প্রতিবেদন

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে প্রথমবারের মতো যোগ দিলেন দেশের দুই নারী পাইলট

নিজস্ব প্রতিবেদক : কঙ্গোতে জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনে দুর্গম ও ভিন্ন পরিবেশের কাজকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দুই নারী পাইলটÑ ফাইট লেফটেন্যান্ট নাইমা হক এবং তামান্না-ই-লুৎফী। নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সফলভাবে মিশন শেষ করে দেশে ফিরে আসবেন বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা। হেলিকপ্টারে ওঠার আগে পাইলট নাইমা ও তামান্না গত ৪ ডিসেম্বর ঢাকা সেনানিবাসে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি বাশার-এ উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে এসব কথা বলেন। মিশনে বিমান বাহিনীর আরও নারী সদস্য থাকলেও এই প্রথমবারের মতো দুই নারী পাইলট নাইমা হক এবং তামান্না-ই লুৎফী কঙ্গোতে শান্তিরা মিশনে যোগ দিতে ৭ ডিসেম্বর রাতে বাংলাদেশ ছেড়ে গেছেন। সেখান তারা থাকবেন এক বছর। কঙ্গোতে হেলিকপ্টারের পাইলট হিসেবে শান্তিরা মিশনে অন্যদের কাজে সহায়তা করবেন তারা।
ফাইট লেফটেন্যান্ট নাইমা হক সাংবাদিকদের বলেন, দুর্গম ও ভিন্ন পরিবেশে কঙ্গোতে কাজ করতে হবে। সেজন্য বাংলাদেশ বিমান বাহিনী আমাদের প্রয়োজনীয় প্রশিণ দিয়েছে। কঙ্গোর পাহাড়ি অঞ্চলে দায়িত্ব পালনের জন্য এরই মধ্যে আমরা বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে ফাই করে প্রশিণ নিয়েছি। এছাড়া আমরা বিভিন্ন ধাপে প্রশিণ নিয়েছি। এবারই প্রথমবারের মতো কঙ্গোতে যাচ্ছি। তারা বলেন, গত ১৪ বছর ধরে বিমান বাহিনী জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনে কাজ করে আসছে। গত ৭ বছর যাবৎ বিমান বাহিনীর নারী সদস্যরা কাজ করছেন। কিন্তু প্রথমবারের মতো আমরা দুই পাইলট সেখানে যাচ্ছি। নারী পাইলট নাইমা হক বলেন, আমরা সামরিক প্রশিণপ্রাপ্ত। বৈরী পরিবেশে কিভাবে কাজ করতে হবে সে বিষয়ে আমাদের প্রশিণ রয়েছে। সব ধরনের বৈরী পরিবেশ ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবার দোয়া কামনা করেন তিনি। পাইলট হিসেবে তাদের মিশনে যাওয়া নিয়ে স্বজনদের প্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে নাইমা হক বলেন, স্বজন হিসেবে নার্ভাসনেসতো থাকবেই। তবে পরিবারের সদস্যরা এ নিয়ে গর্বিত। তারা আমাদের যথাযথ উৎসাহ দিয়েছেন।
যারা এমন চ্যালেঞ্জিং পেশা নিতে চান সেসব নারীর উদ্দেশে ফাইট লেফটেন্যান্ট তামান্না-ই লুৎফী বলেন, কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী একটি ডায়নামিক ও অপারেশনাল ফোর্স। এয়ারফোর্সেও অনেক সুযোগ আছে। এখানে মেয়েদের কাজ করার পরিবেশ খুবই চমৎকার। বিমান বাহিনীর প থেকে এখানে আমাদের সব ধরনের সহযোগিতা দেয়া হয়েছে। কারও কাজ করার ইচ্ছা থাকলে অবশ্যই তারা স্বাচ্ছন্দ্যে এখানে আসতে পারেন। অবশ্যই আমরা দেশের প্রতিরার জন্য কাজ করছি। এটা বড় সম্মান ও গৌরবের বিষয়। পাইলট তামান্না- ই- লুৎফী বলেন, বিমান বাহিনীতে বর্তমানে তারা তিন কর্মকর্তা হেলিকপ্টারে রয়েছেন। তিনজন রয়েছেন ট্রান্সপোর্টে। আরও কিছু নারী প্রশিণ নিচ্ছেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে মত বিনিময় শেষে দুই নারী পাইলট হেলিকপ্টার উড্ডয়নের মহড়ায় অংশ নেন।
আইএসপিআর সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালে প্রথম বাংলাদেশ বিমান বাহিনীসহ সামরিক বাহিনীতে নারী কর্মকর্তা নিয়োগ শুরু হয়। সময়ের পরিক্রমায় বর্তমানে বিমান বাহিনীর বিভিন্ন শাখায় নারী কর্মকর্তারা কাজ করছেন। তারা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন। আর এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনী দু’জন নারী পাইলটকে জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনে নিয়োগ দিয়েছে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের পর বিমান বাহিনীর দুই নারী কর্মকর্তা ফাইট লেফটেন্যান্ট নাইমা হক এবং ফাইট লেফটেন্যান্ট তামান্না-ই-লুৎফী উড্ডয়ন
প্রশিণের জন্য মনোনীত হন। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ঘাঁটি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ১৮ নম্বর স্কোয়াড্রনে বেল-২০৬ হেলিকপ্টারে বেসিক কনভারশন কোর্সের জন্য মনোনীত হওয়া এই দুই নারী কর্মকর্তা ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট থেকে তাদের গ্রাউন্ড প্রশিণ শুরু করেন। একই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো তাদের উড্ডয়ন প্রশিণ শুরু করেন। পরবর্তীতে ২৫ ঘণ্টা সফল প্রশিণ উড্ডয়ন শেষ করেন তারা। ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর তারা বৈমানিক হয়ে ওঠার প্রাথমিক ধাপের একটি অংশ শেষ করে এককভাবে উড্ডয়ন করেছেন। এরপর তারা ৬৫ ঘণ্টা উড্ডয়নের প্রাথমিক ধাপ শেষ করার পর বিমান বাহিনীর বিভিন্ন হেলিকপ্টার স্কোয়াড্রনে দায়িত্ব পালন করেন। নাইমা ও তামান্না বেল-২০৬ হেলিকপ্টার কনভারশন কোর্স, এমআই-১৭, এমআই-১৭১ এবং এমআই-১৭১ এসএইচ হেলিকপ্টার প্রশিণ শেষ করেন। তারা ভারত থেকে এভিয়েশন মেডিসিনে প্রশিণ নিয়েছেন। দু’জনই পার্বত্য চট্টগ্রামে অপারেশন্স উত্তরণে অপারেশনাল পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাবেক কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হক ও গৃহিণী নাসরীন বেগমের মেয়ে নাইমা হক ফাইট লেফটেন্যান্ট হিসেবে ২০১১ সালের ১ ডিসেম্বর কমিশন লাভ করেন। এর আগে ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি ক্যাডেট হিসেবে প্রশিণ শুরু করেন। হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি শেষ করে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস থেকে তিনি বিএসসি কোর্স শেষ করেন। অন্যদিকে বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত গ্রুপ ক্যাপ্টেন লুৎফর রহমান ও গৃহিণী আয়েশা সিদ্দিকার মেয়ে তামান্না-ই-লুৎফী বিএএফ শাহীন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি শেষ করে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস থেকে বিএসসি কোর্স শেষ করেছেন। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দুই নারী পাইলট দেশের গ-ি পেরিয়ে জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনে যোগ দেয়ায় নারীর মতায়নের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবেও কাজ করবে। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনে নিয়োজিত তিনটি কন্টিনজেন্টে বিমান বাহিনীর মোট ৩৫৮ জন শান্তিরী রয়েছে। এদের মধ্যে পাইলট নাইমা ও তামান্নাকে নিয়ে নারী অফিসারের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৫ জনে।
জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনে প্রতিস্থাপন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিমান বাহিনীর ১১৫ জন সদস্য গত ৩০ নভেম্বর কঙ্গোর উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। কন্টিনজেন্টের অন্য সদস্যরা ৯ ডিসেম্বরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে কঙ্গো গিয়ে পৌঁছেছেন।