দেশের সমৃদ্ধি : দক্ষ জনশক্তি

| December 18, 2017

মো. আবু সাঈদ : দেশকে উন্নয়নে তথা সামগ্রিকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে দক্ষ প্রশিক্ষিত মানুষের বিকল্প নেই। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ধীরে ধীরে কৃষি থেকে বেরিয়ে বহুমুখী খাতে অর্থনীতি সফলতা ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অর্থনীতির ভা-ারে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স, রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প, হিমায়িত খাদ্য, মাছ-মাংস, শাকসবজি, হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং সামগ্রী, জুতা, ওষুধ রপ্তানি আয় যুক্ত হচ্ছে। তবে এটা অনস্বীকার্য যে, একটি দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে প্রথম প্রয়োজন রাজনৈতিক নেতৃত্ব তারপরে প্রয়োজন পরিকল্পিতভাবে সেক্টরভিত্তিক উন্নয়ন দক্ষ ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদ।
দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদ শুধু দেশে থেকে যে নিজেকে, পরিবার ও সমাজকে উন্নয়নের অগ্রগতি, অগ্রযাত্রায় এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে তেমনি প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন একজন শ্রমিক বিদেশে গিয়েও রাখতে পারে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা।
কাজেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের নীতিনির্ধারক মহল এই বাস্তবতা ও গুরুত্ব অনুধাবন করে জনবহুল এই দেশের মানুষকে দক্ষ কর্মীতে পরিণত করার উদ্যোগ নিলে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তথা দেশ ও জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগোনো সহজ হবে। এই বাস্তবতা অনুধাবন করে বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন। যার সুফল ইতোমধ্যে অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। এই গুরুত্ব বিবেচনায় প্রসঙ্গত দেশে সরকারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন অধিদপ্তর, এসএমই ফাউন্ডেশন, শ্রম ও জনশক্তি উন্নয়ন ব্যুরো, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট, নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, সাংবাদিকদের পেশাগত মান উন্নয়নে রয়েছে প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ-পিআইবি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণে রয়েছে বিএমডিএম। এসব প্রতিষ্ঠান থেকেও প্রতিনিয়ত সংশ্লিষ্ট পেশায় নিয়োজিত মানুষ প্রশিক্ষণ নিয়ে স্ব স্ব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে; যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। অনুরূপ নারীর কর্মসংস্থানের ভূমিকা রেখেছে উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। এ নিবন্ধে প্রশিক্ষণের সাকসেস স্টোরি নিয়ে আলোকপাত করা হলো।
কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারকরণ প্রকল্পটি গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য দূরীকরণ, আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকারত্ব নিরসনে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। বিভিন্ন ধরনের ট্রেড কোর্সের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে তরুণ যুবকরা। প্রশিক্ষণ অঞ্চলে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ এবং প্রসবকালীন মৃত্যুর হার অনুপাতিক হারে কমে আসছে। নারীর উন্নয়নের মাধ্যমে সামাজিক অস্থিরতার হার কমানো ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধি পাচ্ছে, মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ বেড়ে চলেছে, সমাজে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে যা সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে সহায়তা করছে। সমগ্র প্রকল্পটির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারকরণ (সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পটি মোট ১০৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে সম্পূর্ণ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে জানুয়ারি ২০১২ থেকে ডিসেম্বর ২০১৭ মেয়াদে ৫৭ জেলার ৪৪২ উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটি থেকে সুফল পাওয়ার পাশাপাশি এর বিভিন্ন দুর্বলতা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রকল্পটি হতে সঠিক সুফল পেতে বিভিন্ন সুপারিশও করা হয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে তরুণ যুবকদের বিভিন্ন ট্রেড কোর্সের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এগুলো হলো ব্লক বাটিক ও প্রিন্টিং, মৎস্য খাদ্য তৈরি, পোলট্রি, গাভী পালন, বিউটি পার্লার, মোবাইল ফোন মেরামত, গরু মোটাতাজাকরণ, মৎস্য খাদ্য উৎপাদন, শুঁটকি মাছ উৎপাদন, নার্সারি, নকশিকাঁথা, বাঁশ ও বেতের কাজ, ফুল চাষ, ছাগল পালন, সেলাই কাজ, শাকসবজি চাষ, মাশরুম চাষ, তাঁত বুনন, মোটরসাইকেল মেরামত, বেসিক কম্পিউটার কোর্স, মোমবাতি তৈরি, পশু পালন, রান্না শিক্ষা ও কুটির শিল্প। এ প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে হরেক রকমের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেকার যুবকদের দক্ষ ও আধা দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা। প্রশিক্ষিত যুবকের আত্মকর্মসংস্থান মূলক কার্যক্রমে নিয়োজিত করে দরিদ্র ও বেকারত্ব কমানো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবকদের আত্মনির্ভর করে গড়ে তোলা এবং জাতি গঠনমূলক কার্যক্রমে যুবকদের অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা। প্রতিবেদনে উপকারভোগীদের তথ্য নিয়ে জরিপ করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ৫০ শতাংশ প্রশিক্ষক জানিয়েছেন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে ভোক্তা ও গ্রাহকদের সঙ্গে উৎপাদনকারীদের সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটেছে। এছাড়া প্রশিক্ষকদের মধ্য থেকে ২৯ দশমিক ২ শতাংশ বলেছেন বাল্যবিবাহের হার কমেছে, ২০ দশমিক ৮ শতাংশ বলেছেন গ্রামীণ অর্থনীতিকে উন্নত করেছে, ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেকারত্বের হার কমেছে, ৮ দশমিক ৩ শতাংশ বলেছেন মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছেন, ৭ দশমিক ৩ শতাংশ বলেছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, ৫ দশমিক ২ শতাংশ বলেছেন দরিদ্রতা হ্রাস পেয়েছে এবং ৪ দশমিক ২ শতাংশ বলেছেন মানুষের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে সকল প্রশিক্ষণার্থী বুটিক ও প্রিন্টিং কাজে আত্মকর্মী হয়েছে তাদের পারিবারিক আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৫০ ভাগ। মৎস্য খাবার তৈরিতে আত্মকর্মীর আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৪ দশমিক ১০ ভাগ। হাঁস-মুরগি ও পোলট্রি পালনে আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৩২ শতাংশ। গাভী পালনে ৩৫ শতাংশ, মোবাইল ফোন মেরামতকারীর আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৪২ শতাংশ। গরু মোটাতাজাকরণে আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৮ শতাংশ, নার্সারিতে সার্বিক আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৬৪ শতাংশ। পোশাক তৈরি ও অন্যান্য কাজে আয় বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৪০ শতাংশ ও ৫২ শতাংশ। প্রকল্পটির কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রেড ও অন্যান্য প্রশিক্ষণে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের অভাব রয়েছে। পর্যাপ্ত ভাতা না পাওয়া, প্রশিক্ষণ শেষে আত্মকর্মসংস্থানের জন্য পর্যাপ্ত ঋণ না পাওয়া দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি একাধিক পত্রিকা, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়ায় প্রকাশিত অপর একটি খবর থেকেও আশার বাণী শোনা গেছে। প্রকাশিত খবরে বলা হয় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নেয়ার পর কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ায় কিশোর-কিশোরীদের মাসিক গড় আয় বেড়েছে প্রায় ৬ গুণ। এর পাশাপাশি তাদের মধ্যে সচেতনতা ও আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাওয়ায় বাল্যবিয়ের হার ৬২ শতাংশ কমেছে। রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘দি পাওয়ার অব এপ্রেন্টিশিপস’ শীর্ষক সেমিনারে এক গবেষণা তথ্য উপস্থাপনায় এসব চিত্র তুলে ধরা হয়। গবেষণায় প্রাথমিক প্রকল্প হিসেবে ২০১২-১৫ সালে দেশের ৭টি জেলায় এ জরিপ কাজ শুরু হয়। জেলাগুলো হচ্ছে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম ও সিলেট। এতে প্রকল্প এলাকার ৫৭৩ জনের মধ্যে গবেষণা জরিপ পরিচালিত হয়। তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয় প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী কিশোরীদের মধ্যে বাল্যবিয়ের হার ৬২ শতাংশ কমেছে। এছাড়া ২০১৪-১৫ সালে জীবনযাত্রার ওপর দক্ষতা প্রশিক্ষণের প্রভাব শীর্ষক দ্বিতীয় জরিপ পরিচালিত হয় ১৫ জেলায়। জেলাগুলো হচ্ছে ঢাকা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, খুলনা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, ঝিনাইদহ ও যশোর। এতে দেখা যায় যাদের মাসিক গড় আয় ছিল ১৬৬.৮৫ টাকা, প্রশিক্ষণের ৬ মাস পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০৮৯.৪১ টাকা। অপরদিকে প্রশিক্ষণবিহীনদের গড় আয় ৩৭৫ টাকা থেকে বেড়ে হয় ১ হাজার ২৭০ টাকা। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের গড় আয় অদক্ষদের তুলনায় ৬ গুণ বেড়েছে, পাশাপাশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের সঞ্চয়ের প্রবণতা বেড়েছে প্রায় ৭.৫ গুণ। ক্রয়ক্ষমতা ও সঞ্চয় বেড়ে যাওয়ায় তারা খাদ্য ব্যয়ও ৯ শতাংশ বাড়াতে পেরেছে।
আয়োজিত এক সেমিনারে বলা হয় দক্ষতা উন্নয়নে সরকারের ২৩টি মন্ত্রণালয় ও ৩৫ জেলার মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ অপরিহার্য। দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে একই ছাতার মধ্যে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর নেতৃত্বে টেকসই উন্নয়নের সফলতা আনতে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি ও আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার ও স্বেচ্ছাসেবী বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। স্ট্রাটেজি, কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড অ্যানপাওয়ারমেন্ট কর্মসূচির সেমিনারে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ আরও গতিশীল করতে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের ওপর জোর দেয়া হয়।
বেসরকারি সংস্থা হিসেবে আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। তাই সরকারের এগিয়ে আশা প্রয়োজন। এছাড়া স্কিলস ট্রেনিং ফর অ্যাডভাসিং রিসোর্স স্টোর শীর্ষক পর্যালোচনায় বলা হয় বিগত ৪ বছরে এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় ১৮ হাজার ৯০০ কিশোর-কিশোরীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে ৫৭ শতাংশই নারী। এই কর্মসূচির আওতায় ২০২০ সাল নাগাদ প্রায় ৫ লাখ কিশোর-কিশোরীকে প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে টেকসই করার পাশাপাশি যাতে এর সুফল পাওয়ার লক্ষ্যে যথাযথ মনিটরিং এবং বেকার অথচ কর্মক্ষম যুবক-যুবতীদের প্রশিক্ষণের আওতায় এনে তাদের কর্মোপযোগী করে গড়ে তোলা।
লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

Category: ফিচার

About admin: View author profile.

Comments are closed.