আন্তর্জাতিক

জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে নিন্দা

নিজস্ব প্রতিবেদক : জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বীকৃতি দেয়ার পর বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। জাতিসংঘ, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জর্ডান এবং সৌদি আরবের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ দেশগুলোও এই স্বীকৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাল্টা পদপে হিসেবে জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী করার চেষ্টা চালানোর অঙ্গীকার করেছে। ভারতও ফিলিস্তিনকে সমর্থন দেবে বলে জানিয়েছে। ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিােভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। হামাস ইসরাইলের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানে সবাইকে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে ‘অযৌক্তিক’ আর ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে বর্ণনা করেছে ঘনিষ্ঠ মার্কিন মিত্র সৌদি আরব। ফ্রান্স, জার্মানি আর যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, তারা ওই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে না। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুটেরেজ বলেছেন, এটা খুবই গভীর উদ্বেগের সময়। কারণ দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। যদিও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, এটা একটি ঐতিহাসিক দিন। ফিলিস্তিনে ধর্মঘট আর বিােভ ডাকা হয়েছে। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, এর ফলে শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের আসন হারিয়েছে। গাজা ভূখ- পরিচালনাকারী ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস বলছে, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত ওই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের েেত্র ‘জাহান্নামের দরজা খুলে দেবে’। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান ফেদেরিকা মঘারিনি বলেছেন, আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা দুই রাষ্ট্রভিত্তিক বাস্তব সমাধান চাই। জেরুজালেম দুই রাষ্ট্রেরই রাজধানী হবে। এজন্য রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, সৌদি আরব, নরওয়ে এবং জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চালাবে ইইউ। মঘারিনি জানান, ইইউ’র ২৮টি দেশই ফিলিস্তিন ইস্যুতে একমত। ১০ ডিসেম্বরও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এই অবস্থানের কথা জানিয়েছেন ইইউ’র পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বীকৃতি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভক্ত করবে। অস্ট্রেলিয়া বলেছে, তাদের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর করা হবে না।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলকেই ‘আগুনের বৃত্তে’ ছুঁড়ে ফেলবে। ইস্তাম্বুলে মার্কিন কনস্যুলেটের সামনে বিােভ হয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর এ নিয়ে আলোচনায় বসেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। পরিষদের ১৫টি সদস্য দেশের ৮টি দেশ জরুরি অধিবেশন ডেকেছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য আর ফ্রান্সের মতো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশও। ১৫ ডিসেম্বর বৈঠকে বসেছে আরব লিগ। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে ইরাক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং আফগান তালেবান। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাভিশ কুমার জানিয়েছেন, দিল্লি তার আগের অবস্থানেই থাকবে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সমর্থন দেবে। তৃতীয় কোনো দেশ দ্বারা প্রভাবিত হবে না।
ট্রাম্পের ঘোষণার পরই বেথেলহেম, রামাল্লাহ এবং জেরুজালেমে বিােভ করেছে ফিলিস্তিনিরা। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিােভ হয়েছে। গাজা ও পশ্চিম তীরে চলা বিােভ দমনে রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করেছে পুলিশ। ১৬ জন বিােভকারী আহত হয়েছে। একজনকে গুলি করা হয়েছে। বেথেলহেমে পুলিশের সঙ্গে বিােভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। জর্ডানের আম্মানে মার্কিন দূতাবাসের কাছে বিােভ হয়েছে। পশ্চিম তীরে বিােভ দমনে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছে ইসরাইল। নেদারল্যান্ডসে একটি ইহুদি রেস্তোরাঁয় হামলা চালিয়েছে এক ব্যক্তি। এই সময় তার হাতে ফিলিস্তিনি পতাকা ছিল।
জেরুজালেম শহরটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইলি-ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। শুধু এই শহরটি নিয়ে দশকের পর দশক ধরেই সহিংসতা চলছে এবং প্রচুর রক্তপাত হয়েছে। ফলে কোনো পকেই স্বীকৃতি না দেয়ার মার্কিন নীতি চলে আসছে বহুদিন ধরে। কিন্তু সম্প্রতি হোয়াইট হাউজে এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিতর্কিত জেরুজালেম শহরকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত কয়েক দশকের মার্কিন নীতিকে বদলে দিয়েছে।
জেরুজালেম ইস্যুতে উত্তাল হয়ে উঠেছে গাজা। বিােভের মধ্যেই ইসরাইলি বাহিনীর রকেট হামলায় গাজায় দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হামাসের বিভিন্ন স্থাপনায়ও রকেট হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ইসরাইলি হামলায় ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইসরাইল থেকে মোট তিনটি রকেট ছোড়া হয়। তাদের দাবি, হামাসের ছোড়া রকেটের জবাবে এই পাল্টা হামলা। ধ্বংসস্তূপ থেকে অনেক ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি নেতারা জুমার নামাজের পর পশ্চিম তীরে বিােভের ডাক দেয়া ও সংঘর্ষের পরিপ্রেেিত ইসরাইল সেখানে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে। সংঘর্ষে পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে শতাধিক লোক আহত হয়েছেন। পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার ফিলিস্তিনি বাস করে। এদের সঙ্গে থাকে আরও দুই লাখ ইহুদি ইসরায়েলি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অধিকৃত এই ভূমিতে ইহুদি বসতি বৈধ নয়। তবে ইসরাইল একে বৈধ বলে দাবি করে।
এদিকে ১৩ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করে পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেছে ওআইসি। মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দ তাদের এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সমর্থন করার আহ্বান জানিয়েছেন। দেশগুলোর মধ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে তুরস্ক। কূটনৈতিক দিক থেকে প্রত্যাখ্যানের শিকার হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার মিত্র দেশ ইসরাইল। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ এবং সহিংসতাও অব্যাহত রয়েছে। বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে ‘বিপজ্জনক’ উল্লেখ করে ওআইসি পূর্ব জেরুজালেমে ইসরাইলি শাসনের অবসান ঘটাতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানায়। ওআইসি জানায়, তারা দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে বিশ্বাসী। এর আগে ওআইসি মহাসচিব ইউসেফ আল হুথাইমিন মার্কিন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে মুসলিম বিশ্বকে আহ্বান জানান। হুথাইমিন বলেন, ওআইসি আমেরিকার সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এর নিন্দা জানিয়েছে। এটা একদিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিশ্বের মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত করা হয়েছে। ট্রাম্পের একতরফা এ ধরনের সিদ্ধান্তে এই অঞ্চল তথা পুরো বিশ্বে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন হুথাইমিন।