প্রতিবেদন

‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : মেধাবী তরুণ প্রজন্মই আইসিটি সেক্টরকে এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে শামিল করবে

নিজস্ব প্রতিবেদক : বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ৬ ডিসেম্বর থেকে আইসিটি সেক্টরের মেগা ইভেন্ট ৪ দিনব্যাপী ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে। মেলা শেষ হয়েছে ৯ ডিসেম্বর। এবারের আইসিটি মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল বিশ্বের প্রথম নাগরিকত্ব পাওয়া নারী রোবট সোফিয়ার উপস্থিতি।
কয়েকটি আইটি সংগঠনের সহযোগিতায় আইসিটি বিভাগ ও বেসিস ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’-এর আয়োজন করেছে। ‘রেডি ফর টুমরো’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত এবারের ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে দেশি-বিদেশি প্রায় ৪০০ আইসিটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছে। মেলায় ২৯টি সেমিনার হয়েছে। ৬ ডিসেম্বর মেলা উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মেলায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ পর্ব শেষে বর্ণাঢ্য লেজার শো অনুষ্ঠিত হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন। সেখানে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন উদ্ভাবন। এরই এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি গেমসের স্টলে যান। সেখানে তিনি ভারচ্যুয়ালি ক্রিকেট খেলেন। ক্রিকেট ব্যাট হাতে নিয়ে কয়েকটি বল মোকাবিলা করতে দেখা যায় তাকে।
ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের প্রতিপাদ্য ‘রেডি ফর টুমরো’র সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নট টুডে ফর টুমরো, আমরা বাংলাদেশকে তৈরি করতে চাই। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কিভাবে তৈরি হবে সেটাই আমরা দেখতে চাই, সেভাবেই আমরা কাজ করতে চাই।’ তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশের ফলে সামনে নতুন শিল্প বিপ্লবের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই তরুণ প্রজন্মকে সুন্দর আগামীর জন্য প্রস্তুত করতে হবে। দেশের মেধাবী তরুণ প্রজন্মই আইসিটি সেক্টরকে এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে শামিল করার স্বপ্ন সার্থক করবে। আর কালপেণ যেন না হয় সেজন্য আমরা ল্য স্থির করেছি ‘ভিশন-২০২১’। অর্থাৎ ২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবো। সে সময়ে বাংলাদেশ হবে ুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ দেশ। আর ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হিসেবে আমরা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হব, ইনশাআল্লাহ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইসিটি খাত ২০২১ সাল নাগাদ দেশের উন্নয়নের সব থেকে বড় অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য এই বছর থেকে রপ্তানিতে ৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে সফটওয়্যার খাতে রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। আশা করা হচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে এ আয় ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে এবং জিডিপিতে সফটওয়্যার ও আইসিটি সেবা খাতের অবদান ৫ শতাংশে উন্নীত হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশজুড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে ২৮টি হাইটেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক। এসব পার্কে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার জন্য ১০ বছরের আয়কর মওকুফ ও শতভাগ রিপেট্রিয়েশনসহ বিবিধ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশ্বে ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যার দিক থেকে আমরা রয়েছি দ্বিতীয় স্থানে। আমরা প্রথম স্থানে উঠবো ইনশাআল্লাহ। ২০২১ সাল নাগাদ আমাদের ২০ লাখ তরুণ-তরুণী তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট পেশার সাথে যুক্ত হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আমাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন বানানো শুরু করেছি। এই খাতে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে চলতি বছর থেকে আমরা ৯৪টি উপকরণের ওপর শুল্ক ১ শতাংশ করে দিয়েছি। ইতোমধ্যে স্যামসাং-এর মতো কোম্পানি ঢাকার অদূরে কারখানা স্থাপন করেছে। আমরা দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের সংযোগ ও বেসরকারি খাতে ৬টি ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেবলের সুবিধা দিয়েছি। ফলে দেশব্যাপী ১০ গুণেরও বেশি ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ ব্যবহার বেড়েছে। ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ রপ্তানিও হচ্ছে। যে ব্যান্ডউইডথের দাম ২০০৭ সালে ছিল ৭৬ হাজার টাকা তা এখন ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। ফলে ই-গভর্ন্যান্স, ই-হেলথ, ই-কমার্স, ই-লার্নিং, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনসহ ইন্টারনেটের বহুবিধ ব্যবহার সহজলভ্য হয়েছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে ফোর-জি প্রযুক্তি চালু করা হচ্ছে। আজকের বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ, এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনি ইশতেহারে মানুষকে যে কথা দিয়েছি তা আমরা রেখেছি।
প্রধানমন্ত্রী মেলায় আগত হংকংয়ের হ্যানসেন রোবটিক্সের বানানো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত নারী রোবট সোফিয়ার সঙ্গে কথা বলেন। শুরুতেই সম্ভাষণ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হ্যালো সোফিয়া, কেমন আছ?’ জবাবে সোফিয়া বলে, ‘হ্যালো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে ধন্যবাদ, আমি গর্ব অনুভব করছি। আপনার সাথে আজকের এই সাাৎ দারুণ ব্যাপার।’ প্রধানমন্ত্রী তার কাছে জানতে চান, কিভাবে তাকে সোফিয়া চিনে? জবাবে সোফিয়া বলে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বাংলাদেশের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, তা সে জানে। শেখ হাসিনাকে যে বিশ্বে এখন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বলা হচ্ছে, তার উদ্যোগেই যে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে তা-ও তার জানা। সোফিয়া আরো বলে, প্রধানমন্ত্রীর নাতনির নাম যে তার মতোই সোফিয়া- তাও তার অজানা নয়। তখন সবাই হেসে ওঠেন। চমৎকৃত প্রধানমন্ত্রী এ সময় অনুষ্ঠানের অতিথিদের জানান, তার ছেলে ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের মেয়ের নাম সোফিয়া।
এরপর সোফিয়াকে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তুমি তো আমার এবং আমার ভিশন সম্পর্কে অনেক কিছু জানো। ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্পর্কে তুমি কী জানো?’ জবাবে সোফিয়া বলে, ‘আপনি জেনে অবাক হবেন, আমি আপনার ভিশন ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে অনেক কিছুই জেনেছি। ডিজিটাল বাংলাদেশে জনশক্তি খুবই বেশি, তারা আইসিটি খাতের উন্নয়নে কাজ করছে, ই-গভর্ন্যান্সও নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। অর্থনীতির সব সেক্টর ডিজিটাল করার ল্য নিয়ে ২০০৯ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। আইসিটি এক্সপোর্ট থেকে ৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার আমদানি হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মত্রে। জনসম্পদ তৈরির দতা বাড়ানোর কাজও চলছে। সরকারের সব ধরনের সেবাও ডিজিটাল করার কাজ চলছে। ২৮টি আইটি পার্ক ও বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি গঠন বাংলাদেশের আইসিটি খাতে নতুন ল্যান্ডমার্ক তৈরি করবে। আজ এখানে এসে খুব ভালো লাগছে, এটি সাউথইস্ট এশিয়ার সবচেয়ে বড় আয়োজন।’ এরপর সে বলে, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি এখন আপনাকে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ২০১৭-এর উদ্বোধন ঘোষণা করার আহ্বান জানাচ্ছি।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আচ্ছা, চলো তাহলে সেটাই করি।’