কলাম

টিউলিপ সিদ্দিকের বক্তব্য ও পশ্চিমা গণমাধ্যমের উগ্রপন্থি তোষণ

আবদুল্লাহ হারুন জুয়েল : কিছুদিন আগের সংবাদ, স্পেন হামলায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্য প্রবাসীর অর্থায়ন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসাকে হত্যার লক্ষ্যে জঙ্গিদের একটি পরিকল্পনা ভ-ুল করে দিয়েছে যুক্তরাজ্য পুলিশ। হত্যা পরিকল্পনায় যুক্ত থাকা সন্দেহে গত সপ্তাহে নাইমুর জাকারিয়া রহমান নামে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক ব্রিটিশ নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্বাভাবিক পর্যবেক্ষণে বলা যায়, মানবাধিকারের নামে ’৭১-এর গণহত্যায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, জামায়াতে ইসলামী ও হিজবুত তাহরিরসহ বহু উগ্রপন্থিকে স্থান দিয়েছে যুক্তরাজ্য। সুতরাং তাদেরকে এ অদূরদর্শিতার মূল্য দিতে হবে।
যুক্তরাজ্যের জন্য আশঙ্কাজনক বিষয়টি উল্লেখের কারণ লেবার পার্টির সাংসদ টিউলিপ সিদ্দিকের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে অনেক আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। দুঃখ প্রকাশের পরও এ চর্চা এখনও অব্যাহত রয়েছে। চ্যানেল-ফোর নিউজের রিপোর্টার এলেক্সের জবাবে তিনি প্রথমেই বলেছিলেন, তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ নন। মীর কাসেম আলী বা তার আরমানও ব্রিটিশ নন। এমন নয় যে তিনি মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। সচেতন বলেই ইরানের কারাগারে আটক একজন নারীর মুক্তি দাবিতে ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু ব্রিটিশ জনপ্রতিনিধি হয়ে শুধুমাত্র অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো বিষয়ে কথা বলা কূটনৈতিক সৌজন্য বিবর্জিত।
বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে টিউলিপ সিদ্দিক কি এমন কারো পক্ষে কথা বলতে পারেন যে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দ-িত? তিনি কি এমন একজনের কথিত অপহরণ সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারেন যে বাংলাদেশ ও দেশের পতাকাকে অবমাননা করে? অন্যতম শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলী ১৯৭১ সালে আল বদরের থার্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন। প্রশ্ন আসতে পারে, পিতার অপরাধে পুত্র কেন দায়ী হবে! কাসেম পুত্র মীর আহমদ ওরফে আরমানের হৃদয়েও পিতার মতোই পাকিস্তানেরই প্রতিচ্ছবি। আর এর প্রমাণ পাবেন তার ফেসবুক প্রোফাইলে। সেখানে প্রোফাইল পিকচার হিসেবে সেট করা একটি ছবি আছে, যা বাংলাদেশের পতাকার আইএস ভার্সন এবং পতাকায় কালো লেভেল সেঁটে দেয়া হয়েছেÑ যেটি বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস না করার প্রতিফলন হিসেবেই দৃশ্যমান।
যঃঃঢ়ং://িি.িভধপবনড়ড়শ.পড়স/ঢ়যড়ঃড়.ঢ়যঢ়?ভনরফ=১৩২৪৭৮২৭০০৪৭
টিউলিপকে কেন্দ্র করে যে ইস্যু তোলার চেষ্টা করা হয়েছে বা হচ্ছে তা মোটেই সাধারণ ও স্বাভাবিক নয়। পরিকল্পিতভাবে ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার জন্য ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। একটি বিষয়ে সন্দেহ বাড়ছে যে, আহমেদ গুম হওয়ার বিষয়টিও পরিকল্পিত নাটক। অন্তত সার্বিক বিচার-বিশ্লেষণ সেটিই নির্দেশ করছে।
আলোচিত এ ঘটনার কিছু বিষয় উল্লেখযোগ্য।
ষ আহমেদ প্রসঙ্গে সাংবাদিক এলেক্সের প্রশ্নে টিউলিপের বিব্রত হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। সাধারণভাবে বিবেচনা করলে বিষয়টি ধর্তব্যের মধ্যে পড়বে না। কিন্তু যদি বলা হয় চ্যানেল-ফোর নিউজের প্রযোজক ডেইজি এবং রিপোর্টার এলেক্স বাংলাদেশের রাজনীতির ধারা সম্পর্কে অবগত। যদি বলা হয়, দু’বছর আগেও ডেইজি বাংলাদেশ সফর করেছিল গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনের ইস্যু কভার করতে, তাহলে কি এ ঘটনার সমীকরণ সহজ থাকে?
ষ টিউলিপ বাংলাদেশি নন। বাংলাদেশি দাবি করা আবেগ সংশ্লিষ্ট হতে পারে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি জন্মসূত্রে ব্রিটিশ। তিনি কখনও বাংলাদেশের নাগরিকত্বও গ্রহণ করেননি। তবু তার শেকড় বাংলাদেশে বলেই মীর কাসেম সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই যে, তিনি আরমানের মুক্তির দাবি করেছেন, তাহলে দু’টি ইস্যু তৈরি করা হতো।
এক. এটি হতো বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান। কারণ আরমানকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাসা থেকে ধরে নিয়ে গেছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে তার সত্যতা নেই। কিন্তু এতটা আস্থার সাথে কিভাবে দাবি করেছে যে, একটি ফোন কলেই আরমানকে ফিরে পাওয়া যাবে? ফরহাদ মজহার, সালাউদ্দিন ও হারিস চৌধুরীর মতো অনেকেই গুম নাটক করেছেন। ৫ মে হত্যা করা হয়েছে এই মর্মে তালিকাভুক্ত অনেককেই পরবর্তী কয়েক মাস পর জীবিত পাওয়া গেছে। কাসেম পুত্রের ফেসবুক প্রোফাইলে দেশি-বিদেশি কয়েকজনের ছবি রয়েছে যারা জঙ্গি হিসেবে সন্দেহ করার মতো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটাক্ষ ছাড়াও আইএস বা হামাসের ন্যায় অন্য কোনো জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত থাকার মতো বেশ কিছু অ্যাক্টিভিটি দেখা যায় আরমানের প্রোফাইলে। উগ্রপন্থি একটি দলের নেতার সন্তান হিসেবে বাংলাদেশের অনেক তরুণের মতো সে যে আইএস-এ যোগ দেয়নি তার নিশ্চয়তা কী?
আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সাথে আহমদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে, লিংকের ছবিগুলো দেখলে অনুধাবন করতে পারবেন।
যঃঃঢ়ং://ফৎরাব.মড়ড়মষব.পড়স/ফৎরাব/ভড়ষফবৎং/১৭ুঔঝীপসথ৭এিয৭মউৎণঊ৫জঐডর২ণটাীরঊুি?ঁংঢ়=ংযধৎরহম
কাসেম দেশের শীর্ষ ধনীদের একজন। কোনো সংস্থা অপহরণ করলে তার বাসার সিসিটিভি ফুটেজ কেন প্রকাশ করা হচ্ছে না?
দুই. যারা মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, যাদের সহযোগিতায় ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের কারণে দুই লক্ষ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে, সেই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী বা তার সন্তানের পক্ষ নিয়ে কথা বললে নিশ্চয়ই বাংলাদেশের মানুষের প্রতি অশ্রদ্ধা জানানো হতো।
ষ প্রতিবেদক এ বিষয়গুলো সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত। টিউলিপকে আক্রমণাত্মকভাবে বার বার একই বিষয়ে প্রশ্ন করার বিষয়টি অপ্রত্যাশিত ছিল। প্রযোজক একজন সন্তানসম্ভবা মা। তিনি কি এমন গোষ্ঠীর পক্ষে কথা বলতে পারেন, যাদের কারণে লক্ষ লক্ষ সন্তান পিতৃহারা হয়েছিল এবং হাজার হাজার যুদ্ধ শিশু, বাবা-মা ও পরিবারের স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত হয়ে অনিশ্চিত জীবনের স্রোতে মিশে গিয়েছিল! এর কোনোকিছুই ডেইজির অজানা নয়।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন প্রতিবেদক। নিম্নলিখিত ভিডিও কিপ-এ যঃঃঢ়ং:// িি.িুড়ঁঃঁনব.পড়স/ধিঃপয?া=৫ভনঙুংতকংমগ জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জনসভায় এই মর্মে ঘোষণা করা হয় যে, অভিযুক্ত রাজাকাররা পাকিস্তানকে ভালোবেসে আল বদর, আল শামস বাহিনী গঠন করেছে ও যুদ্ধ করেছে। জামায়াতের মুখপাত্র স্বীকার করেছে যে, রাজাকাররা পাকসেনার ভূমিকা পালন করেছে এবং তারা দায়ী হলে পাকসেনাও একইভাবে দোষী, তাদেরকেও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। রাজাকারদের সহযোগীরা যদি মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার স্বীকারোক্তি প্রদান করে, অন্যদিকে কোনো মিডিয়া যদি সেই বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলে তাহলে সেই সংবাদ-মাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা কোথায় থাকে!
তাই উপরোক্ত বিষয়ে টিউলিপ মন্তব্য না করে যে পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন, যদি আহমেদ সম্পর্কে কিছু বলতেন তবে তা হতো বাংলাদেশের জনমতকে আঘাত করা। উপরন্তু মীর আহমেদকে নিয়ে যে গুম প্রচারণা চলছে তা সত্যি হিসেবে উপস্থাপন করে বাংলাদেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালানো হতো। সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। ১৬ বছর বয়সে রাজনীতি শুরু করা ব্রিটিশ সাংসদ টিউলিপ সিদ্দিক কোনো মন্তব্য না করায় অন্তত আমাদের আশাহত হওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। চ্যানেল-ফোরের মতো সংবাদ মাধ্যমকে আমরা অবশ্যই প্রশ্ন করতে পারি, ব্রিটিশ মিডিয়ার কি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরোধী এবং সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করা উচিত?