কলাম

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অপ্রাসঙ্গিকতা ও নির্বাচনকালীন সরকার

ড.অরুণ কুমার গোস্বামী : বর্তমানে বাস্তব, আইনগত তথা সাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে, উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের পরে ‘নির্বাচিত সরকারের’ অধীনে নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে বৈধ ও প্রাসঙ্গিক হয়ে দেখা দিয়েছে। এতদসত্ত্বেও, দেশের সাংবিধানিক রীতি-নীতি, উচ্চ আদালতের রায় এবং নির্বাচিত সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের যৌক্তিকতার পাশাপাশি বিশেষত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে অপারগ বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে উত্থাপিত যুক্তির প্রেক্ষিতে, প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হচ্ছে, সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কি ‘নির্বাচিত সরকার’ না কি ‘অনির্বাচিত তত্ত্ববধায়ক সরকার’ ব্যবস্থার অধীনে? ‘নির্বাচিত সরকারের’ অধীনে নির্বাচনের যৌক্তিকতাকে ‘অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পশ্চাৎপদ যুক্তি দিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টা এবং ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে নির্বাচিত সরকারের অধীনেই। সেই নির্বাচন না হতে দেয়ার জন্য বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছিল। কিন্তু তারা তাদের অভীষ্ট লাভ করতে পারেনি। এইসব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় উত্থাপিত প্রশ্নটি বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অতীতের জাতীয় সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আশা পোষণকারী রাজনৈতিক সংগঠন, ব্যক্তিবর্গ তথা ‘অ্যাক্টিভিস্টদের’ পাশাপাশি গবেষণাকর্মে নিয়োজিত ‘একাডেমিক’গণও এ সম্পর্কিত গবেষণায় তাৎপর্যপূর্ণভাবে তৎপর। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং এই ব্যবস্থা বাতিলের রায় সম্পর্কে ‘অ্যাক্টিভিস্টদের’ প্রচুর বক্তৃতা-বিবৃতির পাশাপাশি ‘একাডেমিক’ গবেষণার সংখ্যাও অনেক। বলা বাহুল্য, ‘অ্যাক্টিভিস্টদের’ মত ‘একাডেমিকগণও’ এই প্রশ্নে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে অবস্থান করছেন।
বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে এ ধরনের পর্যবেক্ষণ ও অবস্থানের মূল কারণ হচ্ছে অভিজ্ঞতা এবং দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা। দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায় আরোহণের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে আলাদা অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিয়েছে। স্বাভাবিক কারণেই, রাজনীতির অভিজ্ঞতা না থাকলেও মতাদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ‘একাডেমিক’ জগতের ব্যক্তিদের মধ্যেও ভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। রাজনীতির অ্যাক্টিভিস্টেরা স্ব স্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও মতাদর্শ অনুযায়ী নির্বাচনকালে নির্বাচিত সরকার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ‘না থাকা’ ও ‘থাকা’ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য প্রদান করছেন। যদিও ইতোমধ্যেই দেশের সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে, তথাপি অ্যাক্টিভিস্টদের বক্তব্য বিবৃতি ছাড়াও একাডেমিকেরা তাদের মতাদর্শ অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণ দাঁড় করাচ্ছেন। ফখরুদ্দিন আহমদ (১৯৯৮), নিজাম আহমেদ (২০০৪), ক্রেইগ বক্সটার ও সাইদুর রহমান (১৯৯১) প্রমুখ পন্ডিতগণ অভিজ্ঞতা ও অধ্যয়নভিত্তিক গবেষণামূলক কাজ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। অনেক এমফিল এবং পিএইচডি গবেষণাও তত্ত্বাবধায়ক সরকার-এর ওপর করা হয়েছে। এরকমই একটি পিএইচডি থিসিস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করা হয়েছে। থিসিসটির শিরোনাম ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন : একটি মূল্যায়ন’। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পিএইচডি থিসিসটিতে বলা হচ্ছে,‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে জনগণের নির্বাচন সম্পর্কে আস্থা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। কেননা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যথাসম্ভব নিরপেক্ষভাবে ভোট অনুষ্ঠিত হয়।’ বলা বাহুল্য, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং সংবিধানের নিয়ম-কানুনের বিবেচনা না করে, অন্তরে বর্তমানের বিএনপি’র যুক্তিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকলেই কেবল, পিএইচডি গবেষণায় এইরূপ সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনকালে সুক্ষ্ম কারচুপি, ২০০১-এর নির্বাচনে সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ওপর নারকীয় হামলা এরকম অনেক উদাহরণ তুলে ধরা যেতে পারে। এরপরে, ২০০৬ সালে ফখরুদ্দিন মঈনউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের পূর্বে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অষ্টম জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়াসহ সব রাজনীতিকদের ওপর নেমে আসে অত্যাচার। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক শক্তিসমূহের পুরোধা ব্যক্তিত্বদের এইরূপ অন্যায়, অত্যাচার ও জুলুমের পর থেকে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের আস্থা নিঃশেষিত হতে থাকে। ২০০১ এর নির্বাচনের পূর্বে, নির্বাচন চলাকালে এবং নির্বাচনের পরে সহিংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বিএনপি-জামায়াত সমর্থকদের বিচারের বাণী এখনো নীরবে নিভৃতে কাঁদছে! এতদসত্ত্বেও, রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টদের পাশাপাশি এক শ্রেণির একাডেমিকও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করছেন!
দীর্ঘ ১৫ বছর ক্রিয়াশীল থাকা এবং ১৯৯১ সাল থেকে পরপর তিনটি সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন করার পরেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি পারফেক্ট বা যথার্থ ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি এবং এই ধরনের ব্যবস্থা বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে সাধারণভাবে আস্থা স্থাপন করতে পারেনি। প্রথম থেকেই এই ব্যবস্থার মধ্যে (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের) প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা ও কার্যাবলী; তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল থাকা অবস্থায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ও কার্যাবলিÑ এর কোন কিছুই গ্রহণযোগ্যভাবে নির্ধারিত করা যায়নি। রাজনীতিতে আস্থাহীনতার সংস্কৃতি, অসহনশীলতা এবং ‘ক্ষমতা-লিপ্সু মহলের হাতিয়ার’ হওয়ার জন্য এই ব্যবস্থা কতদিন পর্যন্ত বলবৎ থাকবে তাও সর্বসম্মতভাবে নির্ধারিত করা যায়নি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মনোনীত হতেন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। অন্যান্য উপদেষ্টারা জাতীয় সংসদের সদস্য কিংবা সদস্যপদের জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে, কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারতেন না এবং তারা অবশ্যই ৭২ বছর বয়সের নিচের হতেন। এভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মধ্যে সমাজের বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ এবং বিচার বিভাগীয় বিশেষজ্ঞরা থাকতেন। সংবিধান অনুযায়ী তাদের কার্য মেয়াদে প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টাগণ যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীদের সমান সম্মানী ও মর্যাদা পেতেন।
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের মধ্যে অনাস্থা থেকে তৈরি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই অনাস্থা সূচিত হয়েছিল সামরিক শাসকদের দ্বারা সৃষ্ট রাজনৈতিক দলকে ‘প্রতিষ্ঠিত’ করার ‘নগ্ন’ বাসনার কারণে। আর এটি সংবিধানে ঠাঁই করে নিয়েছিল ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে পাসকৃত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে।
গণতান্ত্রিক বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম হচ্ছে একটি (নির্বাচিত) সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট কয়েক মাস আগে ক্ষমতাসীন নির্বাচিত সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবং নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী পরবর্তী সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করে থাকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকা-ের মাধ্যমে বাংলাদেশের সামরিক শাসকেরা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘আস্থাহীনতা’ সন্নিবেশ ঘটিয়েছে তার চূড়ান্ত ফল ‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা।
জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুনর্বাসিত করার পাশাপাশি, তাদেরকে রাষ্ট্রদূত বানিয়েছিলেন। খুনিদের দিয়ে ফ্রিডম পার্টি করিয়েছেন। এসবই ‘আস্থাহীনতার বীজ’ যার অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল ‘ষড়যন্ত্রের’ মাধ্যমে! এতকিছুর পাশাপাশি, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েম ‘অসুস্থ শরীর’ জনিত কারণে পদত্যাগ করায়, ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি মেজর জেনারেল এইচ এম এরশাদকে সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান হিসেবে নিয়োগ দান করেন। ১৯৭৭ সালের মে মাসে, তাঁর ক্ষমতা ক্রমবর্ধমান হারে নিরাপদ হওয়ার প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান ১৯-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচি ঘোষণার পর জিয়াউর রহমান রেফারেন্ডামের আয়োজন করেন। প্রকৃতপক্ষে, ভোটারবিহীন এই রেফারেন্ডামের ফলাফলে দেখা যায় শতকার ৮৮.৫ ভাগ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। আর এদের মধ্যে শতকরা ৯৮.৯ ভাগ ভোটার জিয়ার পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচনে ‘আস্থাহীনতার’ ইতিহাসে এটি ছিল একটি তাৎপর্যপূর্ণ কালো অধ্যায়। এই লোক দেখানো রেফারেন্ডামের মাধ্যমে জনগণকে ধোঁকা দেয়া হয়েছিল। ১৯৭৭ সালের জুন মাসে বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে উপরাষ্ট্রপতি মনোনীত করার মাধ্যমে জিয়াউর রহমান তাঁর শাসনামলের বেসামরিকীকরণ প্রক্রিয়ার আরো এক ধাপ এগিয়ে যান। ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করেন। এই নির্বাচনে জিয়া নিজে জাতীয় গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) নামে একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা করেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিয়াউর রহমান জাগদলের সমর্থন লাভ করেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেনারেল এম এ জি ওসমানি ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিয়াউর রহমান শতকরা ৭৬.৭ ভাগ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছিলেন। ভোট কারচুপির জন্য এই নির্বাচনটিও কুখ্যাতি অর্জন করেছিল। এরপর ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের আগে জিয়া তাঁর জাগদল-কে সম্প্রসারিত করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) রূপান্তরিত করেন। আরো পরে, শোকাবহ ১৫ আগস্টে কৃত্রিম জন্মদিন পালন করে এই ‘আস্থাহীনতা’কে ব্যক্তি ও রাজনৈতিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিকরূপ দিয়েছেন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ক্ষমতায় থাকাকালে ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা করা হয়েছিল যাতে আইভি রহমানসহ অনেক নেতাকর্মী নিহত হয়েছিলেন। এসব কিছু দ্বারা আস্থাহীনতা আরো বেড়েছে।
সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মুখে তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী, সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা হস্তান্তর ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে সাময়িক সময়ের জন্য ১৯৯০ সালে বিচারপতি শাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ মত অভিনব ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। পরবর্তীকালে, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন সরকার ‘ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে’ ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা’ সংবিধানে সংযোজিত হয়েছিল। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে ১৯৯৬ সালের ২১ মার্চ নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রেখে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী প্রস্তাব সংসদে উত্থাপিত হয় এবং ২৬ মার্চ, ১৯৯৬ তারিখে ২৬৮-০ ভোটে তা পাস হয়। ত্রয়োদশ সংবিধান সংশোধনী প্রস্তাব পাস হওয়ার পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানের ৫৮ (গ), (ঘ) ও (ঙ) সংবিধানে সংযোজিত হয়। এতে বলা হয় সংসদ বাতিল হওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে ১১ সদস্য বিশিষ্ট নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হইবে।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন বর্তমান সরকারের সমর্থক ‘অ্যাক্টিভিস্ট’ ও ‘একাডেমিক’গণ নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে নির্বাচিত সরকারকেই সমর্থন করছেন। এর বিপরীতে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ‘অ্যাক্টিভিস্ট’ এবং ‘একাডেমিক’গণ চাইছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনর্বহাল।
সংবিধান অনুযায়ী, ব্যতিক্রমী কোনো পরিস্থিতি ছাড়া, বর্তমান দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানের ১২৩(২)(ক) অনুসারে বর্তমানে ক্রিয়াশীল জাতীয় সংসদের মেয়াদ ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি শেষ হবে। সে হিসেবে পরবর্তী একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যবর্তী কোনো এক তারিখে। দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকারের অধীনে ৫ হাজার ২০০টিরও বেশি বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর এইসব নির্বাচন সম্পর্কে কেউই কোনো আপত্তি উত্থাপন করেনি।
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে বিভক্তি ভোটে পাস হওয়া পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকে বর্তমান সংবিধান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই সংবিধান অনুযায়ী নির্দলীয় সরকারব্যবস্থার অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো সুযোগ নেই। পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কিত সংবিধানের ৫৮ (খ), ৫৮ (গ), ৫৮ (ঘ), এবং ৫৮ (ঙ) বিলুপ্তির কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বিলুপ্তি ঘটেছে বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার। সংশোধনীতে বলা হচ্ছে, ‘মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’ যার সরল অর্থ দাঁড়ায়, বর্তমান সরকারের মেয়াদের শেষ ৯০ দিনে একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রিসভা ও বর্তমান সংসদ সদস্য সবাই ওই ৯০ দিনেও স্বপদে বহাল থাকবেন। স্ব স্ব পদে বহাল থেকেই তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। বিএনপির দাবি, সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপেও বিএনপি সংসদ ভেঙে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। যা বিএনপি ঘরানার একাডেমিকদের গবেষণায়ও দেখা যায়। বিএনপি যাই বলুক, অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে বিএনপির পক্ষে নির্বাচন বর্জন করা কঠিন, এটা সংশ্লিষ্ট সবাই জানে। যেহেতু সংবিধানের আওতায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেহেতু অন্য কোনো উপায় নেই, ব্যতিক্রমী বা অলৌকিক কিছু আশা করাও অমূলক। বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সমঝোতা বা মিটমাটের চেয়েও এখানে প্রধান বিষয়টি হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ। সংবিধান সুরক্ষার শপথ নিয়েই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কাজেই তার দায়িত্ব সংবিধান রক্ষা করা। সে কারণে সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হওয়া উচিত। ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে’ এই বক্তব্য নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তিকে মদদ দেয়ার জন্য প্রয়োজনে পিএইচডি থিসিস লিখলেও সত্য এটিই যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকাকালে সংবিধানের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। বাংলাদেশের জনগণ বর্তমানে এটিই আশা করে।