প্রতিবেদন

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সুসংবাদ : চলতি বছর প্রায় ১০ লাখ কর্মী চাকরি নিয়ে বিদেশ গেছেন

নিজস্ব প্রতিবেদক : চলতি বছর রেকর্ড সংখ্যক কর্মী চাকরি নিয়ে বিদেশ গেছেন। ২০১৬ সালের তুলনায় এ সংখ্যা ২৮ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কর্মী নিয়োগ পেয়েছেন সৌদি আরবে। এর পরেই জর্দান ও ওমানের স্থান। তবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে শ্রমবাজারে কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমরা ওই সব দেশের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করি অল্প দিনের মধ্যে বাজারগুলো ঠিক হয়ে যাবে। অবশ্য সমস্যার কারণও রয়েছে। তেল প্রধান দেশগুলোতে তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় কর্মী নিয়োগও কমিয়ে দিয়েছে তারা। তেলের দাম একটু ভালো হলেই বাজারগুলো আবার চাঙ্গা হবে। ১২ ডিসেম্বর ইস্কাটনে প্রবাসী কল্যাণ ভবনে রিপোর্টার্স ফর বাংলাদেশি মাইগ্রেন্টস (আরবিএম) আয়োজিত ‘মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান শ্রমবাজার’ শীর্ষক মিট দ্য প্রেসে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি এসব কথা বলেন।
অভিবাসন বিষয়ক রিপোর্টারদের সংগঠন রিপোর্টার্স ফর বাংলাদেশি মাইগ্রেন্টসের (আরবিএম) সভাপতি ফিরোজ মান্নার সভাপতিত্বে আয়োজিত মিট দ্য প্রেসে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নমিতা হালদার, অতিরিক্ত সচিব আমিনুল ইসলাম, বিএমইটির মহাপরিচালক সেলিম রেজা, বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মরণ কুমার চক্রবর্তী প্রমুখ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আরবিএম’র সাধারণ সম্পাদক মাসউদুল হক।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, বাংলাদেশের জন্য অভিবাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ দেশের মানুষই দেশের সম্পদ। তারা বিশ্বের ১৬৫টি দেশে শ্রম ঘাম দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে দেশে পাঠাচ্ছেন। তাদের টাকায় দেশের অর্থনীতি প্রতিনিয়ত সুসংহত হচ্ছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এদেশের নাগরিকদের অভিবাসনের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়।
তারই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনায় আমরা অভিবাসন খাতকে দেশের অন্যতম প্রধান খাতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। এ বছরের জানুয়ারি থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মোট ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৩৫৪ জন কর্মী চাকরি নিয়ে গেছেন। এ যাবৎ কালের মধ্যে এবারই প্রথম সর্বোচ্চসংখ্যক কর্মী চাকরি নিয়ে বিদেশ গেলেন। ডিসেম্বরের বাকি সময়ে আরও প্রায় ১০ থেকে ২০ হাজার কর্মী বিদেশে চাকরি নিয়ে যাবেন। নভেম্বরে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। সৌদি আরবে এ বছর ৫ লাখ ১৩ হাজার ৮৬২ জনের কর্মীর কর্মসংস্থান হয়। এর পরেই ওমানের স্থান। দেশটিতে ৮৩ হাজার ১৬ জন, কাতারে ৭৭ হাজার ১৪৫ জন এবং কুয়েতে ৪৬ হাজার ১৭৪ জন চাকরি পেয়েছেন।
মন্ত্রী বলেন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতকে সরকার ‘থ্রাস্ট সেক্টর’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ খাতের গুরুত্ব অপরিসীম বিবেচনায় সরকার বিদ্যমান শ্রমবাজারকে ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টির ওপর জোর দিয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা জাপানে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন কর্মী প্রেরণ করেছি। বিদেশে কর্মসংস্থানের বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখার জন্য বিদ্যমান শ্রমবাজার ধরে রাখাসহ আমরা নতুন নতুন সম্ভাবনাময় শ্রম বাজার অনুসন্ধান করছি। নতুন শ্রমবাজারের সন্ধানে ৫২টি দেশের শ্রমবাজার নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম সমাপ্তির পথে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী বিদেশগামী বাংলাদেশী কর্মীদের শতভাগ বীমার আওতায় আনা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে। আমরা এ বছরের ১১ জুন ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০১৭’ গেজেট প্রকাশ করেছি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রীর এসব তথ্য প্রদানের পাশাপাশি জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিণ ব্যুরো (বিএমইটি) জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ৯৫ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক বিভিন্ন দেশে কাজ নিয়ে গেছেন। তবে কতজন শ্রমিক ফেরত এসেছেন আর বর্তমানে কতজন বিদেশে অবস্থান করছেন, সে হিসাব কোনো সংস্থার কাছেই নেই। এ তথ্য না থাকায় একদিকে অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের মাথাপিছু অবদান নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না, অন্যদিকে অব্যবহৃত থাকছে দেশে ফেরত আসা শ্রমিকদের অর্জিত দতাও।
প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকাংশই অদ হিসেবে বিদেশে যান। সেখানে গিয়ে তারা অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন কাজে দতা অর্জন করেন। প্রতি বছর প্রচুর সংখ্যক শ্রমিক দেশে ফিরে আসেন দ হয়ে। কিন্তু বিএমইটির কাছে ফেরত আসা শ্রমিকের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছেও নেই এ তথ্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশি অদ শ্রমিকরা বিদেশে গিয়ে দতা অর্জন করে ফিরে আসে। এ দ জনগোষ্ঠীর চাহিদা রয়েছে দেশে ও দেশের বাইরে। তথ্য না থাকায় এ দতা পুনরায় সঠিক ব্যবহার সম্ভব হয় না। দ শ্রমিকদের সংখ্যা ও কোন কোন েেত্র তারা দ, তা জানা থাকলে দেশে ও দেশের বাইরে তা কাজে লাগানো সম্ভব হতো। বিদেশ থেকে দ শ্রমিকের চাহিদা অনুযায়ী তথ্যভা-ার থেকে শ্রমিক রপ্তানিও করা যেত।
বিএমইটির তথ্যানুসারে, ১৯৭৬ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১ কোটি ৫ লাখ ৭০ হাজার ১১২ জন শ্রমিক মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চাকরি নিয়ে গেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবে ৩৬ লাখ ৭৭ হাজার ৪৩৬, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৩ লাখ ৪৯ হাজার ৬৭২, কুয়েতে ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৬১২, ওমানে ১০ লাখ ৪৬ হাজার ৫১, কাতারে ৪ লাখ ৪৯ হাজার ২৫, বাহরাইনে ৩ লাখ ১৫ হাজার ১২৪, ইরাকে ৩৬ হাজার ৭৯৫, লেবাননে ১ লাখ ২৯ হাজার ৩৪২ ও জর্ডানে ১ লাখ ৩ হাজার ২৭০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক হিসেবে গেছেন। এছাড়া আফ্রিকার লিবিয়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ১২৫, সুদানে ৮ হাজার ৫১২, মিশরে ২১ হাজার ৮৯০ ও মরিশাসে ৪৩ হাজার ৯৮৪ জন বাংলাদেশি গেছেন শ্রমিক হয়ে। ইউরোপের যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার ৭০ ও ইতালি গেছেন ৫৫ হাজার ৫১৪ বাংলাদেশি শ্রমিক।
এশিয়ার অন্যান্য দেশের মধ্যে মালয়েশিয়ায় ৭ লাখ ১০ হাজার ১৮৮, সিঙ্গাপুরে ৫ লাখ ৮৫ হাজার ২৩৯, দণি কোরিয়ায় ৩৩ হাজার ১১৫, জাপানে ১ হাজার ৩৬৬ ও ব্র“নাইয়ে ৫১ হাজার ৩৪ এবং অন্যান্য দেশে ১ লাখ ১০ হাজার ২০৩ জন বাংলাদেশি বিভিন্ন কাজ নিয়ে গেছেন। তবে কোন দেশে কতজন অবস্থান করছেন, তার সঠিক কোনো তথ্য নেই সরকারের কোনো সংস্থার কাছেই।