চলো আমরা আকাশ ছুঁই

| December 18, 2017

অরুণ কুমার বিশ্বাস : চীনের মহা প্রাচীরের সামনে দাঁড়িয়ে বিপন্ন বিস্ময়ে ভাবি, এই বিশাল প্রাচীর ওরা কী করে বানালো! কেনই বা! যিশু খ্রিস্টের জন্মেরও আড়াইশ বছর আগে সম্রাট কিন শি হুয়াং যার দৈহিক উচ্চতা ছিল চার ফুটের একটু বেশি, তিনিই কি না যাযাবর শত্রুর হাত থেকে তার দেশকে বাঁচাবার জন্য বিপুল এই কর্মযজ্ঞে হাত দিয়ে বসলেন! অর্থাৎ সম্রাট কিন শি’র দেহের উচ্চতা যাই হোক না কেন, তিনি ছিলেন একজন সাহসী স্বপ্নবাজ মানুষ। শি জানতেন তিনি পারবেন শত্রুর হাত থেকে সমন্বিত চীনকে মুক্ত রাখতে। তাই স্রেফ কাদামাটি আর পাথরের টুকরো দিয়ে বানিয়ে ফেললেন তার প্রাণের ‘ওয়ান লি চ্যাং চেং’ অর্থাৎ দশ হাজার মাইল দীর্ঘ এক প্রাচীর, যা কিনা চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকেও দেখা যায় বলে অনেকের ধারণা। চীনের প্রাচীর চাঁদ থেকে দৃষ্টিগোচর হোক বা না-হোক, তাতে কিচ্ছু এসে যায় না। কিন শি নামের সেই সাড়ে চার ফুট মানুষটির সাহস ও প্রজ্ঞা আমাদের স্বাপ্নিক হতে শেখায়। আমরা সমানের দিকে এগিয়ে যাবার দিশা খুঁজে পাই।
শুধু চীনের প্রাচীরের কথাই বা বলি কেন, আমাদের সামনে রয়েছে আরো গৌরবোজ্জ্বল এক দৃষ্টান্ত, আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন। একজন বলিষ্ঠ নেতা, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নও কিছু কম দুঃসহসী নয়! পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে একটি স্বাধীন স্বদেশ গড়ার লক্ষ্যে একাত্তরের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তিনি যে উদাত্ত আহ্বান জানালেন, বিশে^র ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ মার্চের ভাষণ আজ স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকার যে বলিষ্ঠ আহ্বান তিনি জানালেন, সেখানে শুধু দেশপ্রেম নয়, ভাষণের প্রতিটি বর্ণে, প্রতিটি শব্দে মিশে ছিল এক দুর্নিবার প্রত্যয়, মননের গভীর থেকে উঠে আসা প্রতীতি ও দেশের মানুষের প্রতি একবুক নিঃশর্ত ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধু নিশ্চিত জানতেন তিনি পারবেন। পারতে তাকে হবেই। দুশ বছরের ইংরেজ শাসন আর চব্বিশ বছরের বেশি সময় ধরে পাক সরকারের নিষ্ঠুর শাসনের রাজত্ব তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাঁর অকুতোভয় নেতৃত্ব আর আকাশচুম্বী স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন আমাদের আজকের বাংলাদেশ।
শিক্ষাই একমাত্র শাণিত অস্ত্র যা দিয়ে তুমি সারা বিশ^কে বদলে দিতে পারো। এটি আমার কথা নয়, বলেছেন মহামতি নেলসন ম্যান্ডেলা। তার পুরো নাম নেলসন রোহিলালা ম্যান্ডেলা। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক, অবশ্য তাকে বিশ^জনীন ব্যক্তিত্ব বললেও কিছু ভুল বলা হয় না। বর্ণবাদের চরম বিরোধী এই মহান নেতা বিশ^াস করতেন, জ্ঞাতিত্ব বলে যে সম্পর্ক তা কেবল মানুষে মানুষেই হয়, অন্য প্রাণিকুলের মাঝে এই বোধ খুব সীমিত। আমি তাকে বিশেষভাবে শ্রদ্ধা করি এই জন্য যে, তিনি একজন জীবনঘনিষ্ঠ মানুষ ছিলেন। তিনি মানুষের মাঝে যে মানবতা বিরাজমান, তাকে শ্রদ্ধা করতেন। ম্যান্ডেলার ভাষায়, নিছক সাফল্য দিয়ে আমাকে বিচার করো না, বরং আমি কত বার ব্যর্থ হয়েছি কিন্তু আবারও উঠে দাঁড়িয়েছি সেই হিসেবটা দয়া করে করো। তাহলেই বুঝবে আমি কতটা সংগ্রামমুখর, আমার স্বপ্নবাজ মন আকাশের কত কাছাকাছি অবস্থান করছে!
নেলসন ম্যান্ডেলা ‘রেইনবো ন্যাশন্স’ এর কথা বলেছেন। রঙধনুর যেমন সাতটা রঙ আছে, তাতে আমাদের চোখ ধাঁধায় না বরং দৃষ্টিতে স্নিগ্ধতা আনে, ঠিক তেমনি মানুষের বাহ্যিক রঙে বা বর্ণে বৈচিত্র্য থাকা স্বাভাবিক। বস্তুত, কাননে বহুবিধ কুসুম ফুটলেই তা দেখায় ভালো। শুধুই গোলাপ কিংবা গাঁদা বড্ড একপেশে সৌন্দর্য। আমরা গ্লোবাল ভিলেজের কথা বলি, পারস্পরিক নৈকট্যের কথা বলি, অথচ আমরা এখনও বর্ণবাদের সে সংকীর্ণ গ-ি তার বাইরে আসতে পারিনি। তাই আমি মনে করি, নেলসন ম্যান্ডেলার ‘রঙধনু জাতিতত্ত্ব’ এখন অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ।
সত্যিই তাই। খুব সহজ করে বললে মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। ভারতের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এপিজে আব্দুল কালাম যেমনটি বলেছেন, আমরা ঘুমের ঘোরে যা দেখি ওটা স্বপ্ন নয় বরং স্বপ্ন তাই যা আমাদের ঘুমোতে দেয় না। অর্থাৎ সামনে এগোবার জন্য স্বপ্ন থাকা চাই অটুট, মনোবল আর প্রচেষ্টা দিয়ে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। আর সাফল্যের কোনো শর্টকাট হয় না, নিজের চেষ্টা ও অধ্যবসায় দিয়ে ওটা অর্জন করতে হয়। সাফল্যকে আপন করে নিতে হয়।
তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকের জীবনে বৃষ্টি ও রোদ্দুর দুটো দিক আছে। বেহালার ছড়ের মতোন শুধু যদি হতাশার চাষাবাদ করি তাতে হতাশাই বাড়ে, স্বস্তি আসে না। বারট্রান্ড রাসেলের একটি উক্তি এখানে খুব প্রসঙ্গিক বলে মনে হয়। তিনি তার ‘কনকোয়েস্ট অফ হ্যাপিনেস’ বইয়ে লিখেছেন, সাফল্য বস্তুটি বড়ই আপেক্ষিক। অর্থ-বিত্ত বা স্থূল সুখানুভূতি দিয়ে সাফল্যকে বিচার করা যায় না। ওটা প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যাপার। তুমি যাতে সুখী, তোমার বন্ধু তাতে সুখ নাও পেতে পারে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত করেছেন রাসেল। তার মতে, সহজ-সরল জীবন ও উন্নত চিন্তা-ভাবনা মানুষকে সুখী করে।
তবে আমি আপাতত সুখের মতো জটিল কিছু নিয়ে ভাবছি না। আমি ভাবছি আমার তরুণ বন্ধুদের কথা। জীবনে আমরা খুব প্রতিষ্ঠিত হতে চাই। আমরা চাই অনেকের মাঝে একজন না হয়ে শ্রেষ্ঠজন হতে। তাহলে বরং বিল গেটস-এর কথায় আসি। তার একটি কথা আমার খুব মনে ধরেছে। তিনি মনে করেন, বাগানে যেমন নানারঙ ও রকমের ফুল ফোটে, সৌরভে ও সৌন্দর্যে নানারঙ ফুলে যেমন তফাৎ রয়েছে, তেমনি মানুষের মাঝেও বৈচিত্র্য থাকবে। অর্থাৎ অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা করে মিছে কষ্ট পেও না। তুমি তোমার মতো করে বাঁচো। নিজের মতো করে সাফল্যের সংজ্ঞা ঠিক করো। অন্যে কী করলো তাতে তোমার কী এসে যায়! নিজেকে দ্যাখো, নিজেকে সাজাও। ভেতরের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে একটি অর্থপূর্ণ জীবন তৈরি করো। মজা করে গেটস বলেন, হার্ভার্ড বিশ^বিদ্যালয় থেকে ঝরেপড়া ছাত্রদের মাঝে আমিই সম্ভবত সবচে সফল। এবং ওই বিশ^বিদ্যালয়ের একজন মেধাবী প্রকৌশলীকে আমি চাকরি দিতে পেরেছি।
তার মানে চাকরি-বাকরি, সামাজিক অবস্থান বা রুজি-রোজগার দিয়ে জীবনকে ডিফাইন করা যায় না। নিজেকে বরং রিফাইন করতে হয়। জন্মসূত্রে তো কেউ আর হিমালয় ডিঙাতে শেখে না বা রামানুজান হয় না। মার্টিন লুথার কিংয়ের মতো বিশাল-হৃদয় নেতা হতে গেলেও চাই পূর্ব-প্রস্তুতি, মানুষের কাছাকাছি যেতে না পারলে কি নেতা হওয়া যায়!
জীবন আর জীবিকাকে এক করে দেখা ঠিক নয়। তাতে চলার পথ বড্ড বন্ধুর মনে হয়, জীবনের সাথে জীবিকার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে না। জীবিকা নেহাতই পেটের খোরাক জোগায়, আর জীবন মনটাকে রাঙিয়ে দেয়। শিক্ষার মাঝে আনন্দ না থাকলে যেমন তা পানসে, ঠিক তেমনি নিজের কাজটুকু গুছিয়ে মনের মতো না করতে পারলে চাকরি জীবনের আর সার্থকতা কী! সবাই বিসিএস দেবে বা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে, এমন কোনো কথা নেই। আমরা নিসর্গপ্রেমী হতে পারি, সিনেমা বানাতে পারি, ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার হতে পারি, চাই কি সমাজের পিছিয়েপড়া ছেলেমেয়েদের অবলম্বনও হয়ে উঠতে পারি।
ছোট্ট জীবনে একার পক্ষে অনেক কিছুই হয়তো করা সম্ভব নয়, কিন্তু মন-প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করলে একটা স্বপ্নকে অন্তত পত্রপুষ্পে সুশোভিত করতে পারি। এভাবে আমরা প্রত্যেকে যদি ইতিবাচক ভাবনা লালন করে সামনের পথে এগিয়ে যাই, তাহলেই সমাজ বদলাবে। আমরা নিশ্চয়ই মনে রাখবো, মানুষ হিসেবে আমরা প্রদীপের পলতের মতো একসময় জ¦লে জ¦লে নিঃশেষ হতে পারি, কিন্তু তাই বলে পরাজিত হবো না। কিছুতেই না। আমরা তরুণ, মনে ও মননে সজীব থাকতে চাই। আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন আমাদের। সকলকে সঙ্গে করে সামনে এগিয়ে যাবো, এই আমাদের প্রত্যয়।

Category: কলাম

About admin: View author profile.

Comments are closed.