা। কাকে মনোনয়ন দিলে আওয়ামী লীগ ভালো করবে, কাকে মনোনয়ন দেয়া ঠিক হবে না, তা খোলামেলা জানিয়ে দিচ্ছেন সাধারণ ভোটাররা। বিএনপির কাকে মনোনয়ন দেয়া উচিত, কাকে নয়Ñ সে আলোচনাও সমানে চলছে। আরেকটি আলোচনাও চলছে গ্রামবাংলায়। সেটি হলো, বর্তমান সিইসি সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন করতে পারবেন কি না?
সাধারণ মানুষের কথা হলো, সব দল নির্বাচনে এলে ভোটকেন্দ্রের প্রতি সব দলেরই নজর থাকবে। এতে নির্বাচনে কারচুপি হবে না। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হলে আগে সব দলকে নির্বাচনে আনতে হবে। ইসি যদি এই কাজটি করতে না পারে, তাহলে নির্বাচন যতই সুষ্ঠু হোক, নির্বাচন কমিশন এতে কোনো বাহবা পাবে না।