প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কম্বোডিয়া সফরে ১০ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর : আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে বাংলাদেশ-কম্বোডিয়া একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ দণি-পূর্ব এশিয়ার আসিয়ান জোটভুক্ত দেশ কম্বোডিয়ার সঙ্গে ১০ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বার করেছে। বাণিজ্য-বিনিয়োগ, পর্যটন ও তথ্য-প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন েেত্র সহযোগিতা এগিয়ে নিতে ৯টি স্মারক ও ১টি চুক্তি স্বারিত হয়। চুক্তিটি হয়েছে দুই দেশে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি এবং কম্বোডিয়া চেম্বার অব কমার্সের মধ্যে সহযোগিতা বিষয়ে। ৪ ডিসেম্বর নমপেনে কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের কার্যালয় পিস প্যালেসে শেখ হাসিনা ও হুন সেনের উপস্থিতিতে দুই দেশের প্রতিনিধিরা এসব সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিতে স্বার করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের এবং প্রধানমন্ত্রী হুন সেন কম্বোডিয়ার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন।
চুক্তি স্বারের আনুষ্ঠানিকতার আগে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একান্তে এবং দুই দেশের প্রতিনিধি দলের মধ্যে দ্বিপীয় বৈঠক হয়। চুক্তি স্বারের পর শেখ হাসিনা ও হুন সেন যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে নেয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পর্যটন েেত্র সহযোগিতা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা, জয়েন্ট ট্রেড কাউন্সিলের অধীনে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সহযোগিতা, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন ল্য বাস্তবায়নে সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ এবং রয়্যাল একাডেমি অব কম্বোডিয়ার মধ্যে একাডেমিক পর্যায়ে সহযোগিতা এগিয়ে নিতে সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়া। বাকি সমঝোতা স্মারকগুলো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্মৃতিস্তম্ভ এবং স্মৃতিচিহ্ন সংরণে সহযোগিতা, মৎস্য ও অ্যাকুয়াকালচার খাতে সহযোগিতা, শ্রম ও কারিগরি প্রশিণ খাতে সরকারি পর্যায়ে সহযোগিতা এবং বিনিয়োগ প্রসারে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপ ও কাউন্সিল ফর দি ডেভেলপমেন্ট অব কম্বোডিয়ার মধ্যে সহযোগিতার বিষয়ে।
যৌথ বিবৃতিতে শেখ হাসিনা বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে জয়েন্ট ট্রেড কাউন্সিল গঠনের বিষয়ে যে সমঝোতা স্মারক হয়েছে এবং দুই দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠনের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে, তা আমাদের দ্বিপীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। দ্বিপীয় বৈঠকে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানান তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে
কম্বোডিয়ার সহযোগিতা
চাইলেন শেখ হাসিনা
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দমন-পীড়নের কারণে সৃষ্ট রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে যৌথ বিবৃতিতে কম্বোডিয়ার সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রোহিঙ্গারা যাতে নিরাপদে তাদের ঘরে ফিরতে পারে, সেজন্য মিয়ানমারের সঙ্গে আমরা দ্বিপীয় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের কাছেও আমি সহযোগিতা চাইছি, যাতে এ সংকটের একটি টেকসই সমাধানে আমরা পৌঁছতে পারি।
শেখ হাসিনা বলেন, দ্বিপীয় বৈঠকে সাম্প্রতিক কিছু আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের বিষয়ে দুই পরে মধ্যে আলোচনা হয়েছে। দুই পই সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারের কথা বলেছে। আমরা রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও কথা বলেছি, যা আমাদের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি বিনষ্টের হুমকি তৈরি করছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশকে এখন ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভার বইতে হচ্ছে; যাদের মধ্যে প্রায় ৭ লাখ মানুষ মিয়ানমারে সাম্প্রতিক সহিংসতার কারণে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে।
কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী যৌথ বিবৃতিতে বলেন, তারা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের বিষয়েও আলোচনা করেছেন, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মর্মে হুন সেন আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার উভয়েই এই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুশৃঙ্খলভাবে নিরাপদে স্বদেশে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে একযোগে কাজ করবে। বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষ থাকার পরেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে আশ্রয় প্রদান করে এবং তাদের বিষয়টি নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়ায় আমরা বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রশংসা করছি।
প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ
কম্বোডিয়া সহযোগিতার অঙ্গীকার
কম্বোডিয়াকে বাংলাদেশের নিকটতম আঞ্চলিক প্রতিবেশী আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এই দুটি দেশ একই রকম শান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের প্রত্যাশী। আমরা অনেক আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক ফোরামে পরস্পরকে নিবিড়ভাবে সহযোগিতা করে থাকি বিশেষ করে এআরএফ, আসেম, এসিডি এবং জাতিসংঘে। কম্বোডিয়ায় তাঁর সফরকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর এবং প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের আলোচনার ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
কম্বোডিয়ার উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের প্রশংসা করে শেখ হাসিনা বলেন, অত্যন্ত সৌহার্দ্য ও উষ্ণ আতিথেয়তাপূর্ণ দ্বিপাকি আলোচনায় আমরা দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল দ্বিপীয় বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেছি। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নেতৃত্বে অনুষ্ঠেয় যৌথ কমিশনের (জয়েন্ট কমিশন) প্রথম বৈঠকটি ঢাকায় অনুষ্ঠানের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। আমরা দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীদের নেতৃত্বে জয়েন্ট ট্রেড কাউন্সিল (জেটিসি)-র প্রথম বৈঠকটিও আগামী বছর ঢাকায় অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এবং কম্বোডিয়া দুই দেশের রাজধানীতে পৃথক দুটি আবাসিক কূটনৈতিক মিশন খোলার বিষয়টিও বিবেচনা করে দেখছে। জয়েন্ট ট্রেড কমিশন (জেটিসি), বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দুই দেশের চেম্বারগুলো সর্বোচ্চ সংস্থার মধ্যে আমাদের স্বারিত স্মারকগুলো দ্বিপীয় ব্যবসাবাণিজ্য এবং বিনিয়োগের ত্রেকে প্রসারিত করতে সাহায্য করবে। শ্রম এবং কারিগরি প্রশিণ, আইসিটি, মৎস্য, অ্যাকুয়া কালচার এবং পর্যটন বিষয়ে স্বারিত স্মারকগুলো আমাদের বহুবিধ সহযোগিতার ত্রেকে আরো প্রশস্ত করবে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি অত্যন্ত আনন্দিত যে, প্রধানমন্ত্রী হুন সেন আসিয়ান (এএসইএএন) বৈঠকে বাংলাদেশকে সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনারশিপ অ্যাসপিরেশনে সহযোগিতা প্রদানের বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। গাঙ্গেয় অববাহিকার দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কম্বোডিয়ার সঙ্গে মেকং-গঙ্গা সহযোগিতা ফোরামের মেম্বারশিপ প্রাপ্তির বিষয়ে একযোগে কাজ করার দিকে তাকিয়ে আছে।
দুই মহান জাতিই একই ধরনের নির্যাতন-নিপীড়ন এবং গণহত্যা প্রত্য করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরীরা কম্বোডিয়ার সংঘাত পরবর্তী শান্তি স্থাপনে সর্বাগ্রে কম্বোডিয়ার জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। বাঙালি এবং খেমার জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে আদি সাংস্কৃতিক যোগসূত্র রয়েছে, সংস্কৃত ও পালি সমর্থিত পঞ্জিকা এবং দুই দেশেরই নতুর সাল গণনা শুরু হয় এপ্রিল থেকে।
নরদম সিহানুকের স্মৃতি সৌধে তিনি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কম্বোডিয়ার জাতির পিতা বাংলাদেশেও উচ্চ সম্মানের আসনে আসীন রয়েছেন। তিনি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানান যে, তাঁর সরকার রাজধানী ঢাকার একটি সড়ক কম্বোডিয়ার প্রয়াত রাজা নরদম সিহানুকের নামে নামকরণ করতে যাচ্ছে। তাঁর দেশে উষ্ণ আতিথেয়তা প্রদর্শন করায় প্রধানমন্ত্রী কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, তাঁর এই সফর বাংলাদেশ এবং কম্বোডিয়ার সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হুন সেন এবং কম্বোডিয়ার বন্ধুত্বপ্রবণ জনগণের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং তাদের অব্যাহত শান্তি, সমৃদ্ধি এবং অগ্রগতি কামনা করেন।
কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন বলেন, দ্বিপীয় আলোচনায় আমরা একটি ফলপ্রসূ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছি যাতে ভবিষ্যতে উন্নত দেশগুলোর কাতারে শামিল হতে আমরা একযোগে কাজ করতে পারি। কম্বোডিয়া বাংলাদেশের আসিয়ানে (এএসইএএন) সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার আকাক্সক্ষাকে সমর্থন করে এবং নমপেন তাদের এই ল্য অর্জনে সহযোগিতা করে যাবে। কম্বোডিয়ার জনগণের জন্য বাংলাদেশের জনগণের সহযোগিতার বিষয়ে হুন সেন তার হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ জানান। তিনি আরো উল্লেখ করেন, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে তাঁর প্রথম সফরের পর এবারে কম্বোডিয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বিতীয় সফর দুই দেশের দ্বিপীয় সম্পর্ককে আরো জোরদার করেছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী হুন সেনকে আমন্ত্রণ জানালে সানন্দে তিনি তা গ্রহণ করেন।